চিত্ররথ চূর্ণ: গঙ্গার ঘাটে বীরের পরীক্ষা
চিত্ররথ চূর্ণ: গঙ্গার ঘাটে বীরের পরীক্ষা
একচক্রার সেই নির্জন ব্রাহ্মণগৃহের দিনগুলো ফুরিয়ে এলো। মহর্ষি ব্যাসদেব এসে যখন গন্তব্য স্থির করে দিয়ে গেলেন, তখন কুন্তী আর তাঁর পাঁচ পুত্র বুঝলেন, এবার শিকড় উপড়ানোর সময় হয়েছে। পাণ্ডবদের এই যাযাবর জীবন যেন এক অন্তহীন মহাকাব্য। ধুলোমাখা পথ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আর বুকে একরাশ অভিমান নিয়ে তাঁরা পা বাড়ালেন পাঞ্চাল দেশের দিকে। লক্ষ্য—রাজা দ্রুপদের কন্যার স্বয়ংবর সভা।
দিনের আলোয় পথ চলা, আর রাত নামলে কোনো মহীরুহের ছায়ায় আশ্রয়। ক্লান্ত শরীর, কিন্তু মনে দ্রৌপদীর রূপকথার হাতছানি। একদিন গোধূলির ম্লান আলোয় তাঁরা এসে পৌঁছলেন পুণ্যতোয়া গঙ্গার তীরে। চারপাশ নিঝুম, কেবল জলের কলতান। কিন্তু হঠাৎ সেই নির্জনতা ভেঙে ভেসে এল খিলখিল হাসি আর নুপুরের নিক্বণ। দেখা গেল, অলকানন্দার স্বচ্ছ সলিলে জলক্রীড়ায় মত্ত এক উদ্ধত পুরুষ—গন্ধর্বরাজ চিত্ররথ, যাঁর আর এক নাম অঙ্গারপর্ণ। তাঁর রথখানি যেন আকাশের বিদ্যুতকে বন্দি করে রেখেছে।
পাণ্ডবদের দেখা মাত্র চিত্ররথের ভ্রু কুঁচকে উঠল। আভিজাত্যের অহঙ্কারে অন্ধ হয়ে তিনি হাঁক ছাড়লেন, "থামুন হে মর্ত্যের তুচ্ছ মানবগণ! দেখছ না, এখানে আমি আমার মহিষীদের নিয়ে প্রমোদবিহারে মগ্ন? এই গঙ্গার তীর এখন গন্ধর্বদের অধিকারে। অবিলম্বে পিছু হঠো, নইলে আমার ক্রোধের শিখায় ভস্ম হয়ে যাবে।"
যুধিষ্ঠির চিরকালই শান্ত, ধীর। তিনি বিনীত স্বরে বললেন, "আমরা ক্লান্ত পথিক, পাঞ্চালের পথে চলেছি। গঙ্গা তো সবার মা, তাঁর ওপর কারও একার অধিকার সাজে না। আমাদের শান্তিতে যেতে দিন।"
কিন্তু বিনয় যেখানে দুর্বলতা মনে হয়, সেখানে সংঘাত অনিবার্য। চিত্ররথ অট্টহাসি হেসে উঠলেন। উপহাস আর তিরস্কারে বিদ্ধ করলেন পাণ্ডবদের। সেই উপহাসের উত্তর দিতে এগিয়ে এলেন অর্জুন। মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল গঙ্গার শান্ত পরিবেশ। গন্ধর্বদের মায়াবী যুদ্ধ আর তীরের বর্ষণে আকাশ ছেয়ে গেল। ভীম, নকুল আর সহদেব বীর বিক্রমে লড়াই শুরু করলেন ঠিকই, কিন্তু মূল যুদ্ধটা হলো অর্জুন আর চিত্ররথের মধ্যে।
চিত্ররথ মায়া বিস্তার করলেন, দিকবিদিক থেকে তাঁর প্রতিচ্ছবি আক্রমণ করতে লাগল। কিন্তু দ্রোণাচার্যের প্রিয় শিষ্যটি আজ অদম্য। অর্জুন আবাহন করলেন অগ্নির—হাতে তুলে নিলেন সেই অমোঘ **আগ্নেয়াস্ত্র**।
আকাশ ফেটে আগুনের বৃষ্টি নামল। চিত্ররথের মায়াজাল পুড়ে ছাই হয়ে গেল, দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল তাঁর রথ। পরাজয় নিশ্চিত বুঝে চিত্ররথের পত্নী কুন্তিনিষা ছুটে এসে অর্জুনের কাছে পতির প্রাণভিক্ষা চাইলেন। কুন্তীও পুত্রকে বললেন, "অর্জুন, পরাজিত শত্রুকে ক্ষমা করাই বীরের ধর্ম।"
অর্জুন ধনুক নামিয়ে নিলেন। অহঙ্কার চূর্ণ হওয়া চিত্ররথ তখন অন্য মানুষ। তিনি নতজানু হয়ে বললেন, "হে বীর, আমি বুঝতে পারিনি আপনি সাধারণ মানব নন। আপনার ব্রহ্মচর্য আর সংযমই আপনাকে এই অপরাজেয় শক্তি দিয়েছে। গন্ধর্বরা কেবল শুদ্ধতার কাছেই মাথা নোয়ায়।"
শত্রুতা মুছে গিয়ে সেখানে জন্ম নিল এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব। কৃতজ্ঞতার চিহ্ন হিসেবে চিত্ররথ অর্জুনকে দান করলেন 'চাক্ষুষী বিদ্যা'—যা দিয়ে ত্রিলোকের যে কোনো মায়া বা লুকানো দৃশ্য দেখে ফেলা যায়। সেই সঙ্গে উপহার দিলেন পাঁচ ভাইকে একশো করে বায়ুবেগী দিব্য ঘোড়া, যারা ডাকার সঙ্গে সঙ্গেই উপস্থিত হবে।
অর্জুন কিন্তু বিনামূল্যে কিছু নিতে নারাজ। তিনি বললেন, "বন্ধু, উপহারের প্রতিদান না দিলে আমার মন সায় দেয় না।" অর্জুন স্মিতহাস্যে তাঁকে নিজের সেই অব্যর্থ আগ্নেয়াস্ত্র উপহার দিলেন। অস্ত্রের বদলে বিদ্যা—এই তো বীরের বিনিময়।
বিদায়বেলায় চিত্ররথ ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, পাঞ্চালের রাজকন্যা তাঁদের ভাগ্য বদলে দেবেন। মন কিছুটা হালকা হলো পাণ্ডবদের। গঙ্গার জল ছুঁয়ে তাঁরা আবার পথ চলতে শুরু করলেন। সামনের ঝোপঝাড়ে ঢাকা আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে তাঁদের অপেক্ষা করছে এক নতুন ইতিহাস। সুনীল আকাশের নিচে পাঁচ ভাই আর তাঁদের জননী এগিয়ে চললেন সেই অনিবার্য স্বয়ংবরের দিকে, যা বদলে দেবে আর্যাবর্তের মানচিত্র।

Comments
Post a Comment