কদ্রুর অভিশাপ: তক্ষক ও আস্তিকের সেই সন্ধিক্ষণ


কদ্রুর অভিশাপ: তক্ষক ও আস্তিকের সেই সন্ধিক্ষণ

আকাশের রঙ তখন ফিকে হয়ে আসছে। মহর্ষি কশ্যপের ঘরনি কদ্রু যখন দাঁড়ালেন, তাঁর চোখের মনিতে এক বিচিত্র কাঠিন্য। মাতৃত্বের সেই চিরচেনা স্নিগ্ধতা সেখানে নেই, আছে ক্ষমতার এক তীব্র দহন। কদ্রুর অজস্র   নাগের দল যখন বিনতাকে ছলনা করতে অস্বীকার করল—যে ছলনা ছিল নীচতার চরম পর্যায়—তখন কদ্রু ঘর সামলানো মা থেকে হয়ে উঠলেন এক প্রতিহিংসাপরায়ণ চণ্ডী।

তিনি তাঁর সন্তানদের অভয় দিলেন না, শাসনও করলেন না। পবিত্র অগ্নিকুণ্ডের সামনে দাঁড়িয়ে হাড়হিম করা গলায় দিলেন এক অভিশাপ— 'জনমেজয়ের সর্পসত্রে তোমরা সবাই পুড়ে খাক হয়ে যাবে।' অগ্নির শিখা সেদিন যেন ভয়ে একটু কেঁপে উঠেছিল। ব্রহ্মা শুনলেন, দেবতারাও নীরব থাকলেন। পৃথিবী থেকে বিষধর কালকূটদের বিনাশ হয়তো নিয়তিরই লিখন ছিল।

নাগলোকে তখন এক অবর্ণনীয় আতঙ্ক। বাসুকি, তক্ষক, ঐরাবত—যাঁরা যুগ যুগ ধরে কালকে শাসন করেছেন, তাঁদের বুকও আজ মায়ের অভিশাপে দুরুদুরু। মিটিং বসল নাগরাজ্যে। কেউ বলল যুদ্ধ করবেন, কেউ বললেন পালাবেন। আবার কেউ বললেন যজ্ঞ যে সব ব্রাহ্মণ করবেন তাদের হত্যা করবে। তক্ষকের উদ্ধত ফণা অব্দি আজ নুয়ে পড়েছে। কিন্তু বাসুকি জানতেন, ব্রাহ্মণ হত্যা করে মুক্তি মিলবে না। তখনই এক কোণ থেকে এক ভাই এলাপত্র বলে উঠলেন এক গুপ্ত দেবতাদের কথা যেটা সে শুনেছে যখন মাতা কদ্রু অভিশাপ দিচ্ছিল— 'অভিশাপ খণ্ডানো যায় না ঠিকই, কিন্তু যজ্ঞ তো বন্ধ করা যায়! সেটা সম্ভব ব্রাহ্মণ কুমার আস্তিকের দ্বারা!'

গল্পের মোড় ঘুরল আরও কয়েক পুরুষ পেছনে। অর্জুনের বংশধর রাজা জনমেজয় তখন রাগে আর শোকে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য। তাঁর বাবা পরীক্ষিৎকে দংশন করেছে তক্ষক। সেই ব্যক্তিগত শোক যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসায় পরিণত হলো, শুরু হলো 'সর্পসত্র'। যজ্ঞের আগুনের এমন এক টান যে, আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে সাপেরা। বড়, ছোট, বিষধর—কেউ বাদ যাচ্ছে না। বাসুকি নিজেও অনুভব করছেন সেই আগুনের টান।

ঠিক এই চরম মুহূর্তে রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করলেন আস্তিক। জারৎকারু মুনি আর বাসুকির বোন জারৎকারুর সন্তান। অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক নাগ—অথচ আগাগোড়া এক স্থিতপ্রধজ্ঞ ব্রাহ্মণ। আস্তিক যখন জনমেজয়ের সভায় ঢুকলেন, তাঁর চোখেমুখে কোনো ত্রাস ছিল না। বরং এক অদ্ভুত তেজ আর মাধুর্য দিয়ে তিনি মুগ্ধ করলেন রাজাকে।

জনমেজয় বললেন, 'বর চান ব্রাহ্মণ কুমার! যা চাইবেন তাই দেব।'

আস্তিক এক মুহূর্ত থামলেন। তারপর খুব শান্ত স্বরে বললেন, 'যজ্ঞ বন্ধ করুন, মহারাজ।'

পুরো সভা স্তম্ভিত। যজ্ঞ তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এমনকি ইন্দ্রের সিংহাসনে লুকিয়ে থাকা তক্ষকও তখন আগুনের টানে আকাশ থেকে খসে পড়ার উপক্রম।  ঋষিরা  চিৎকার করে উঠলেন। কিন্তু রাজার কথা তো কথার কথা নয়। জনমেজয় বুঝলেন, প্রতিহিংসার চেয়ে সত্যরক্ষার মর্যাদা অনেক বেশি। তিনি মাথা নোয়ালেন— 'তথাস্তু।'

যজ্ঞের আগুন নিভে এল। আকাশ থেকে ঝরে পড়া নাগরা প্রাণে বাঁচল। কদ্রুর অভিশাপের মর্যাদা রক্ষা হলো ঠিকই, কিন্তু আস্তিকের বুদ্ধিতে ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে গেল কুল। বাসুকি সেদিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত হলেন।  মানুষের দম্ভ আর প্রতিহিংসা যখন আগুনের মতো সব জ্বালিয়ে দিতে চায়, তখন কোনো এক আস্তিককেই ফিরে আসতে হয়। অস্ত্র দিয়ে নয়, আসুরিক শক্তি দিয়েও নয়—কেবল সত্য আর সঠিক শব্দের জোরেই পৃথিবীর সব বিষক্ষয় করা সম্ভব।

রক্তক্ষয়ী প্রতিহিংসার চেয়ে একজন রাজার দেওয়া কথা রক্ষা করা যে কত বড় মহিমা, মহাকালের পাতায় সেই দিনটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা রইল।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:

WhatsApp করুন


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া