গরুড়ের মুক্তি: মায়ের বন্ধনমোচন, অমৃত ও পক্ষিরাজের গৌরব
গরুড়ের মুক্তি: মায়ের বন্ধনমোচন, অমৃত ও পক্ষিরাজের গৌরব
সূর্যের আলোয় ঝলমল করছিল স্বর্গের আকাশ। দেবতাদের পরাজিত করে, অমৃতের কলস হাতে তুলে নিয়ে গরুড় উড়ে চলেছিলেন। তাঁর বিশাল ডানায় বাতাস কাঁপছিল, যেন পৃথিবীটা ছোট হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি অমৃত নিয়ে যাচ্ছিলেন না লোভে, না অমরত্বের লালসায়। শুধুমাত্র একটা কথা রাখার জন্য—মা বিনতার মুক্তির জন্য। সেই নাগদের ক্রূর বন্ধন থেকে মাকে ছিনিয়ে আনার জন্য।
আকাশের উচ্চতায়, যেখানে মেঘেরাও থমকে দাঁড়ায়, সেখানে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল ভগবান বিষ্ণুর সঙ্গে। বিষ্ণু চেয়ে দেখলেন সেই বিশাল পাখিকে। চোখে কোনো লোভ নেই, হৃদয়ে কোনো ক্ষুধা নেই—শুধু একটা অটল উদ্দেশ্য। এমন নিষ্কাম পুরুষ দেখে বিষ্ণুর মন গলে গেল।
“বর চাও, গরুড়। যা চাও, তাই দেব।”
গরুড়ের উত্তর এল শান্ত, গভীর গলায়—যেন আকাশেরই কথা বলছেন তিনি।
“আমাকে আপনার ধ্বজায় স্থান দিন। আর অমৃত ছাড়াই, শুধু আপনার কৃপায় আমাকে অমরত্ব দিন।”
বিষ্ণু হাসলেন। সঙ্গে সঙ্গে বর দিয়ে দিলেন।
তখন গরুড় ফিরিয়ে বললেন, “এবার আমিও আপনাকে একটা বর দিতে চাই। যা চান, বলুন।”
বিষ্ণু মৃদু হেসে বললেন, “তবে তুমি আমার বাহন হও। সকল লোকের মধ্যে আমাকে বয়ে নিয়ে বেড়াও।”
গরুড় সম্মত হলেন। সেই মুহূর্ত থেকেই গড়ে উঠল বিষ্ণু ও গরুড়ের চিরন্তন বন্ধন—সম্মানের, প্রেমের, ইচ্ছার বন্ধন। অমৃতের কলস নিয়ে গরুড় আবার উড়ে চললেন।
নীচে স্বর্গে ইন্দ্র বুঝতে পেরেছিলেন সবকিছু। রাগে তাঁর বুক জ্বলে উঠল। নাগদের হাতে অমৃত পড়লে ত্রিলোক বিপর্যস্ত হয়ে যাবে। তিনি পূর্ণ শক্তিতে বজ্র নিক্ষেপ করলেন গরুড়ের দিকে।
বজ্র আঘাত করল। গরুড়ের শরীরে রক্তের দাগ পড়ল।
কিন্তু সেই মহান পাখি একটুও টললেন না। চিৎকার করলেন না, রাগ করলেন না। বরং এক অপূর্ব হাসি ফুটে উঠল তাঁর ঠোঁটে। শান্ত গলায় বললেন,
“বজ্রের নির্মাতাকে সম্মান করে আমি নিজেই একটা পালক কেটে ফেলছি। কিন্তু জেনে রাখো, ইন্দ্র—তুমি আমাকে আটকাতে পারবে না। আমি তোমার নাগালের বাইরে।”
সেই দৃশ্য দেখে সারা বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে গেল। যারা দেখলেন, তারা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন—
“এই অপূর্ব ডানাওয়ালা পাখিকে বলা হোক সুপর্ণ! গৌরবময় পালকের অধিকারী!”
ইন্দ্র নিজেও অবাক হয়ে গেলেন। এমন শক্তি আর এমন শান্তি একসঙ্গে কখনো দেখেননি। তিনি নেমে এলেন গরুড়ের কাছে।
“মহান, তোমার শক্তি বুঝতে চাই। আর তোমার বন্ধু হতে চাই।”
গরুড় উষ্ণ হাসিতে বললেন, “তাই হোক। আমরা বন্ধু হলাম।”
তারপর সরলভাবে বললেন নিজের শক্তির কথা—কোনো অহংকার ছাড়াই।
“আমি এই সমস্ত পৃথিবী—তোমাকে আর সবকিছু নিয়ে—এক হাতে তুলে আকাশে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারি, কোনো কষ্ট ছাড়াই।”
ইন্দ্র বিশ্বাস করলেন। তারপর যুক্তি দেখালেন,
“তুমি যদি অমৃত না চাও, তবে আমাকে ফিরিয়ে দাও। যারা এটা পান করবে, তারা আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে। তুমি জানো।”
গরুড় মাথা নাড়লেন।
“আমিও চাই না কেউ এটা পান করুক। আমি কলসটাকে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দেব। তুমি জানো কোথায়। সেখান থেকে তুমি নিজে এসে নিয়ে যেও।”
ইন্দ্রের বুক থেকে পাথর নেমে গেল। তিনি বললেন, “যা চাও, বর নাও।”
গরুড় ভাবলেন মায়ের কথা। সেই অপমানের বছরগুলো, কদ্রু আর নাগদের অত্যাচার। আর নিজের সেই দীর্ঘ যাত্রার ক্ষুধার কথা।
সরলভাবে বললেন, “নাগেরা আমার খাদ্য হোক।”
বর দেওয়া হল।
গরুড় নেমে এলেন নাগদের সভায়। মা বিনতা সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন—এখনো বন্দিনী। তিনি কুশের আসনে অমৃতের কলস রেখে বললেন,
“এই নাও অমৃত। আমি কথা রেখেছি। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে খেয়ো না। আগে স্নান করো, শরীর-মন পবিত্র করো। যোগ্য হয়ে নাও। আর আমার মা—আমাদের চুক্তি শেষ। আজ থেকে তিনি মুক্ত।”
নাগেরা লোভে অন্ধ হয়ে ছুটল স্নান করতে। যেই তারা চলে গেল, অমনি ইন্দ্র আকাশ থেকে নেমে এসে অমৃতের কলস তুলে নিয়ে উধাও হয়ে গেলেন।
যখন নাগেরা ফিরে এল, দেখল শূন্য কুশাসন। কলস নেই। তাদের মুখে কথা নেই। ধীরে ধীরে সত্যটা তাদের ওপর ঠান্ডা ছায়ার মতো নেমে এল। এটাই তাদের কর্মফল। বিনতা আর তাঁর ছেলের প্রতি যে অপমান, যে নিষ্ঠুরতা, যে দাসত্ব—সব ফিরে এসেছে তাদেরই কাছে।
আর তাই বিনতা মুক্ত হলেন।
গরুড়—পাখিদের রাজা—মায়ের পাশে এসে বসলেন। আকাশ তাঁর রাজত্ব, বিষ্ণুর ধ্বজায় তাঁর ছবি, পৃথিবী তাঁর নাম জানে। কিন্তু সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল মায়ের মুখে ফুটে ওঠা সেই শান্তির হাসি।
বিনতা ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই অসাধারণ প্রাণী—তাঁর ধৈর্য আর যন্ত্রণার ফসল। অবশেষে তিনি শান্তি পেলেন।
সেই শান্তি যেন ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত আকাশে।
গরুড়ের ডানায় বয়ে চলল মুক্তির বাতাস—চিরকালের জন্য।

Comments
Post a Comment