অরণ্যে আসা সেই রাজা দুষ্মন্ত
পুরুবংশের নৃপতি
তখন ধর্মের কাল। পৃথিবীতে ন্যায় আর নীতি তখন কোনো পুঁথির অক্ষর নয়, মানুষের নিশ্বাসের মতো স্বাভাবিক। সেই সময়ে কুরুজাঙ্গলে রাজত্ব করতেন পুরুবংশের শ্রেষ্ঠ সন্তান দুষ্মন্ত। তাঁর সাম্রাজ্য ছিল দিগন্তবিস্তৃত—সমুদ্রের নোনা জল ছুঁয়ে থাকা তটরেখা থেকে শুরু করে ম্লেচ্ছদের অধিকৃত দুর্গম প্রান্তর—সবই ছিল তাঁর একক ছত্রছায়ায়।
দুষ্মন্ত কেবল পেশিবহুল এক যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রজাপালনের এক ঋজু প্রতীক। তাঁর শাসনে প্রকৃতিও যেন অনুগত দাসের মতো আচরণ করত। সময়মতো বৃষ্টি নামত, পলি পড়া উর্বর জমিতে শস্যের ভারে নুয়ে পড়ত খেত। তাঁর রাজ্যে অভাব ছিল না, ছিল না চুরির ভয় কিংবা ক্ষুধার জ্বালা। ব্রাহ্মণরা নির্ভয়ে যজন-যাজন করতেন, আর সাধারণ মানুষ পরম শান্তিতে যাপন করত তাদের দিনরাত্রি।
ব্যক্তি হিসেবে দুষ্মন্ত ছিলেন এক বিস্ময়। ধনুর্বিদ্যায় তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু গদাযুদ্ধে তাঁর পারদর্শিতা ছিল ত্রিভুবনের আলোচনার বিষয়। ঘোড়া কিংবা হাতি—যেকোনো পশুর পিঠে বসলে মনে হতো না তিনি কোনো অবাধ্য প্রাণীকে শাসন করছেন, বরং মনে হতো তিনি তাদের মনের ভাষা বুঝতে পারছেন। রণাঙ্গনে তিনি বিষ্ণুর মতো সংহারক, আবার রাজসভায় সূর্যের মতো দীপ্তিময়। প্রজারা তাঁকে ভয় পেত না, শ্রদ্ধা করত। আর সেই শ্রদ্ধা তিনি আদায় করেননি, অর্জন করেছিলেন তাঁর ব্যক্তিত্ব দিয়ে।
অরণ্যের গভীরে
একদিন সকালে শিকারের নেশায় বের হলেন রাজা।
রাজধানীর কোলাহল ছাড়িয়ে, গ্রাম-গঞ্জের জনপদ পেরিয়ে তাঁর ঘোড়সোয়ার দল ঢুকে পড়ল নিবিড় অরণ্যে। যেখানে মহীরুহদের মাথার ওপর দিয়ে চুইয়ে আসা রোদ্দুর মাটির ওপর আলপনা আঁকে, আর বাতাসের ঘ্রাণে মেশানো থাকে বুনো ফুলের তীব্র মাদকতা।
অনেকটা পথ চলার পর বনের রূপ বদলে যেতে শুরু করল। চারপাশের অগোছালো জঙ্গল ঝোপঝাড় সরিয়ে দিয়ে যেন একটু বেশিই সুশৃঙ্খল হয়ে উঠল। গাছের শাখাগুলো ফলের ভারে অবনত, আর বাতাসে এক আশ্চর্য প্রশান্তি। রাজা অনুভব করলেন, এটা নিছক অরণ্য নয়
এ এক পবিত্র তপোবন।
ঘোড়ার খুরের শব্দও যেন এখানে এসে মৃদু হয়ে গেল। দূরে যজ্ঞের ধোঁয়ার সরু রেখা আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। রাজা ঘোড়া থেকে নামলেন। দেহরক্ষীদের পেছনে রেখে তিনি একাই পা বাড়ালেন সেই আশ্রমের দিকে।
আশ্রমের সেই কন্যা
মালিনী নদীর তীরে মহর্ষি কণ্বের তপোবন। কিন্তু রাজা যখন সেখানে পৌঁছালেন, কণ্ব তখন আশ্রমে নেই। তিনি ফলমূল সংগ্রহের জন্য বনের গভীরে গিয়েছেন। জনহীন সেই চত্বরে রাজা দেখলেন এক তরুণীকে।
সে শকুন্তলা।
দুষ্মন্ত থমকে দাঁড়ালেন। মেয়েটি বাগানের কাজে ব্যস্ত। তার চলায়-ফেরায় কোনো আড়ষ্টতা নেই, বরং আছে প্রকৃতির মতো এক সাবলীল ছন্দ। এমন রূপ রাজা রাজধানীতে অনেক দেখেছেন, কিন্তু এই অরণ্যচারিণী কন্যার অঙ্গে যে স্বর্গীয় আভা, তা অনন্য। তার চোখদুটো যেন কোনো গূঢ় সত্যের মতো শান্ত আর গভীর।
শকুন্তলা আগন্তুককে দেখে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। প্রাচীন অতিথিসেবার রীতি মেনে সে রাজাকে জল আর বিশ্রামের স্থান দিল। সহজ গলায় জানতে চাইল তাঁর আগমনের কারণ। দুষ্মন্ত মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে নিজের পরিচয় দিয়ে জানালেন, তিনি মহর্ষি কণ্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান।
তার জন্মকথা
আশ্রমের ছায়ায় বসে তারা গল্প শুরু করল। রাজা ভুলেই গেলেন তাঁর রাজ্য, তাঁর শিকার কিংবা তাঁর রাজধর্ম। তিনি কেবল এই মেয়েটির পরিচয় জানতে চাইলেন। শকুন্তলা তার জন্মের কাহিনী শোনাল কোনো দ্বিধা ছাড়াই।
সে এক অদ্ভুত গল্প। স্বর্গের অপ্সরা মেনকা আর কঠোর তপস্বী বিশ্বামিত্রের কন্যা সে। বিশ্বামিত্রের তপোবল যখন ইন্দ্রের সিংহাসন টলিয়ে দিচ্ছিল, তখন দেবরাজ মেনকাকে পাঠিয়েছিলেন সেই ধ্যান ভাঙতে। মেনকা সফল হয়েছিলেন, বিশ্বামিত্রের সংযম ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু অভিশপ্ত সেই মিলনের পর মেনকা যখন স্বর্গে ফিরে গেলেন, সদ্যোজাত এই কন্যাটিকে ফেলে রেখে গেলেন বনের নির্জনতায়। বনের পাখিরা তাদের ডানা দিয়ে আগলে রেখেছিল তাকে, যতক্ষণ না মহর্ষি কণ্ব তাকে খুঁজে পান। পাখিদের দ্বারা রক্ষিত হয়েছিল বলেই তার নাম ‘শকুন্তলা’।
দুষ্মন্ত মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। যে মেয়েটি আকাশ আর মাটির মিলনে জন্মেছে, তার প্রতি এক অলৌকিক আকর্ষণ অনুভব করলেন তিনি। তিনি শকুন্তলাকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন।
শকুন্তলা কিন্তু লজ্জায় মুখ ঢাকল না। সে বলল, “রাজা, আমার পিতা নেই। তিনি ফিরলে তাঁর কাছেই আপনি এই প্রস্তাব দিন।”
দুষ্মন্ত মৃদু হেসে যুক্তির আশ্রয় নিলেন। তিনি বোঝালেন, “শকুন্তলা, তুমি প্রাপ্তবয়স্ক। নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তোমার আছে। শাস্ত্র বলে, পরস্পর সম্মতিতে যে গান্ধর্ব বিবাহ, তা রাজাদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ। এখানে কোনো লুকোছাপা নেই, কোনো জোর নেই। আছে কেবল দুটো মনের সত্যকার সমর্পণ।”
শকুন্তলা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তার ধমনীতে বইছে অপ্সরা আর ঋষির রক্ত। সে দুষ্মন্তের চোখের দিকে তাকিয়ে এক কঠিন শর্ত রাখল— “আমাদের মিলনে যে পুত্র জন্মাবে, তাকেই আপনার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করতে হবে। এই আমার একমাত্র দাবি।”
দুষ্মন্ত এক মুহূর্তও ভাবলেন না। তিনি কথা দিলেন।
বনস্থলীর সেই পরিণয়
মালিনী নদীর কূলে, নীল আকাশের নিচে আর সাক্ষীহীন এই অরণ্যে কোনো পুরোহিত বা যজ্ঞাগ্নি ছাড়াই সম্পন্ন হলো দুষ্মন্ত আর শকুন্তলার গান্ধর্ব বিবাহ। সাক্ষী রইল কেবল বনের প্রাচীন বৃক্ষ আর উড়ে যাওয়া পাখিরা।
কয়েকটা দিন সেই তপোবনে কাটল স্বপ্নের মতো। সময় যেন সেখানে থমকে গিয়েছিল। কিন্তু রাজা বেশিক্ষণ তাঁর কর্তব্য থেকে দূরে থাকতে পারেন না। রাজধানীর ডাক এল।
বিদায়ের বেলা দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে কথা দিলেন, তিনি খুব শিগগির রাজকীয় পালকি পাঠাবেন তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। উপযুক্ত মর্যাদায় তাকে মহিষী করে নিয়ে যাবেন প্রাসাদে। রাজা তাঁর ঘোড়ায় চড়ে অরণ্যের অন্ধকার পথে মিলিয়ে গেলেন।
শকুন্তলা দাঁড়িয়ে রইল আশ্রমের প্রান্তে। ধুলোর মেঘ সরিয়ে রাজা চলে গেলেন, কিন্তু পড়ে রইল এক বুক অপেক্ষা আর অরণ্যের সেই নিবিড় স্তব্ধতা। সে তখনও জানত না, এই বিদায় কত দীর্ঘ হতে চলেছে।
পরের পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন।

Comments
Post a Comment