সমুদ্রমন্থন: অমৃতের অধিকার ও এক চিরস্থায়ী প্রতিশোধ

 


সমুদ্রমন্থন: অমৃতের অধিকার ও এক চিরস্থায়ী প্রতিশোধ

দেবতারা তখন শ্রীহীন, তেজহীন। মহর্ষি দুর্বাশার অভিশাপে তাঁদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। স্বর্গ তখন এক ধূসর রাজ্য, যেখানে শক্তির বদলে হাহাকার ঘুরে বেড়ায়। এই হীনবল অবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়—অমৃত। সেই অমৃত যা লুকিয়ে আছে আদিম সমুদ্রের অতল গর্ভে। কিন্তু মহাসমুদ্রের জলরাশি মন্থন করা তো একা দেবতাদের সাধ্য নয়। অগত্যা চিরশত্রু দানবদের সঙ্গে সন্ধি করতে হলো। লোভ বড় বালাই, অমৃতের ভাগ পাওয়ার আশায় অসুররা রাজি হয়ে গেল সেই অসম্ভব শ্রমে।

উপাখ্যানে বলা হয়, মন্দার পর্বত হলো মন্থনদণ্ড আর নাগরাজ বাসুকি হলেন রশি। একপাশে দেবতারা, অন্যপাশে অসুররা—শুরু হলো এক মহাকাব্যিক টানাপোড়েন। সমুদ্রের নীল জল ফুঁসতে লাগল, ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ল আকাশের গায়ে। শ্রমের ঘাম আর সমুদ্রের নোনা জল একাকার হয়ে গেল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন দিব্য বৈদ্য ধন্বন্তরি অমৃতের কলস নিয়ে উঠে এলেন, তখন মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেল দৃশ্যপট। প্রতিজ্ঞা আর চুক্তির কথা ভুলে গিয়ে অসুররা এক হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নিল সেই কলস। শুরু হলো অধিকারের লড়াই।

বিষ্ণু জানতেন, গায়ের জোরে অসুরদের হারানো কঠিন। তাই তিনি নিলেন মায়াবী রূপ—মোহিনী। এমন এক নারীমূর্তি, যার রূপের মায়ায় দিকবিদিশ ভুলে গেল অসুররা। সেই রূপের ছটায় বিভ্রান্ত হয়ে তারা যখন আচ্ছন্ন, তখন দেবতারা নিঃশব্দে পান করতে লাগলেন অমৃত। কিন্তু সেই ভিড়ে মিশে গিয়েছিল রাহু নামের এক চতুর অসুর। সে দেবতাদের সারিতে বসে যেই না অমৃতের স্বাদ নিয়েছে, অমনি চন্দ্র আর সূর্য তাকে চিনে ফেললেন। বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র বিদ্যুতের গতিতে রাহুর ধড় থেকে মুণ্ড আলাদা করে দিল। অমৃত তখন কেবল রাহুর গলাভদি পৌঁছেছে। তার দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ঠিকই, কিন্তু মুণ্ডটি অমর হয়ে গর্জাতে লাগল আকাশে। সেই থেকে চন্দ্র আর সূর্যের ওপর রাহুর সেই আদিম আক্রোশ। আজও গ্রহণের অন্ধকারে সেই প্রতিশোধের ছায়া দেখা যায়।

মোহিনী রূপ ত্যাগ করে বিষ্ণু যখন স্বরূপে ফিরলেন, অসুররা বুঝল তারা প্রতারিত হয়েছে। নিস্তব্ধ সমুদ্রতীরে এবার ফেটে পড়ল যুদ্ধের হাহাকার। গদা, তলোয়ার আর পাথরের আঘাতে পৃথিবী কেঁপে উঠল। সেই রণক্ষেত্রে আবির্ভূত হলেন দুই মহাতেজস্বী পুরুষ—নর আর নারায়ণ। বিষ্ণুরই দুই রূপ। নরের বাণবৃষ্টি আর নারায়ণের সেই প্রদীপ্ত চক্রের সামনে অসুররা খড়কুটোর মতো উড়ে যেতে লাগল। কত হাজার প্রাণ গেল তার ইয়ত্তা নেই। শেষমেশ পরাজিত অসুররা সমুদ্রের অতল অন্ধকারে কিংবা পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিল।

যুদ্ধ শেষ হলো। মন্দার পর্বত ফিরে গেল তার আপন স্থানে। দেবতারা ফিরে পেলেন তাঁদের হারানো স্বর্গ আর তেজ। এই মহাযুদ্ধে দেবতাদের পাশে বীরের মতো দাঁড়িয়েছিলেন নর, তিনিও পেলেন অমৃতের আস্বাদ।

সমুদ্র আবার শান্ত হলো। কিন্তু সেই দিনটি ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় হয়ে রইল—যেদিন অমৃতের সন্ধানে চরাচর মথিত হয়েছিল, আর এক ফোঁটা অমরত্বের জন্য দেব ও দানব একে অপরের রক্তে রাঙিয়েছিল এই ধরিত্রীকে। মন্থন শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই রেষারেষি আর প্রতিশোধের গল্প আজও শেষ হয়নি।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া