কুন্তীর হস্তিনাপুর প্রর্তাপন
শতশৃঙ্গ পর্বতের নির্জন অরণ্যে তখন এক গভীর বিষণ্ণতা। রাজা পাণ্ডু আর নেই, নেই রূপসী মাদ্রীও। তাঁদের অন্ত্যেষ্টির পর অরণ্যচারী দেবর্ষি ও মুনিরা এক সভায় মিলিত হলেন। তাঁদের চোখেমুখে এক কঠিন কর্তব্যের ছাপ। একজন ঋষি ধীর গলায় বললেন, "পাণ্ডু তাঁর রাজ্য-ঐশ্বর্য ত্যাগ করে আমাদের আশ্রয়ে এসে কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন হয়েছিলেন। আজ তিনি স্বর্গবাসী, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর শোকাতুর পত্নী কুন্তী আর পাঁচজন কিশোর রাজপুত্রকে। আমাদের এখন দৈব কর্তব্য—পাণ্ডু ও মাদ্রীর অস্থিভস্ম এবং এই অসহায় পরিবারটিকে কুরুবংশের রাজধানী হস্তিনাপুরে পৌঁছে দেওয়া।"
হস্তিনাপুর—সেই প্রাচীন নগরী, যা আজকের উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলা ছাড়িয়ে গঙ্গার এক পুরোনো খাত ধরে জেগে থাকা টিলার মতো। মুনিরা পরামর্শ শেষ করে যাত্রা শুরু করলেন। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন তাঁরা হস্তিনাপুরের সিংহদারে উপস্থিত হলেন, তখন সারা নগরে শোরগোল পড়ে গেল। সাধারণ মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল অরণ্যচারী ঋষিদের দর্শনে।
রাজপ্রাসাদের অলিন্দে খবর পৌঁছাতেই বেরিয়ে এলেন কুরুবৃদ্ধ ভীষ্ম। তাঁর সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর এবং সেই বিচিত্র চরিত্রের বাহ্লীক।
বাহ্লীক সম্পর্কে ভীষ্মের জ্যাঠামশাই, যিনি শান্তনুর বড় ভাই হওয়া সত্ত্বেও সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন আফগানিস্তানের সেই সুদূর বলখ্ বা বাহ্লীক রাজ্যে। সঙ্গে তাঁর পুত্র সোমদত্ত—যাঁর রক্তে বইছে সাত্যকিদের বংশের সঙ্গে পুরনো এক প্রতিযোগিতার রেশ।
গান্ধারী আর কাশীরাজ কন্যারাও এসে দাঁড়ালেন। সকলের চোখে বিস্ময় আর কৌতূহল।
ঋষিদের মধ্যে একজন ধৃতরাষ্ট্র ও ভীষ্মের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, "মহারাজ পাণ্ডু রাজ্যসুখ তুচ্ছ করে আমাদের সঙ্গে বনবাসে ছিলেন।
ব্রহ্মচর্য পালনের কঠিন ব্রতের মাঝেও দেবতার আশীর্বাদে তিনি পাঁচটি রত্নসম পুত্র লাভ করেছিলেন। কুন্তীর গর্ভে যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুন; আর মাদ্রীর গর্ভে নকুল ও সহদেব। আজ সতেরো দিন হলো পাণ্ডু আমাদের ছেড়ে গেছেন, আর পতিপ্রাণা মাদ্রীও সহমরণে প্রাণ দিয়েছেন। এই তাঁদের অস্থি, আর এই পাঁচটি বালক। আজ থেকে এদের দায়িত্ব আপনাদের। আমরা আমাদের কর্তব্য শেষ করলাম।"
একথা বলেই মুনিরা অলৌকিক ভাবে যেন মিলিয়ে গেলেন অরণ্যের দিকে। সভাজুড়ে তখন নেমে এল পিনপতন নিস্তব্ধতা। পাণ্ডুর মৃত্যুসংবাদে ধৃতরাষ্ট্রের চোখে জল এল, যদিও তার গভীরে কোনো জটিল রাজনীতি ছিল কি না, তা মহাকালই জানে। তিনি তৎক্ষণাৎ বিদুরকে নির্দেশ দিলেন, "বিচক্ষণ বিদুর, গঙ্গার তীরে রাজকীয় সম্মানে পাণ্ডু ও মাদ্রীর অন্ত্যেষ্টির আয়োজন করো। অঢেল দানধ্যান করো দরিদ্রদের।"
গঙ্গার পবিত্র চরে অন্ত্যেষ্টির আগুন জ্বলে উঠল। সারা হস্তিনাপুর কান্নায় ভেঙে পড়ল প্রিয় রাজার অকাল প্রয়াণে। পরবর্তী বারোটি দিন কুরু বংশের কেউ পালঙ্কে শুলেন না, কোনো উৎসব হলো না প্রাসাদে। কৌরব, পাণ্ডব, মন্ত্রী এবং নাগরিকরা—সবাই মাটির বিছানায় শুয়ে শোক পালন করলেন। শোকের সেই মেঘ ঘনিয়ে রইল গঙ্গাতীরের বাতাস জুড়ে।
দ্বাদশ দিনের শেষে কুন্তী, ভীষ্ম ও ধৃতরাষ্ট্র মিলে শ্রাদ্ধের কাজ সম্পন্ন করলেন। প্রচুর ধনরত্ন ও অন্ন বিলিয়ে দিয়ে তাঁরা যখন প্রাসাদে ফিরলেন, তখন থেকেই শুরু হলো কুরুবংশের এক নতুন এবং রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের অলিখিত ভূমিকা।
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের লিঙ্কে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:

Comments
Post a Comment