পাত্রে জন্মানো এক যোদ্ধা:এক ব্রাহ্মণের অপমান কীভাবে তৈরি করল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধরকে-
পাত্রে জন্মানো এক যোদ্ধা:এক ব্রাহ্মণের অপমান কীভাবে তৈরি করল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধরকে-
কিছু গল্পের শুরু হয় অলৌকিকতায়, আর শেষ হয় এমন এক ক্ষতে যা কোনোদিন শুকোয় না। দ্রোণের গল্পটাও ঠিক তেমনই।
গল্পের শুরু গঙ্গার তীরে। মহর্ষি ভরদ্বাজ সেদিন সকালে স্নান করতে নেমেছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল অপ্সরা ঘৃতাচী—অপরূপা, জ্যোতির্ময়ী, যার দিক থেকে চোখ ফেরানো দায়। ঋষির সংযম টলল। তাঁর তেজ স্খলিত হয়ে পড়ল কাছেই রাখা এক মৃন্ময় পাত্র বা দ্রোণ-এ। সেই মাটির পাত্র থেকেই জন্ম নিল এক ফুটফুটে শিশু। নাম রাখা হলো দ্রোণ। প্রথম নিশ্বাস থেকেই বোঝা গিয়েছিল, এই বালক সাধারণ হতে আসেনি।
পিতার আশ্রমে বেড়ে ওঠা দ্রোণ যখন সমবয়সীদের সঙ্গে বেদ পাঠ শুরু করলেন, দেখা গেল তাঁর মেধা প্রখর। কিন্তু শুধু শাস্ত্রের শ্লোক আওড়ে তো জীবন চলে না। দ্রোণের দু-চোখে তখন অন্য স্বপ্ন—অস্ত্রবিদ্যার স্বপ্ন। ধনুর্বিদ্যা, তলোয়ারের কৌশল, আর সেই সব অলৌকিক অস্ত্র যা আকাশ থেকে আগুন আর বজ্র নামিয়ে আনতে পারে। পিতার শিষ্য অগ্নিবেশ্যের কাছে তিনি পাঠ শুরু করলেন। দ্রোণ ছিলেন এক ভয়ংকর ছাত্র—ক্ষিপ্র, নিখুঁত এবং অদম্য। অল্পদিনেই তিনি ছাড়িয়ে গেলেন সবাইকে।
সেই গুরুকুলেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল দ্রুপদের।
দ্রুপদ ছিলেন পাঞ্চালরাজ পৃষতের একমাত্র সন্তান। রাজপুত্রের যা যা থাকে—ঐশ্বর্য, দম্ভ আর ক্ষমতার উত্তাপ—তার সবটাই ছিল দ্রুপদের। আর দ্রোণ ছিলেন এক নিঃস্ব ব্রাহ্মণ। কিন্তু বন্ধুত্ব তো আর বৈভব বিচার করে আসে না। দুজনে একসঙ্গে খেলতেন, অস্ত্রচর্চা করতেন। একদিন আবেগের বশে দ্রুপদ দ্রোণের হাত চেপে ধরে বলেছিলেন, "বন্ধু, আমি যখন রাজা হব, আমার অর্ধেক রাজ্য তোমার হবে। আমার যা কিছু আছে, সব তোমার। আমাদের এই বন্ধুত্ব কোনোদিন ফিকে হবে না।"
দ্রোণ সেদিন বন্ধুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, রাজপুত্রের কথা আর পাথরের রেখা একই।
সময় বয়ে গেল। দ্রোণ বিবাহ করলেন বিদুষী কৃপীকে। তাঁদের কোলে এল এক আশ্চর্য সন্তান—জন্মের পরই যার কান্না শোনা গিয়েছিল ঘোড়ার হ্রেসাধ্বনির মতো। কপালে এক অদ্ভূত জ্যোতি। নাম রাখা হলো অশ্বত্থামা। দ্রোণ তাঁর এই ছেলেকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। কিন্তু শুধু ভালোবাসা দিয়ে তো আর পেট ভরে না।
সংসারে চরম দারিদ্র্য। বনের ফলমূল আর ভিক্ষায় যা জুটত, তাই দিয়ে দিন কাটত তাঁদের। একদিন অশ্বত্থামা তৃষ্ণার্ত হয়ে বন্ধুদের কাছে দুধ চেয়েছিল। বাচ্চারা তো নিষ্ঠুর হয়, তারা মজা করার জন্য চালের গুঁড়ো মেশানো জল অশ্বত্থামাকে দুধ বলে খাইয়ে দিল। সেই সাদা জল খেয়েই পরম তৃপ্তিতে অশ্বত্থামা নেচে নেচে বলতে লাগল, সে আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দুধ খেয়েছে!
দ্রোণ যখন এই খবর পেলেন, অপমানে তাঁর মাথা কাটা গেল। তাঁর সন্তানকে নিয়ে উপহাস! তাঁর দারিদ্র্য আজ তাঁর পিতৃত্বকে বিদ্রূপ করছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁর মনে পড়ে গেল সেই পুরনো দিনের কথা।
কাম্পিল্য নগরীর সিংহাসন। অর্ধেক রাজ্য। সেই বন্ধু দ্রুপদ।
দ্রোণ রওনা হলেন পাঞ্চালে।
পাঞ্চালের রাজসভা তখন জৌলুসে টগবগ করছে। সাধারণ ব্রাহ্মণের বেশে দ্রোণ যখন রাজসভায় ঢুকলেন, তাঁর চোখে ছিল ভরসা। তিনি রাজাকে বললেন, "মহারাজ, আমাকে চিনতে পারছেন? আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি। আপনি বলেছিলেন আপনার ঐশ্বর্যের অংশীদার আমি হবো। আমি ভিক্ষা চাইছি না বন্ধু, আমি আমার পাওনা চাইতে এসেছি। আমার ছেলের জন্য একটু দুধের ব্যবস্থা করুন।"
দ্রুপদ সিংহাসন থেকে নিস্পৃহ চোখে তাকালেন। তারপর অবজ্ঞার হাসিতে ফেটে পড়লেন। তিনি বললেন, "বন্ধুত্ব কেবল সমান সমান মানুষের মধ্যেই হতে পারে। তুমি এক দরিদ্র ভিখারি ব্রাহ্মণ, আর আমি অধীশ্বর। ছোটবেলার সেই দিনগুলো এখন অতীত। রাজাদের সঙ্গে ভিখারিদের কোনো বন্ধুত্ব হয় না। বিদায় হও, পুরনো স্মৃতি নিয়ে আমাকে আর বিরক্ত করো না।"
সভাসদদের হাসির শব্দে যেন দ্রোণের কানে তপ্ত সিসা ঢেলে দেওয়া হলো। তিনি চিৎকার করলেন না, কান্নাকাটিও করলেন না। নিঃশব্দে রাজসভা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে ওই মানুষটার ভেতরে যেন তুষের আগুন জ্বলতে শুরু করল। তিনি মনে মনে শপথ নিলেন—এই দম্ভ আমি চূর্ণ করব। তুমি যা দিতে অস্বীকার করলে, তা আমি কেড়ে নেব।
শুনেছিলেন পরশুরাম সব দান করে দিয়ে মহেন্দ্র পর্বতে তপস্যায় যাচ্ছেন। দ্রোণ সেখানে পৌঁছলেন। তাঁর পরিচয় দিয়ে বললেন, "আমি ভরদ্বাজপুত্র দ্রোণ, আমার গর্ভজাত জন্ম নয়। আমি আপনার শরণ নিলাম।"
পরশুরাম ততক্ষণে তাঁর সমস্ত সোনা, হাতি, ঘোড়া দান করে দিয়েছেন। ঋষি কশ্যপকে দিয়ে দিয়েছেন সমস্ত পৃথিবী। তিনি নিঃস্ব। পরশুরাম বললেন, "আমার কাছে আর কিছুই নেই ব্রাহ্মণ। তুমি এখন কী চাও?"
দ্রোণের চোখ তখন স্থির। তিনি বললেন, "তবে আমাকে আপনার সমস্ত দিব্যাস্ত্র দিন। আমাকে শিখিয়ে দিন যুদ্ধের চরম কৌশল।"
পরশুরাম মাথা নাড়লেন। এক ব্রাহ্মণকে তিনি নিজের জীবনের সমস্ত রণকৌশল দান করলেন। মহেন্দ্র পর্বত থেকে যখন দ্রোণ নামছেন, তখন তিনি আর সেই শান্ত ব্রাহ্মণ নেই—তিনি তখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সমরবিদ।
স্ত্রী ও পুত্রকে নিয়ে দ্রোণ এলেন হস্তিনাপুরে। একদিন রাজপ্রাসাদের কাছেই তিনি দেখলেন, একদল কিশোর কুয়োর চারধারে ভিড় করে আছে। কৌরব আর পাণ্ডব ভাইদের বলটি কুয়োর গভীর অন্ধকারে পড়ে গেছে।
দ্রোণ মুচকি হাসলেন। তারপর হাতের কাছে থাকা একমুঠো শর বা ঘাস তুললেন। মন্ত্র পড়ে একটার পর একটা ঘাস বিঁধিয়ে তিনি সেই বলটিকে কুয়ো থেকে গেঁথে তুলে আনলেন, ঠিক যেন জলের গ্লাস থেকে চামচ তোলা!
রাজপুত্ররা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। একজন জিজ্ঞাসা করল, "আপনি কে?"
দ্রোণ শান্তস্বরে বললেন, "ভীষ্মকে গিয়ে বলো। তিনিই জানবেন।"
ভীষ্ম সব শুনলেন। তিনি দ্রোণকে সসম্মানে নিয়ে এলেন। বুঝলেন এই মানুষটিই পারেন কুরুবংশের রাজপুত্রদের যোগ্য যোদ্ধা বানাতে। তিনি দ্রোণকে 'রাজগুরু' পদে বরণ করলেন। দ্রোণ তাঁর শিষ্যদের উজাড় করে শেখাতে শুরু করলেন—ধনুবিদ্যা, তলোয়ার, গদা আর রণনীতি। তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল দিগন্ত থেকে দিগন্তে।
কিন্তু অর্জুনকে যখন তিনি লক্ষ্যভেদ শেখাতেন, বা অশ্বত্থামাকে যুদ্ধের গুহ্যমন্ত্র দিতেন, তখনো তাঁর মনের কোণে একটা ছবি স্থির হয়ে থাকত—সিংহাসনে বসে হাসছে এক অহংকারী রাজা।
দ্রোণ জানতেন, সেই অপমানের শোধ নেওয়া এখনও বাকি।
এই গল্প আমাদের শেখায় যে, মেধা এবং প্রতিভা যখন অবজ্ঞার শিকার হয়, তখন তা এক ভয়ংকর শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। কিন্তু প্রতিশোধের আগুন কেবল শত্রুকে নয়, অনেক সময় নিজেকেও দগ্ধ করে। দ্রোণের জীবন একাধারে শ্রেষ্ঠত্বের শিখর এবং এক গভীর অভিমানে দগ্ধ এক মানুষের আখ্যান।

Comments
Post a Comment