মহাভারতের সেই আদিপর্বের কথা। কুরুক্ষেত্রের রণহুঙ্কার তখনো অনেক দূরে, পাণ্ডব বা কৌরবদের জন্মও হয়নি
মহাভারতের সেই আদিপর্বের কথা। কুরুক্ষেত্রের রণহুঙ্কার তখনো অনেক দূরে, পাণ্ডব বা কৌরবদের জন্মও হয়নি—ভারতবর্ষের আকাশ তখন এক আদিম ও স্তব্ধ অপেক্ষায় থমথমে। ঠিক সেই মুহূর্তে নদীর কিনারে এক রাজার সাথে দেখা হলো এক মায়াবিনী রূপসীর। এই গল্প শান্তনুর।
সেই বংশধারা: যযাতি থেকে হস্তী
যযাতি অরণ্যে চলে যাওয়ার পর তাঁর পুত্র পুরুর বংশলতিকা ডালপালা মেলতে শুরু করল। সেই বংশেই এলেন দুষ্মন্ত আর শকুন্তলার পুত্র ভরত। যাঁর নামে এই দেশের নাম হলো ভারতবর্ষ। ভরত থেকে ভূমন্যু, তারপর সুহোত্র আর হস্তী। এই হস্তী রাজাই গঙ্গার তীরে পত্তন করলেন সেই বিখ্যাত নগরী—হস্তিনাপুর। বহুকাল পর সেই কূলে জন্ম নিলেন তিন ভাই: দেবাপি, শান্তনু আর বাহ্লীক। জ্যেষ্ঠ দেবাপি রাজ্য ছেড়ে সন্ন্যাস নিলেন, ফলে মুকুট উঠল শান্তনুর মাথায়। শান্তনুর এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল। তাঁর স্পর্শে জরাগ্রস্ত বৃদ্ধও সতেজ হয়ে উঠত, অশান্ত মনে নামত পরম শান্তি। এই 'শান্তি' বিলানোর ক্ষমতা থেকেই তাঁর নাম হয়েছিল শান্তনু।
ব্রহ্মার অভিশাপ ও এক মরণশীল মুহূর্ত
কিন্তু শান্তনু হওয়ার আগে, অন্য এক জন্মে তিনি ছিলেন ইক্ষ্বাকু বংশের প্রতাপশালী রাজা মহভিষ। পুণ্যবলে তিনি লাভ করেছিলেন স্বর্গবাস। একদিন ব্রহ্মার সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং গঙ্গা। হঠাৎ এক দমকা হাওয়ায় গঙ্গার শ্বেতবস্ত্র কিঞ্চিৎ সরে গেল। দেবতারা লজ্জায় নতমুখ হলেন, কিন্তু মহভিষ চোখ ফেরাতে পারলেন না। তিনি অপলক চেয়ে রইলেন সেই অপার্থিব সৌন্দর্যের দিকে। গঙ্গার হৃদয়েও জাগল চঞ্চলতা।
ব্রহ্মা সব দেখলেন। রুষ্ট হয়ে তিনি বললেন, "তোমাদের মর্ত্যে যেতে হবে। সেখানে মানবী রূপে গঙ্গা আর মানুষ রূপে মহভিষের মিলন হবে। মহভিষ, তুমি তখনই মুক্তি পাবে যখন গঙ্গার কোনো আচরণে তুমি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে তিরস্কার করবে।" সেই মহভিষই শান্তনু হয়ে জন্ম নিলেন প্রতীপ রাজার ঘরে।
অষ্ট বসুর দর্পচূর্ণ
ঠিক একই সময়ে অন্য এক বিভ্রাট ঘটল স্বর্গলোকে। অষ্ট বসু—যাঁরা প্রকৃতির শক্তিরূপ—তাঁরা সস্ত্রীক ঘুরতে বেরিয়েছিলেন মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে। সেখানে ছিল কামধেনু নন্দিনী। এক বসুর (দ্যু) পত্নী সেই অলৌকিক গাভীটি দেখে লুব্ধ হলেন। স্ত্রীর আবদার মেটাতে দ্যু তাঁর ভাইদের নিয়ে নন্দিনীকে চুরি করলেন।
বশিষ্ঠ ধ্যানযোগে সব জানতে পেরে অভিশাপ দিলেন—আট বসুকেই মর্ত্যে জন্ম নিতে হবে। কান্নাকাটি আর প্রার্থনার পর ঋষি শান্ত হলেন। বললেন, "সাতজন জন্মের পরপরই মুক্তি পাবে, কিন্তু দ্যু—যাঁর জন্য এই কাজ—তাঁকে দীর্ঘকাল মর্ত্যে বেঁচে থাকতে হবে। তিনি হবেন মহাতেজস্বী, কিন্তু কোনোদিন স্ত্রী বা সন্তানের সুখ পাবেন না।" বসুরা গঙ্গার শরণ নিলেন। গঙ্গা কথা দিলেন, তিনি মর্ত্যে তাঁদের মা হবেন এবং জন্মের পরেই তাঁদের জলে ভাসিয়ে মুক্তি দেবেন।
গঙ্গার শর্ত ও শান্তনুর প্রেম
শান্তনু তখন রাজা। একদিন গঙ্গার তীরে শিকারে গিয়ে তিনি দেখলেন এক পরমা সুন্দরী নারীকে। মনে হলো ঠিক যেন কোনো চেনা স্মৃতি ভেসে আসছে। শান্তনু মোহগ্রস্তের মতো বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। গঙ্গা রাজি হলেন, কিন্তু এক কঠিন শর্তে:
"আমি যা-ই করি না কেন, তুমি আমায় প্রশ্ন করতে পারবে না। কোনো কাজে বাধা দিতে পারবে না বা কটু কথা বলতে পারবে না। যেদিন তুমি আমায় তিরস্কার করবে, সেদিনই আমাদের সম্পর্ক শেষ হবে।"
শান্তনু অন্ধ প্রেমে সেই শর্ত মেনে নিলেন।
সাতটি প্রাণ আর একটি নীরব চিৎকার
সংসার শুরু হলো। কিন্তু একি বিভীষিকা! প্রথম সন্তান জন্মানোর পর গঙ্গা তাকে নিয়ে গিয়ে নদীতে ফেলে দিলেন। শান্তনু স্তম্ভিত, ব্যথায় বুক ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু শর্তের দায়ে কথা বলতে পারলেন না। একে একে দ্বিতীয়, তৃতীয়... সপ্তম সন্তানকেও গঙ্গা অবলীলায় বিসর্জন দিলেন। শান্তনু এক পাথরপ্রতিম শোক নিয়ে কেবল দেখে গেলেন।
কিন্তু অষ্টম সন্তানের বেলায় শান্তনু আর পারলেন না। গঙ্গা যখন শিশুটিকে নিয়ে নদীর দিকে এগোচ্ছেন, শান্তনু গর্জে উঠলেন, "থামো! তুমি কি মানুষ না পিশাচী? নিজের সন্তানদের এভাবে কেউ হত্যা করে? এই মহাপাপ আমি আর সইতে পারছি না!"
গঙ্গা থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখে এক ম্লান হাসি ফুটে উঠল। বললেন, "রাজা, আজ তুমি শর্ত ভাঙলে। আমার যাওয়ার সময় হয়েছে। কিন্তু জেনে রেখো, আমি কোনো নিষ্ঠুর মা নই। এই সাতটি সন্তান ছিল অভিশপ্ত বসু, আমি কেবল তাদের শাপমুক্তি দিয়েছি। আর এই অষ্টম সন্তান হলো দ্যু, সে বেঁচে থাকবে। সে হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বীর, মহাত্যাগী।"
শান্তনুর হাতে শিশুটিকে তুলে দিয়ে গঙ্গা বললেন, "এই তোমার পুত্র। একে আমি এখন নিয়ে যাচ্ছি, উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে সময়ে তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে যাব।"
তারপর অলৌকিক এক কুয়াশার মতো গঙ্গা সেই শিশুকে নিয়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলেন। শান্তনু পড়ে রইলেন নদীর পাড়ে—একাকী, রিক্ত এবং এক সুদূরপ্রসারী।
পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন

Comments
Post a Comment