তপতীনন্দন: কুরুবংশের রক্তে বহমান সূর্যের সেই আদিম অগ্নিশিখা
তপতীনন্দন: কুরুবংশের রক্তে বহমান সূর্যের সেই আদিম অগ্নিশিখা
গঙ্গা বয়ে চলেছে আপন ছন্দে। কলকল ধ্বনি আর শান্ত নির্জনতা মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছে নদীর তীরে। গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের সঙ্গে পাণ্ডবদের যুদ্ধ মিটেছে সামান্য আগে, কিন্তু তার রেশটুকু রয়ে গেছে বাতাসে। সেই হারানো উত্তাপ ছাপিয়ে এখন বইছে বন্ধুত্বের শীতল হাওয়া। অর্জুনের সঙ্গে চিত্ররথের আলাপ জমে উঠতে সময় লাগল না। বীরের সঙ্গে বীরের মোলাকয়াত তো এমনই হয়—চোখে চোখ পড়লেই যেন বহু জন্মের চেনা।
আলাপের এক ফাঁকে চিত্ররথ বেশ সহজ স্বরেই পাণ্ডবদের সম্বোধন করলেন— ‘তপতীনন্দন’।
অর্জুন থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর কপালে সূক্ষ্ম বলিরেখা। নামটা অচেনা নয়, কিন্তু এর গভীরতা তাঁর কাছে স্পষ্ট নয়। তিনি ফিরে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, "আমাদের কেন তপতীনন্দন বললে? আমরা কুন্তীর পুত্র, এ তো সারা বিশ্ব জানে। তপতী নামটা তো আমাদের কুলের পরিচয়ে সেভাবে কখনও শুনিনি।"
চিত্ররথ হাসলেন। সে হাসিতে বিদ্রূপ নেই, বরং আছে এমন একজনের আত্মতৃপ্তি যার ঝুলিতে এক অজানা রহস্যের চাবিকাঠি লুকানো আছে। তিনি ইঙ্গিত করলেন বসবার জন্য। বললেন, "একটু বসো। তোমাদের বংশের শেকড়ে এমন এক নারী আছেন, যাঁর কথা হয়তো ইতিহাস বিস্মৃত হয়েছে, কিন্তু রক্তে তাঁর স্মৃতি আজও অম্লান। তিনি তপতী। সেই গল্প শুনলে বুঝবে কেন তোমাদের এই নামে ডাকা সার্থক।"
ভাইয়েরা বসলেন। গঙ্গার জল ছুঁয়ে আসা বাতাসে চিত্ররথ শুরু করলেন সেই কাহিনী।
সে অনেক কাল আগের কথা। তখন দেবতারা আর মানুষের পৃথিবী এতটা আলাদা ছিল না। সূর্যের প্রখর তেজ আর করুণা—দুইই তখন মর্ত্য অনুভব করত স্পষ্ট ভাবে। মহাপ্রতাপশালী বিরিঞ্চিনন্দন সূর্যের এক কন্যা ছিল, নাম তাঁর তপতী।
তপতী কেবল সুন্দরী ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্বয়ং আলোর এক পুঞ্জীভূত প্রকাশ। প্রতি ভোরে তাঁর পিতা যে জ্যোতি আকাশে ঢেলে দেন, তপতীর অস্তিত্বে যেন সেই জ্যোতিরই এক স্নিগ্ধ রূপ ধরা দিয়েছিল। ত্রিলোকের কোনো নারীর সঙ্গেই তাঁর তুলনা চলত না। তপতীর দিদি সাবিত্রীও তেজোস্বিনী ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তপতীর মধ্যে ছিল এক নিভৃত আগুন। কৃচ্ছ্রসাধন আর তপস্যার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে এতটাই পবিত্র করেছিলেন যে তাঁর নাম সার্থক হয়ে উঠেছিল—তপতী, অর্থাৎ যিনি উত্তাপ ছড়ান, যিনি দীপ্তিময়।
কিন্তু সূর্যের একটা মস্ত বড় দুশ্চিন্তা ছিল। মেয়ের জন্য যোগ্য পাত্র খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি।
দেবলোক, যক্ষলোক, গন্ধর্বলোক—কোথাও এমন কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না যে তপতীর সেই আধ্যাত্মিক তেজ আর অভ্যন্তরীণ অগ্নি সহ্য করতে পারবে। কেউ হয়তো বীর কিন্তু গুণহীন, কেউ রূপবান কিন্তু অন্তসারশূন্য। সূর্য এমন একজন মানুষকে খুঁজছিলেন, যে তপতীর আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে পুড়ে ছাই হবে না, বরং সেই আলোয় নিজেকে আরও উজ্জ্বল করে তুলবে।
ঠিক সেই সময়েই মর্ত্যে কুরুবংশের আদিপুরুষ ঋক্ষ রাজার এক পুত্র ছিলেন—নাম সংবরণ।
সংবরণ সাধারণ কোনো রাজপুত্র ছিলেন না। যেমন তাঁর বিশাল কাঁধ আর রাজকীয় উপস্থিতি, তেমনই তাঁর অটল চরিত্র। কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ছিল অন্য জায়গায়। তিনি ছিলেন সূর্যের পরম ভক্ত। প্রাত্যহিক রাজকার্যের আগে সংবরণ প্রতিদিন ভোরে উঠতেন। নিজের হাতে ফুল তুলে, একাগ্র চিত্তে তিনি সূর্যের আরাধনা করতেন। সেই ভক্তি কোনো আচারমাত্র ছিল না, ছিল এক নিবিড় সমর্পণ। সূর্যদেব ওপর থেকে সেই রাজপুত্রের একাগ্রতা লক্ষ করতেন। তিনি দেখলেন, এই যুবক কেবল শরীরচর্চা বা রাজনীতিতে দক্ষ নয়, এর অন্তরাত্মাটিও বেশ খাঁটি।
একদিন পাহাড়ে শিকার করতে গিয়ে পথ হারালেন সংবরণ। বনের গভীর নির্জনতায় যেখানে আলো-ছায়ার খেলা চলে, সেখানে হঠাৎই এক আশ্চর্য রূপসীকে দেখলেন তিনি। একলা দাঁড়িয়ে আছেন এক নারী, আর তাঁর চারপাশের পরিবেশটা যেন ঠিক জাগতিক নয়। রোদের চাদরটা সেখানে বেশি উজ্জ্বল, বেশি জীবন্ত।
রাজপুত্র থমকে গেলেন। বছরের পর বছর যে ইন্দ্রিয়সংযম তিনি অভ্যাস করেছেন, তপতীর এক পলকের দৃষ্টিতে তা যেন খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। তিনি মুগ্ধ হলেন না, তিনি অভিভূত হলেন। সংবরণ এগিয়ে গিয়ে নিজের মনের কথা জানালেন। এক গভীর আর্তি ফুটে উঠল তাঁর গলায়।
তপতী সামান্য হাসলেন। সে হাসি কোনো মায়াবিনীর নয়, বরং এক দেবকন্যার প্রশান্তি তাতে মিশে ছিল। তিনি বললেন, "আমি সূর্যকন্যা। আমার ওপর আমার নিজের অধিকার নেই। তুমি যদি সত্যিই আমাকে চাও, তবে আমার পিতার আরাধনা করো। তিনি প্রসন্ন হলেই আমাদের মিলন সম্ভব।"
মুহূর্তের মধ্যে তপতী অদৃশ্য হয়ে গেলেন, ঠিক যেমন মেঘের আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়ে।
সংবরণ আর প্রাসাদে ফিরলেন না। বনের সেই নির্জনতাকে সঙ্গী করে তিনি শুরু করলেন ঘোরতর তপস্যা। বারো দিন অন্নজল ত্যাগ করে, স্থির হয়ে বসে রইলেন তিনি। তাঁর সেই একাগ্রতা মহাকাশে আগুনের রেখা হয়ে পৌঁছল সূর্যের কাছে। সূর্যদেব বুঝলেন, এই তো সেই লোক। যে পুরুষ তপতীর জন্য নিজের শরীর আর মনকে এমনভাবে তুচ্ছ করতে পারে, সেই তো তপতীর যোগ্য স্বামী।
সূর্যদেব তখন সপ্তর্ষিদের অন্যতম বশিষ্ঠকে স্মরণ করলেন। বশিষ্ঠ এসে সংবরণকে সেই শুভ সংবাদ দিলেন—সূর্যদেব প্রসন্ন হয়েছেন। তপতীর সঙ্গে সংবরণের বিবাহ সম্পন্ন হলো যথাযোগ্য মর্যাদায়। মর্ত্যের রাজপুত্রের সঙ্গে স্বর্গীয় তেজের সেই মিলন থেকেই এই বংশের জয়যাত্রা শুরু।
গল্প শেষ করে চিত্ররথ অর্জুনের চোখের দিকে তাকালেন। "বুঝলে অর্জুন, তপতী তোমাদের আদিমাতা। তাঁর সেই তেজ, সেই আধ্যাত্মিক আগুন তোমাদের রক্তে মিশে আছে। যখন আমি তোমাদের শৌর্য আর ভক্তি দেখি, আমি সেই তপতীর ছায়াই খুঁজে পাই। তাই তোমাদের তপতীনন্দন বলাটা আমার কাছে কেবল অলংকার নয়, এক ধ্রুব সত্য।"
অর্জুন স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। নিজের বংশের পরিচয় তো তিনি জানেন—পুরুর বংশ, কুরুর বংশ। কিন্তু ইতিহাসের শুষ্ক তালিকার আড়ালে যে এমন এক প্রগাঢ় প্রেমের আর ত্যাগের গল্প লুকিয়ে আছে, তা তাঁর জানা ছিল না। তাঁর মনে হলো, যে রক্ত তাঁর ধমনীতে বইছে, তা সাধারণ মানুষের নয়—তাতে স্বয়ং সূর্যের উত্তাপ মিশে আছে।

Comments
Post a Comment