জতুরগৃহ: ছদ্মবেশী আতিথেয়তার আড়ালে
জতুরগৃহ: ছদ্মবেশী আতিথেয়তার আড়ালে
এক ধরণের নিষ্ঠুরতা আছে যার গায়ে মাখা থাকে আতিথেয়তার চন্দন। সে হাসিমুখে দরজা খুলে দেয়, বিনীত হয়ে শোবার ঘরটা দেখিয়ে দেয়। তারপর যখন প্রদীপ নিভে আসে, চারদিক নিঝুম হয়ে যায়—তখন সে অন্ধকারের আড়ালে ওত পেতে বসে থাকে।
হস্তিনাপুর থেকে পাণ্ডবদের বারণাবত নির্বাসনের সিদ্ধান্ত যখন পাকা হয়ে গেল, তখন দুর্যোধনের চোখে-মুখে ফুটে উঠল এক নিষ্ঠুর সঙ্কল্পের আভা। তিনি আর ধৈর্য ধরতে রাজি নন। দীর্ঘদিনের লালিত পরিকল্পনা এবার বাস্তবায়নের সময় এসেছে। আর দুর্যোধন কোনোদিন ভাগ্যের ওপর ভরসা করার লোক ছিলেন না; তিনি চেয়েছিলেন এমন এক চূড়ান্ত পরিণতি, যার পর আর কোনো প্রশ্ন অবশিষ্ট থাকে না।
সেই নিভৃত কক্ষে ডাক পড়ল পুরোচনের।
পুরোচন দুর্যোধনের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এক মন্ত্রী। তবে এই বিশ্বাস প্রজ্ঞা বা সততার জন্য নয়, বরং এক ধারালো অস্ত্রের ওপর মানুষের যেমন বিশ্বাস থাকে—তেমন। পুরোচন ছিল আজ্ঞাবহ, যান্ত্রিক এবং বিবেকহীন। দুর্যোধনের কাছে এই নির্লিপ্ততাই ছিল পুরোচনের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা।
পুরোচন যখন সামনে এসে দাঁড়াল, দুর্যোধন তাকে রাজকীয় গাম্ভীর্যে নয়, বরং এক অদ্ভুত অন্তরঙ্গতায় বরণ করে নিলেন। যেন এক সহোদরকে কাছে টেনে নিচ্ছেন। পুরোচনের হাত দুটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ধীর স্বরে বললেন, “পুরোচন, তুমি আমার ভাইয়ের মতো। আমার যা কিছু সম্পদ, তার ওপর তোমার অধিকার আমার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আর আমি জানি, এই পৃথিবীতে তুমিই একমাত্র মানুষ যে আমার এই গোপন ভার বহন করতে পারবে।”
পুরোচন নির্বিকার। তার পাথুরে চোখে কোনো ভাবান্তর নেই।
দুর্যোধন বলতে থাকলেন, “তোমাকে এখনই বারণাবত যেতে হবে। পাণ্ডবরা পৌঁছানোর আগেই সেখানে এমন এক প্রাসাদ তৈরি করো যা দেখে রাজসূয় যজ্ঞের আভিজাত্যও ম্লান হয়ে যায়। তাদের মনে যেন তিলমাত্র সংশয় না জাগে যে হস্তিনাপুরের রাজা তাদের প্রতি কতটা সদয়। কিন্তু মনে রেখো পুরোচন, সেই প্রাসাদের অন্তরালে থাকবে এক নিভন্ত যমপুরী। বাঁশ, খড়, শন আর প্রচুর পরিমাণে জতু বা লাক্ষা দিয়ে এমনভাবে দেওয়াল তৈরি করবে, যা আগুনের একটা স্ফুলিঙ্গ পেলেই নরকের মতো জ্বলে ওঠে। ঘুমন্ত মানুষ চোখ মেলার আগেই যেন আগুনের লেলিহান শিখা সব শেষ করে দেয়।”
এক মুহূর্ত থেমে দুর্যোধন আরও নিচু গলায় বললেন, “যখন তারা নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাবে, যখন তাদের রক্ষীরাও অসতর্ক—তখন সেই প্রাসাদের আগুনই হবে তাদের শেষ শয্যা। পাণ্ডব-কাহিনীর সেখানেই সমাপ্তি।”
পুরোচন কোনো প্রতিবাদ করল না, কোনো প্রশ্নও তুলল না। শুধু মাথা নিচু করে বিদায় নিল।
বারণাবতের সেই জতুরগৃহ
পুরোচন দক্ষ কারিগর। বারণাবতে পৌঁছে তিনি ক্ষিপ্রগতিতে কাজ শুরু করলেন। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এর ভেতরে কী মরণফাঁদ লুকানো আছে। সুদৃশ্য বারান্দা, কারুকার্যখচিত থাম আর রাজকীয় আসবাবপত্রে সাজানো এক মোহময় অট্টালিকা। অতিথির জন্য সেখানে আরামের সব আয়োজনই মজুত।
কিন্তু সেই দেওয়ালের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল শুকনো শন আর রজন। কাঠের ফ্রেমগুলো লেপে দেওয়া হয়েছিল অতিদাহ্য লাক্ষা দিয়ে। মেঝের কার্পেটের নিচে ছিল শুকনো খড়ের আস্তরণ। যে বাঁশের স্তম্ভগুলো বাইরে থেকে মসৃণ ও সুন্দর দেখাচ্ছিল, তার ভেতরটা ছিল ফাঁপা আর শুকনো। প্রতিটি কড়িকাঠ আর প্রতিটি পাটাতন যেন এক একটা বারুদঘর।
ইতিহাসে এই প্রাসাদের কোনো আনুষ্ঠানিক নাম ছিল না। কিন্তু যারা এর ভয়াবহ গোপন রহস্য জানত, তারা একে বলতে শুরু করল ‘জতুরগৃহ’। এক আগুনের প্রাসাদ, যা ঘর সেজে দাঁড়িয়ে ছিল মৃত্যুর অপেক্ষায়।
পাণ্ডবরা যখন সেখানে পৌঁছলেন, পুরচণ তাঁদের অভ্যর্থনা জানালেন খুব বিনীতভাবে। তিনি হাসছিলেন, কিন্তু সেই হাসির পেছনে কী ছিল তা দেখা যাচ্ছিল না।
যুধিষ্ঠিরের সংশয়
যুধিষ্ঠির সাধারণ মানুষ নন। তাঁর ভেতরে একটা আশ্চর্য সংবেদনশীলতা ছিল। ঘরের ভেতর পা দিয়েই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। বাতাসটা কেমন যেন ভারী, তৈলাক্ত। কাঠের ওপর হাত বুলিয়ে তিনি অনুভব করলেন ভেতরে লুকিয়ে থাকা দাহ্য পদার্থের স্পর্শ। মেঝের আচ্ছাদনের নিচে খড় আর শুকনো ঘাসের খসখস শব্দ তাঁর কানে ধরা দিল।
তিনি পুরচণকে কিছুই বুঝতে দিলেন না। রাতে যখন সবাই একা হলেন, যুধিষ্ঠির ভাইদের ফিসফিস করে বললেন, "এটা বাড়ি নয় ভীম, এটা আমাদের চিতা। আমাদের পোড়ানোর জন্য এই মরণফাঁদ সাজানো হয়েছে।"
ভীম গর্জে উঠলেন, কিন্তু যুধিষ্ঠির তাঁকে থামালেন। "এখন নয়। অধৈর্য হলে চলবে না। আমাদের এমন ভান করতে হবে যেন আমরা কিছুই জানি না।"
সুড়ঙ্গ ও গোপন পথ
ঠিক সেই সময় বিদুরের পাঠানো এক খনিক বা সুড়ঙ্গ-বিশেষজ্ঞ এসে পৌঁছল। বিদুর হস্তিনাপুর ছাড়ার সময়ই সংকেতে সাবধান করেছিলেন। রাতের অন্ধকারে, সবার অলক্ষ্যে জতুরগৃহের নিচ দিয়ে খুঁড়তে শুরু হলো এক দীর্ঘ সুড়ঙ্গ, যার মুখ গিয়ে খুলবে শহরের বাইরের নির্জন জঙ্গলে।
দিনের আলোয় পাণ্ডবরা হাসিখুশি অতিথির অভিনয় করতেন, আর রাতের নিস্তব্ধতায় চলত মুক্তির পথ তৈরির কাজ। পুরচণ ভাবছিলেন তাঁর শিকার ফাঁদে ধরা দিয়েছে, কিন্তু সেই ফাঁদের নিচ দিয়েই যে জীবন বয়ে যাচ্ছে, তা তিনি বুঝতে পারেননি।
আগুনের সেই রাত
সুড়ঙ্গ তৈরি হয়ে যাওয়ার পর যুধিষ্ঠির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁরা শুধু পালাবেন না, এমনভাবে যাবেন যাতে হস্তিনাপুর মনে করে তাঁরা মৃত।
সেদিন ছিল উৎসবের রাত। ভোজসভা শেষ হয়েছে। এক নিষাদ নারী নেশা করে তাঁর পাঁচ ছেলেকে নিয়ে প্রাসাদের এক কোণে ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন—মহাকাব্যের পাতায় যাঁদের মৃত্যু এক করুণ দীর্ঘশ্বাস হয়ে রয়ে গেছে।
গভীর রাতে, যখন চারদিক নিস্তব্ধ, ভীম নিজের হাতে আগুন ধরালেন। প্রথমে পুরচণের ঘরে, তারপর পুরো প্রাসাদে। জতুগৃহ তার ধর্ম পালন করল—মুহূর্তের মধ্যে আকাশছোঁয়া আগুনের লেলিহান শিখা পুরো বাড়িটাকে গিলে ফেলল।
ধোঁয়া আর আগুনের মাঝখান দিয়ে কুন্তী ও পাঁচ ভাই নেমে গেলেন মাটির নিচে। সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গ দিয়ে তাঁরা এগিয়ে চললেন জীবনের দিকে। পেছনে বারণাবতের আকাশ তখন লাল হয়ে উঠেছে।
ভস্মস্তূপের ওপর সকাল
পরদিন সকালে বারণাবতের মানুষ শুধু পোড়া কাঠ আর ছাই দেখতে পেল। খবর গেল হস্তিনাপুরে—পাণ্ডবরা শেষ। ধৃতরাষ্ট্র কেঁদে ভাসালেন (সে চোখের জল কতটা সত্য, তা মহাকাব্য বলেনি), আর দুর্যোধন এক গভীর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর পথের কাঁটা উপড়ে গেছে।
কিন্তু বারণাবতের দূরের সেই গহীন জঙ্গলে, ভোরের অস্পষ্ট আলোয় ছয়টি ছায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল। পৃথিবী তাঁদের মৃত বলে জেনেছে, কিন্তু তাঁরা জানেন—আসল লড়াই তো সবে শুরু।
এই মহানাটকের যবনিকা সহজে নামার নয়।---

Comments
Post a Comment