পান্ডুর বিবাহ এবং দিগ্বিজয়

 


সূর্যালোকে ঝকঝক করছে চম্বল নদীর রুপোলি জল। তীরের সেই উর্বর পলিমাটিতে পা রেখে দাঁড়ালে আজ আর বোঝা যায় না, এই ধুলিকণায় মিশে আছে কত ইতিহাস। মানচিত্রের এক কোণে পড়ে থাকা কুন্তিভোজের এই ছোট্ট রাজ্যটি হয়তো একদিন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেত, যদি না সেখানে জন্মাতো একটি মেয়ে—যার গর্ভজাত পাঁচ পুত্র একদিন থরথর করে কাঁপিয়ে দিয়েছিল অখণ্ড ভারতবর্ষের বুক।

কুন্তিভোজ ছিলেন যদুবংশীয় শূরসেনের পরম মিত্র ও ভাই। শূরসেনের ঘরে প্রথম যখন এক কন্যাসন্তান এল, নাম রাখা হলো পৃথা। রূপ যেন ফেটে পড়ছে। কিন্তু শূরসেনের একটি পুরনো অঙ্গীকার ছিল—প্রথম সন্তান তিনি দেবেন নিঃসন্তান কুন্তিভোজকে। কথা রাখতে পিছপা হলেন না শূরসেন। নিজের বুকের টুকরো পৃথাকে তুলে দিলেন ভাইয়ের হাতে। সেদিন থেকে পৃথা হয়ে গেল ‘কুন্তী’।

প্রাসাদের বিলাসিতায় কুন্তী গা ভাসাননি। তাঁর চোখের মনিতে ছিল এক আশ্চর্য স্থিরতা আর সেবাপরায়ণতা। একদিন প্রাসাদে এলেন মহর্ষি দুর্বাসা। ঋষির মেজাজ মানেই জ্বলন্ত অঙ্গার; একটু ত্রুটি হলেই অভিশাপের দাবানল। কিন্তু কুন্তী ভয় পেলেন না। সেই যে প্রদীপ হাতে ভোরের আলো ফোটার আগে ঋষির দুয়ারে গিয়ে দাঁড়াতেন, সারাদিন তাঁর খুঁটিনাটি প্রয়োজন মেটানো, তিরস্কার সয়েও অবিচল থাকা—এ এক অদ্ভুত সাধনা। দুর্বাসা মুগ্ধ হলেন। যাওয়ার আগে কুন্তীর কানে দিয়ে গেলেন এক অমোঘ মন্ত্র। অথর্ববেদের সেই মন্ত্রবলে কোনো দেবতাকে ডাকলেই তিনি আসবেন, দেবেন অভীষ্ট সন্তান। কুন্তী সেই মন্ত্র গোপন করে রাখলেন বুকের কোনো গহন গভীরে।

সময় বয়ে যায়। কুন্তীর বিয়ের ফুল ফুটল। কুন্তিভোজের স্বয়ম্বর সভা। কত রাজা, কত রাজপুত্রের ভীড়। কুন্তী ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। হঠাৎ তাঁর চোখ স্থির হয়ে গেল একজনের ওপর। তিনি পাণ্ডু। কুরুবংশের দীপ্তি যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে তাঁর সুঠাম শরীর থেকে। পাণ্ডুর গলায় মালা পরিয়ে দিলেন কুন্তী। হস্তিনাপুরে এল নতুন বধূ।

কিন্তু ভীষ্ম ছিলেন দূরদর্শী। তিনি জানতেন সাম্রাজ্যের ভিত মজবুত করতে একটা বিয়ে যথেষ্ট নয়। মদ্ররাজের কন্যা মাদ্রীর রূপের কথা তখন দিকে দিকে ছড়ানো। ভীষ্ম নিজেই ছুটলেন মদ্র দেশে। শল্য তো ভীষ্মের প্রস্তাবে আপ্লুত। প্রচুর ধনরত্ন আর উপ উপঢৌকন দিয়ে বোন মাদ্রীকে বিদায় দিলেন হস্তিনাপুরের পথে। পাণ্ডুর ঘরে এলেন দুই রানী।

সুখের দিন কাটছিল ঠিকই, কিন্তু পাণ্ডু তো সাধারণ সংসারী মানুষ নন। তাঁর রক্তে তখন পূর্বপুরুষদের সেই দিগ্বিজয়ের নেশা। একদিন কুরুবৃদ্ধ ভীষ্ম আর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্রের আশীর্বাদ নিয়ে পাণ্ডু বেরিয়ে পড়লেন অভিযানে। তাঁর সেই বিশাল বাহিনীর পদভারে কেঁপে উঠল আর্যাবর্তের মাটি।

প্রথমে চূর্ণ হলো দশাৰ্ণ রাজ্য। তারপর মগধ, বিদেহ। একের পর এক রাজা বশ্যতা স্বীকার করলেন। কাশী আর পুণ্ড্ররাজ পাণ্ডুর বিক্রম দেখে যুদ্ধ না করেই মাথা নোয়ালেন। হস্তিনাপুরের কোষাগার ভরে উঠল মণি-মাণিক্য আর সুবর্ণে। পাণ্ডু যখন বিজয়ী বীরের সাজে ফিরে এলেন, বৃদ্ধ ভীষ্মের চোখেও জল এসে গিয়েছিল। পাণ্ডু এক তিল সম্পদও নিজের জন্য রাখলেন না, সব সঁপে দিলেন সত্যবতী আর ভীষ্মের চরণে। বিজেতা হিসেবে তিনি ছিলেন কঠোর, কিন্তু পুত্র ও ভ্রাতা হিসেবে পরম বিনয়ী।

ঠিক এই সময়েই ভীষ্ম বিদুরেরও বিবাহের ব্যবস্থা করলেন। এক দাসীকন্যার সাথে বিদুরের বিয়ে হলো আড়ম্বরহীনভাবে। বিদুর সত্যের উপাসক, তাঁর জীবন ছিল শান্ত সমাহিত। রাজকীয় বৈভব না থাকলেও সেই সংসারে ছিল অদ্ভুত এক তৃপ্তি।

কুরুবংশের আকাশে তখন শরতের মেঘের মতো শান্তি। পাণ্ডুর দিগ্বিজয় হস্তিনাপুরের দাপট বাড়িয়ে দিয়েছে, ধৃতরাষ্ট্র সিংহাসনে আসীন, বিদুরের পরামর্শ আর ভীষ্মের অভিভাবকত্বে সব ঠিকঠাক চলছে। কিন্তু মহাভারতের ইতিহাস বলে, এই নিস্তরঙ্গ শান্তি আসলে এক বড় ঝড়ের পূর্বাভাস। আকাশের কোণে মেঘ জমছে, বাতাস ভারী হয়ে আসছে। সেই মহাপ্রলয় আসতে খুব বেশি দেরি নেই।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)