লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা
লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা
স্বয়ম্বর সভার সেই চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা আর রাজকীয় উন্মাদনা পেছনে ফেলে অর্জুন ও ভীম যখন দ্রৌপদীকে নিয়ে ফিরলেন, তখন চারদিকে সন্ধ্যার ম্লান আলো। পাণ্ডবেরা তখন ছদ্মবেশে এক কুমোরের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। ধুলোমাখা পথ, সাধারণ ব্রাহ্মণের বেশ, কিন্তু অর্জুনের চোখে তখন এক অদ্ভুত জয়ের দীপ্তি।
ঘরের দরজায় পৌঁছেই অর্জুন কৌতুকভরে মা কুন্তীকে ডেকে বললেন, "মা, দেখো আজ আমরা ভিক্ষায় কী এনেছি!"
কুন্তী তখন ঘরের ভেতর, অন্যমনস্ক। সন্তানদের ফেরার প্রতীক্ষায় থাকা জননী না দেখেই উত্তর দিলেন, "যা এনেছিস, তোরা পাঁচ ভাই সমান ভাগে ভাগ করে নে।"
কিন্তু বাইরে বেরিয়ে আসতেই কুন্তীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। অর্জুনের পাশে দাঁড়িয়ে এক অনিন্দ্যসুন্দরী নারী—দীপ্তিময়ী, যেন মর্ত্যে নেমে আসা কোনো দেবী। কুন্তী শিউরে উঠলেন। একি করলেন তিনি? তাঁর মুখনিসৃত বাক্য কি তবে মিথ্যে হয়ে যাবে? আর্যপুত্রদের জননী হিসেবে তাঁর কথা তো অলঙ্ঘ্য বিধান। বিষণ্ণ মনে তিনি যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, "পুত্র, আমি না জেনেই এক ঘোরতর অন্যায় করে ফেলেছি। এখন উপায় কী? আমার কথা তো ব্যর্থ হতে পারে না।"
শান্ত সমাহিত যুধিষ্ঠির কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, "মা, অনুতাপ করো না। হয়তো এটাই ভবিতব্য। মহর্ষি ব্যাসদেব আমাদের বলেছিলেন, পূর্বজন্মে এই দ্রৌপদী মহাদেবের কাছে পাঁচবার শ্রেষ্ঠ পতির বর চেয়েছিলেন। বিধাতার লিখন কে খণ্ডাবে?"
অর্জুন বিনীতভাবে বললেন, "দাদা, দ্রৌপদীকে আপনিই আগে গ্রহণ করুন। তারপর ভীম, আমি এবং নকুল-সহদেব।" কিন্তু যুধিষ্ঠির মাথা নাড়লেন। তিনি জানেন, বীরত্বের অধিকার আর জ্যেষ্ঠত্বের মর্যাদার সূক্ষ্ম লড়াই। তিনি বললেন, "না অর্জুন, তুমিই লক্ষ্যভেদ করেছো, এই কন্যার ওপর তোমারই প্রথম অধিকার।"
ঠিক সেই মুহূর্তে, কুমোরের সেই নিভৃত কুটিরে উপস্থিত হলেন কৃষ্ণ ও বলরাম। তাঁদের মুখে প্রশান্ত হাসি। যুধিষ্ঠির ও কুন্তীর চরণে প্রণাম জানিয়ে কৃষ্ণ বললেন, "স্বয়ম্বর সভাতেই আমি তোমাদের চিনেছি। দুর্যোধন আর পুরচনের সেই জতুগৃহের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। পাণ্ডবেরা জীবিত—এই সংবাদই আগামীর নতুন সূর্যোদয়ের ইঙ্গিত।" আশীর্বাদ জানিয়ে তাঁরা প্রস্থান করলেন।
ওদিকে দ্রৌপদীর ভাই ধৃষ্টদ্যুম্ন গোপনে পিছু নিয়েছিলেন। এই রহস্যময় ব্রাহ্মণদের আসল পরিচয় জানাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। তিনি আড়ালে থেকে লক্ষ্য করতে লাগলেন তাঁদের প্রতিটি চলন-বলন।
রাত নামল। কুন্তী পরম স্নেহে দ্রৌপদীকে কাছে টেনে নিলেন। সংসারের পাঠ শেখাতে শেখাতে বললেন, "মা, যা অন্ন সংগৃহীত হবে, তার অর্ধেকটা দেবে ভীমকে—ওর শরীরের যা গঠন, তাতে ওই খোরাক প্রয়োজন। বাকি অর্ধেক আমরা সবাই মিলে ভাগ করে নেব।" দ্রৌপদী নতজানু হয়ে সেই নির্দেশ মেনে নিলেন। রাজপ্রাসাদের বিলাস ত্যাগ করে এক নিমিষেই তিনি হয়ে উঠলেন এই পরিব্রাজক পরিবারের গৃহিণী।
রাত্রির গভীরে পাণ্ডবেরা মেঝেতে শুয়ে আছেন, শিয়রে মাতা কুন্তী আর পায়ের কাছে দ্রৌপদী। ঘুমানোর আগে ভাইদের মধ্যে আলাপ চলছে। কিন্তু সে আলাপ কোনো সাধারণ মানুষের নয়। তাঁদের কণ্ঠে রণকৌশল, রথ, ধনুর্বিদ্যা আর শ্রেষ্ঠ তলোয়ারের গল্প। দারিদ্র্যের ছদ্মবেশের নিচে যে বীরত্বের রক্ত টগবগ করছে, তা কি আর চাপা থাকে?
কুমোরের সেই জীর্ণ কুটিরে, অন্ধকারের বুক চিরে জন্ম নিচ্ছিল এক মহাকাব্যিক ভবিষ্যৎ। নিয়তি সেখানে নীরবে হাসছিল।

Comments
Post a Comment