হিড়িম্বার গর্ভে ভীমের এক অদ্ভুত দর্শন পুত্রের জন্ম হলো— ঘটোত্কচ।
হিড়িম্বার গর্ভে ভীমের এক অদ্ভুত দর্শন পুত্রের জন্ম হলো— ঘটোত্কচ।
অরণ্যের সেই আদিম অন্ধকার আর বুনো তেজ যেন মিশে ছিল তার রক্তে, কিন্তু তার ধমনীতে বইছিল পাণ্ডব আভিজাত্যও।
কিছুকাল পরে হিড়িম্বা বুঝলেন, পাণ্ডবদের যাত্রাপথ আর তার জীবন এক নয়। তিনি ভীমকে অরণ্যের মায়ায় বেঁধে রাখতে চাইলেন না, আবার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে নিজেও সঙ্গী হলেন না। শান্ত অথচ এক অবিচল মর্যাদার সাথে তিনি শিশুপুত্র ঘটোত্কচকে নিয়ে বনের গহীনে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। যাওয়ার আগে শুধু বলে গেলেন, "বিপদের মেঘ ঘনিয়ে এলে ডাক দিও, মা আর ছেলে দুজনেই তোমাদের পাশে এসে দাঁড়াব।" কিশোর ঘটোত্কচও মাথা নিচু করে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেল।
তারপর শুরু হলো পাণ্ডবদের এক অন্যরকম পথচলা।
রাজকীয় ঐশ্বর্য এখন এক ম্লান স্মৃতি। পাঁচ ভাই আর কুন্তীর পরনে এখন বল্কল আর মৃগচর্ম, মাথায় জটাজুট। গভীর অরণ্যের ফলমূল আর কন্দই তাঁদের আহার। কেউ দেখে বুঝবে না এঁরা হস্তিনাপুরের রাজকুমার। ছদ্মবেশে, বিনীত সন্ন্যাসীর মতো তাঁরা এক বন থেকে অন্য বনে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
এমনই একদিন পথে তাঁদের দেখা হলো মহর্ষি ব্যাসদেবের সঙ্গে। তাঁর শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি যেন পাণ্ডবদের হৃদয়ের সব হাহাকার এক নিমেষে পড়ে ফেলল। তিনি জানতেন দুর্যোধন ঠিক কতটা অন্যায়ভাবে তাঁদের রাজ্যচ্যুত করেছেন। ব্যাসদেব মৃদুস্বরে বললেন, "বৎসগণ, তোমাদের এই দুঃখের দিন বৃথা যাবে না। ধৈর্যের এই পরীক্ষাই তোমাদের আগামীর জন্য প্রস্তুত করছে।"
ঋষির আশ্বাসবাণীতে পাণ্ডবদের মনে নতুন আশার সঞ্চার হলো। ব্যাসদেব তাঁদের নির্দেশ দিলেন, "আপাতত তোমরা একচক্রা নগরীতে যাও। সেখানে এক সাধারণ ব্রাহ্মণের ঘরে আশ্রয় নাও। এক মাস অত্যন্ত সংগোপনে সেখানে থাকতে হবে তোমাদের। নিজেদের পরিচয় প্রকাশ কোরো না। সময় হলে আমি আবার আসব।"
ব্যাসদেবের নির্দেশ শিরোধার্য করে পাণ্ডবরা একচক্রায় পৌঁছালেন। মহর্ষি স্বয়ং তাঁদের এক দয়ালু ব্রাহ্মণের পর্ণকুটিরে পৌঁছে দিলেন। সেই সহজ-সরল ব্রাহ্মণ পরিবার জানতেই পারলেন না যে, তাঁদের আশ্রয়ে স্বয়ং ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির বা মহাবলী ভীম অবস্থান করছেন।
যাওয়ার আগে ব্যাসদেব আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন, "অপেক্ষা করো। ভাগ্যের চাকা কোন দিকে ঘোরে, তা সময় না এলে বোঝা যায় না।"
পাণ্ডবরা সেই নিভৃত আশ্রয়ে তাঁদের প্রচ্ছন্ন জীবন শুরু করলেন। বাইরে থেকে জীবনটা স্থির মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছিল এক মহাজাগতিক ঝড়ের পটভূমি। তাঁরা শুধু সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।

Comments
Post a Comment