রাজা যযাতির পতন ও মুক্তি
রাজা যযাতির পতন ও মুক্তি
মর্ত্যের নশ্বর শরীর ত্যাগ করার পর রাজা যযাতি স্বর্গে আরোহণ করলেন। সেখানে সহস্র বছর দেবরাজ ইন্দ্র, সাধ্য, মরুৎ আর বসুদের গভীর শ্রদ্ধায় কাটল তাঁর সময়। দেবলোকেও যযাতি ছিলেন অত্যন্ত আদৃত।
একদিন ইন্দ্র সহাস্যে যযাতিকে জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা যযাতি, তুমি যখন তোমার জরা ব্যাধি ফিরিয়ে নিয়ে পুত্র পুরুকে যৌবন দান করলে আর তাকে সিংহাসনে বসিয়ে এলে, তখন শেষবার তাকে কী উপদেশ দিয়েছিলে?"
যযাতি ধীর স্বরে উত্তর দিলেন, "আমি তাকে বলেছিলাম—গঙ্গা আর যমুনার মধ্যবর্তী ভূখণ্ড তোমার হোক, আর প্রান্তিক ভূমিগুলি হোক তোমার ভ্রাতাদের। তবে মনে রেখো পুরু, ক্রোধের চেয়ে ক্ষমা মহৎ, অসহিষ্ণুতার চেয়ে সহিষ্ণুতাই বড় শক্তি। মানুষের পরিচয় তার মস্তব্যে নয়, তার মনুষ্যত্বে। যারা কটু কথা বলে, তারা নিজের জীবনে অমঙ্গলকেই নিমন্ত্রণ করে। তিরস্কার সয়ে যাওয়া তীরন্দাজের তূণ থেকে নিক্ষিপ্ত তীরের চেয়েও কষ্টকর হতে পারে, কিন্তু বীরের ধর্ম হলো শান্ত থাকা। কিছু প্রত্যাশা না করে মানুষের সেবা করাই এই ত্রিভুবনের শ্রেষ্ঠ ধর্ম।"
অহংকার ও পতন
যযাতির কথা শুনে ইন্দ্র মুগ্ধ হলেন ঠিকই, কিন্তু হঠাৎই এক কূট প্রশ্ন করলেন, "নহুষ-পুত্র, তুমি তো অনেক তপস্যা করেছ। সত্যি করে বলো তো, তোমার সমান তেজস্বী আর কে আছে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে?"
যযাতি মুহূর্তের জন্য আত্মসংবরণ করতে পারলেন না। তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠল দম্ভের সুর। তিনি বললেন, "দেবরাজ, দেবকুল, মর্ত্যলোক বা ঋষিদের মাঝে আমার সমান পুণ্যবান আর কেউ আছে বলে তো আমি দেখি না!"
ইন্দ্রের মুখ মেঘাচ্ছন্ন হলো। তিনি ধিক্কার দিয়ে বললেন, "ধিক্ যযাতি! তুমি অপরের মহিমা না জেনেই নিজেকে বড় বললে আর অন্যকে তুচ্ছ করলে। অহংকার মানুষের অন্তরের আকাশকে ছোট করে দেয়। তোমার সমস্ত অর্জিত পুণ্য আজ এই মুহূর্তেই শেষ হলো।"
যযাতি নিজের ভুল বুঝতে পেরে মাথা নত করলেন। বিনীতভাবে বললেন, "যদি পতন অনিবার্যই হয়, তবে যেন আমি পৃথিবীর কোনো সাধু-সন্তের দলেই গিয়ে পড়ি।" ইন্দ্র তাতে সম্মতি দিলেন।
মর্ত্যের ধুলোয় সত্যের পাঠ
স্বর্গ থেকে বিচ্যুত হয়ে যযাতি নেমে এলেন মর্ত্যে। সেখানে তিনি চার মহৎ ঋষি—অষ্টক, প্রতর্দন, বসুমান আর শিবীর সাক্ষাৎ পেলেন। অষ্টক তাঁকে দেখে বিস্মিত হয়ে বললেন, "আপনার কান্তি তো ইন্দ্রের মতো! কে আপনি? ভয় নেই, ঋষিদের আশ্রমে দেবরাজও আপনার অনিষ্ট করতে পারবেন না।"
যযাতি নিঃসংকোচে নিজের অহংকারের কথা স্বীকার করলেন। তিনি বললেন, "অহংকার মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। আজ আমি বুঝেছি, সুখ আর দুঃখ তো ছায়ার মতো—আসে আর যায়। যে মানুষ ভাগ্যকে স্বীকার করে শান্ত থাকতে পারে, সেই প্রকৃত জ্ঞানী।"
অষ্টক কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন, "স্বর্গের পর আপনি কোথায় কোথায় বাস করেছেন?"
যযাতি স্মৃতিরোমন্থন করে বললেন, "আমি হাজার বছর মহর্লোকে, হাজার বছর ইন্দ্রপুরীতে, আর লক্ষ বছর নন্দনকাননে আমোদে কাটিয়েছি। কিন্তু ভোগের নেশায় মগ্ন হয়ে আমি ধর্মের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। যেমন সম্পদ হারিয়ে গেলে বন্ধুরা ত্যাগ করে, তেমনি পুণ্য হারিয়ে গেলে দেবতারাও আড়াল হন।"
স্বর্গের সাতটি দ্বার
ঋষিরা তাঁর প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হলেন। অষ্টক জানতে চাইলেন, "স্বর্গে যাওয়ার প্রকৃত পথ কোনটি?"
যযাতি উত্তর দিলেন, "স্বর্গের সাতটি দ্বার আছে—দান,দম, তপস্যা, আত্মসংযম, বিনয়, সরলতা আর সর্বোপরি দয়া। কিন্তু অহংকার এই সব পথ বন্ধ করে দেয়। সম্মানে গর্বিত না হওয়া আর অপমানে বিচলিত না হওয়া—এটাই হলো সত্যের পথ।"
তিনি আরও বুঝিয়ে বললেন চতুর্বর্ণের ধর্মের কথা। ব্রহ্মচারী হবে বিনয়ী, গৃহস্থ হবে সৎ ও অতিথি-সেবক, বানপ্রস্থী হবে নির্লোভ আর সন্ন্যাসী হবে আসক্তিহীন।
প্রত্যাবর্তন
বিদায়ের সময় উপস্থিত হলো। যযাতির পুণ্য শেষ, তাই তাঁকে আরও নিচে নামতে হবে। কিন্তু ঋষিরা তাঁর সাহচর্যে এতটাই অভিভূত ছিলেন যে, তাঁরা নিজেদের উপার্জিত পুণ্য যযাতিকে দান করতে চাইলেন। অষ্টক, প্রতর্দন, বসুমান আর শিবী একে একে এগিয়ে এলেন।
কিন্তু যযাতি দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি বললেন, "আমি রাজা। অপরের দান গ্রহণ করা আমার ধর্ম নয়। নিজের অর্জিত পুণ্যেই আমি স্বর্গে ফিরতে চাই, পরের অর্জিত শ্রমে নয়।"
ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশ থেকে পাঁচটি জ্যোতির্ময় স্বর্ণরথ নেমে এল। যযাতি ঋষিদের বললেন, "চলুন, আমরা একসাথেই যাই।"
রথে ওঠার পর দেখা গেল শিবীর রথ সবার আগে এগিয়ে যাচ্ছে। অষ্টক কারণ জানতে চাইলে যযাতি মৃদু হেসে বললেন, "শিবী তাঁর জীবনে সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন, কিন্তু কখনও অহংকার করেননি। তাই তিনি আমাদের অগ্রগামী।"
যযাতি নিজের পরিচয় দিলেন এবং বিনয় আর সত্যের জোরে আবার স্বর্গে স্থান ফিরে পেলেন। এই কাহিনির শেষ কথা একটাই—অহংকার যা কেড়ে নেয়, বিনয় তা বহুগুণ বাড়িয়ে ফিরিয়ে দেয়।
মূল শিক্ষা: ক্ষমতা বা দম্ভে নয়, মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব লুকিয়ে থাকে তার চরিত্রে আর ত্যাগের মহিমায়।

Comments
Post a Comment