দুর্যোধনের জন্ম -হস্তিনাপুরের সেই কালবেলা
দুর্যোধনের জন্ম -হস্তিনাপুরের সেই কালবেলা
হস্তিনাপুরের প্রাসাদে সেদিন এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব এসেছেন। গান্ধারীর সেবা আর নিষ্ঠায় ঋষি প্রসন্ন, আর ঋষিরা যখন তুষ্ট হন, তাঁদের দাক্ষিণ্য তখন বাঁধ মানে না। ব্যাসদেব দু-হাত উজাড় করে বর দিতে চাইলেন। কিন্তু গান্ধারীর মনের গভীরে তখন এক চোরা স্রোত বইছে। খবর এসেছে, কুন্তী সন্তানসম্ভবা।
গান্ধারী জানতেন, কুন্তীর সন্তান আগে ভূমিষ্ঠ হওয়া মানেই হস্তিনাপুরের রাজমুকুট তার মাথায় ওঠা। উত্তরাধিকারের এই লড়াইয়ে নিজের অনাগত সন্তান কি তবে ব্রাত্য হয়ে থাকবে? ঈর্ষা আর আশঙ্কার এক জটিল বুনোটে গান্ধারী চাইলেন এক অদ্ভুত বর— ধৃতরাষ্ট্রের মতোই একশোটি বলবান পুত্র। ব্যাসদেব স্মিত হেসে বললেন, ‘তথাস্তু’। যেন অমোঘ নিয়তির এক নীল নকশা আঁকা হয়ে গেল সেদিনই।
লোহার পিণ্ড ও ১০১টি ঘৃতকুম্ভ
দিন যায়, মাস যায়, কিন্তু গান্ধারীর প্রতীক্ষা আর ফুরোয় না। দীর্ঘ দুই বছর অতিক্রান্ত, অথচ গর্ভস্থ সন্তান পৃথিবীর আলো দেখল না। ওদিকে সংবাদ এল, কুন্তীর কোলে এসেছে যুধিষ্ঠির। হতাশায়, যন্ত্রণায় আর নিজের ওপর তীব্র অভিমানে গান্ধারী সজোরে আঘাত করলেন নিজের উদরে। ভূমিষ্ঠ হলো না কোনো মানবশিশু, পরিবর্তে বেরিয়ে এল লোহার মতো কঠিন এক মাংসপিণ্ড।
সংবাদ পেয়ে ত্রস্ত ব্যাসদেব এলেন। দিব্যদৃষ্টিতে তিনি দেখলেন আগামীর ছায়া। তাঁরই নির্দেশে সেই মাংসপিণ্ডকে শীতল জলে সিক্ত করে ভাগ করা হলো একশো একটি টুকরোয়। তারপর ঘি-ভর্তি একশো একটি মাটির পাত্রে পরম যত্নে রাখা হলো সেই মাংসখণ্ডগুলো। ব্যাসদেব বিদায় নিলেন হিমালয়ের নির্জনে, আর হস্তিনাপুর প্রতীক্ষায় রইল আরও দুই দীর্ঘ বছর। সময় থমকে থাকে না, মহাকালের চাকা ঘোরে নিজের নিয়মে।
দুর্যোধনের জন্ম ও অমঙ্গলের সংকেত
দুই বছর পূর্ণ হওয়ার ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে প্রথম পাত্রটি যখন খোলা হলো, জন্ম নিল দুর্যোধন। কিন্তু সে এক বীভৎস জন্মলগ্ন। শিশুটি ভূমিষ্ঠ হয়েই গাধার মতো কর্কশ স্বরে চিৎকার করে উঠল। আকাশ কালো করে ধেয়ে এল কালবৈশাখী, শেয়াল আর কাকের চিৎকারে যেন প্রেতপুরী হয়ে উঠল রাজপ্রাসাদ। বিনা মেঘেই বজ্রপাত হলো, কোথাও কোথাও দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। প্রকৃতির এই রোষ দেখে শিউরে উঠলেন অভিজ্ঞরা।
ভীত ধৃতরাষ্ট্র মন্ত্রণা চাইলেন ভীষ্ম আর বিদুরের কাছে। মনে তাঁর কুটিল জিজ্ঞাসা—যুধিষ্ঠির তো বড়, কিন্তু তাঁর এই জ্যেষ্ঠ পুত্র কি কখনও ক্ষমতার স্বাদ পাবে না? ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইরে আবার হুক্কাহুয়া শব্দে ডেকে উঠল শেয়াল। বিদুর স্তম্ভিত হয়ে বললেন:
"মহারাজ, এই অশুভ সংকেতগুলো অবহেলা করবেন না। কুল রক্ষার স্বার্থে একজন কুলঙ্গারকে ত্যাগ করা শাস্ত্রসম্মত। এই শিশুটি কুরুবংশ ধ্বংসের কারণ হবে। ওকে ত্যাগ করুন, পৃথিবী শান্ত হবে।"
কিন্তু অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের পিতৃস্নেহ তখন সব যুক্তি আর বিবেকের ঊর্ধ্বে। তিনি বিদুরকে থামিয়ে দিলেন। একে একে জন্ম নিল আরও নিরানব্বইটি পুত্র আর একমাত্র কন্যা দুঃশলা। নিয়তি তার বিষবৃক্ষের বীজ বুনে দিল কুরুকুলে।
যুজুৎসু এবং পরবর্তী ইতিহাস
ইতিহাসের এক আশ্চর্য মোড় এখানেও আছে। গান্ধারীর গর্ভাবস্থায় এক বৈশ্য কন্যা ধৃতরাষ্ট্রের সেবা করতেন। তাঁর গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন যুজুৎসু। কৌরবদের ভিড়ে সে ছিল এক ব্যতিক্রমী চরিত্র—ন্যায়নিষ্ঠ আর অত্যন্ত মেধাবী।
বড় হওয়ার সাথে সাথে একশো ভাই হয়ে উঠলেন একেকজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। সুন্দরী রাজকন্যাদের সাথে তাঁদের বিয়ে হলো। একমাত্র আদরের বোন দুঃশলার বিয়ে হলো সিন্ধুরাজ জয়দ্রথের সাথে। বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল হস্তিনাপুর এক অপরাজেয় শক্তি, এক অখণ্ড সাম্রাজ্য। কিন্তু প্রাসাদের সেই অভিজ্ঞ প্রবীণরা জানতেন, একশো একটি ঘৃতকুম্ভের ভেতরে আসলে মহাপ্রলয়ের বিষ সঞ্চিত ছিল। যে বিষ একদিন কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরকে রক্তে রাঙিয়ে দিয়ে শেষ করে দেবে এক সুবিশাল ঐতিহ্যকে।
এ তো কেবল জন্ম নয়, এ যেন এক মহাকাব্যিক বিনাশের প্রথম পরিচ্ছেদ।
কী মনে হয়, গান্ধারীর সেই জেদ আর ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রস্নেহ কি আসলে আমাদের চিরন্তন মানবীয় দুর্বলতারই এক প্রাচীন প্রতিচ্ছবি নয়?

Comments
Post a Comment