কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র


কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের  ষড়যন্ত্র

হস্তিনাপুরের সেই বিশাল প্রাসাদের অলিন্দে যখন কুরু-পাণ্ডব ভাইরা একসঙ্গে বড় হচ্ছিল, বাইরে থেকে মনে হতো সবটাই বুঝি নিস্তরঙ্গ জলচ্ছবি। কিন্তু সেই আপাতশান্ত জলের নিচেই পাক খাচ্ছিল এক কালান্তক ঈর্ষার স্রোত। —মানুষের মনের গহিন কোণে যখন বিষ জন্মে, তখন তার নীল ছায়া এসে পড়ে চোখের মণি আর ঠোঁটের হাসিতেও।

দুর্যোধনের চোখে সেই বিষ ছিল প্রথম থেকেই। ভীমকে সে সহ্য করতে পারত না। ভীম যেন এক অতিকায় মহীরুহ, যার ছায়ায় দুর্যোধন নিজেকে বড় বেশি বামন মনে করত। ভীমের অট্টহাসি, তার সীমাহীন ভোজনবিলাস, আর তার ওই অবলীলায় হাতিকে উপড়ে ফেলার মতো গায়ের জোর—দুর্যোধনের বুকের ভেতরটা খকখক করে জ্বলত। একদিন এই হিংসে রূপ নিল এক কুটিল ষড়যন্ত্রের।

উদক-ক্রীড়ন ও বিষের পাত্র

দুর্যোধন একদিন খুব বিনয়ী সেজে বড় ভাইয়ের মতো প্রস্তাব দিল, "চলো, গঙ্গার তীরে উদক-ক্রীড়নে যাই।" প্রমাণ করার চেষ্টা করল, সে বড় স্নেহশীল। গঙ্গার তীরে উদক-ক্রীড়ন বা জলক্রীড়ার আয়োজন হলো। তাঁবু পড়ল, এলাহি ভোজের ব্যবস্থা হলো। কিন্তু দুর্যোধন খুব চতুরভাবে কোনো মন্ত্রী বা বিদুরকে সেই উৎসবে ডাকল না। বড়দের সতর্ক চোখের আড়ালে নিজের খেলাটা শেষ করতে চেয়েছিল সে।

যুধিষ্ঠির সরল মনে ভাইদের নিয়ে এলেন। বিকেলটা ছিল সোনা-রোদ মাখা। গঙ্গার হাওয়া ফুরফুর করে বইছে। বিকেলে খেলাধুলা আর সাঁতার কাটার পর যখন খাওয়ার আসর বসল, তখন ভীমের থালায় কৌশলে মিশিয়ে দেওয়া হলো তীব্র কালকূট বিষ। ভীম তো সহজ মানুষ, মনের মধ্যে কোনো প্যাঁচ নেই—সে গোগ্রাসে খেল।

খানিক পরেই বিষের ক্রিয়া শুরু হলো। ভীম এলিয়ে পড়লেন। সবার মনে হলো, খুব বেশি খেয়ে বা ক্লান্ত হয়ে ভীম অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। কিন্তু সেই সুযোগে দুর্যোধন এগিয়ে এল। নিজের হাতে লতা আর দড়ি দিয়ে সংজ্ঞাহীন ভীমকে বাঁধল সে। তারপর নিষ্ঠুর এক ধাক্কায় তাঁকে ঠেলে দিল গঙ্গার অতল জলে।

নাগলোক ও বিষে বিষক্ষয়

ভীমের দেহটা ডুবতে ডুবতে চলে গেল পাতালপুরীতে—নাগলোকে। সেখানে বিষধর সর্পরা ওই বিশালাকায় মানুষটিকে দেখে তেড়ে এল। তাদের বিষদাঁত বারংবার ভীমের শরীরে বিঁধল। কিন্তু এখানেই প্রকৃতির এক আশ্চর্য লীলা ঘটল। বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলে 'বিষে বিষক্ষয়'। দুর্যোধনের দেওয়া সেই স্থবির বিষ আর নাগদের তরল তীব্র বিষ একে অপরকে কাটাকুটি করে দিল। ভীমের চেতনা ফিরে এল।

চোখ মেলেই ভীম দেখলেন সাপের মেলা। তাঁর সেই বজ্রমুষ্টি সক্রিয় হয়ে উঠল। সাপেদের ধরে আছাড় মারতে শুরু করলেন তিনি। ত্রাহি ত্রাহি রবে নাগেরা ছুটল তাদের রাজা বাসুকির কাছে। খবর পেয়ে বাসুকি এলেন, সঙ্গে এলেন বৃদ্ধ আর্যক—যিনি ছিলেন ভীমের মাতামহ কুলের পূর্বপুরুষ। রক্ত তো রক্তের টান চেনে। আর্যক দেখেই চিনতে পারলেন তাঁর পৌত্রকে। তিনি বাসুকিকে বললেন, "একে সোনা-দানা দিয়ে কী হবে? একে এমন কিছু দাও যা ওকে অপরাজেয় করে তুলবে।"

নাগলোকে রাখা ছিল পবিত্র 'কুণ্ডক রস'। এক এক পাত্র কুণ্ডক রস মানে হাজার হাতির শক্তি। ভীম পূর্বমুখী হয়ে বসে একে একে আট পাত্র সেই অমৃত-রস পান করলেন। শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন অগ্নিশিখা বয়ে গেল তাঁর। এরপর দিব্য শয্যায় তিনি এক গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন—নতুন এক সত্তা নিয়ে জেগে ওঠার অপেক্ষায়।

হস্তিনাপুরের প্রতীক্ষা ও কুন্তীর উদ্বেগ

ওদিকে গঙ্গার তীরে সন্ধ্যা নেমে এল। যুধিষ্ঠিররা ভীমকে খুঁজে পেলেন না। তাঁরা ভাবলেন, ভীম হয়তো আগেই প্রাসাদে ফিরে গেছে। কিন্তু প্রাসাদে ফিরে কুন্তীর প্রশ্নের মুখে যখন পড়লেন, তখন সবার রক্ত হিম হয়ে গেল। ভীম ফেরেনি।

কুন্তীর ব্যাকুলতা দেখে বিদুর এগিয়ে এলেন। বিদুর চিরকালই একটু গম্ভীর, মেপে কথা বলেন। তিনি কুন্তীকে নিভৃতে বললেন, "স্থির হও কুন্তী। দুযোধনকে এখনই কিছু জিজ্ঞেস করো না। সে কোণঠাসা বোধ করলে অন্য ছেলেদেরও বিপদ বাড়বে। মহর্ষি ব্যাসের আশীর্বাদ আছে ভীমের ওপর, সে দীর্ঘজীবী হবেই। ধৈর্য ধরো, এই প্রাসাদে ধৈর্যই একমাত্র অস্ত্র।"

প্রত্যাবর্তন ও নির্লিপ্ত ভীম

আট দিন পর। নাগলোক থেকে বিদায় নিয়ে ভীম যখন হস্তিনাপুরের সিংহদুয়ার দিয়ে ঢুকলেন, প্রহরীরা অবাক হয়ে দেখল—ভীম যেন আগের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল, দীর্ঘকায়। তাঁর হাঁটার শব্দে মাটি কাঁপছে।

বাড়িতে ফিরে ভীম সব কথা খুলে বললেন। কিন্তু যুধিষ্ঠির এক অভিজ্ঞ রাজনীতিকের মতো ভাইদের সাবধান করে দিলেন, "সব জানলেও এখন চুপ করে থাকো। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।" অর্থাৎ, অন্যায় হয়েছে জেনেও বেঁচে থাকার তাগিদে সেই অন্যায়ের কথা গিলে ফেলতে হলো তাঁদের।

দুর্যোধন কিন্তু দমবার পাত্র নয়। সে আবারও ভীমের খাবারে বিষ মিশিয়ে দিল। কিন্তু কুরু বংশের আরেক ভাই যুজুৎসু, যার বিবেকের দংশন ছিল প্রবল, সে চুপিচুপি ভীমকে সাবধান করে দিল। ভীম মুচকি হেসে সেই বিষ মেশানো খাবারটাও খেয়ে নিলেন। কুণ্ডক রসের শক্তিতে সেই বিষ সাধারণ জলের মতো তাঁর শরীরে মিলিয়ে গেল।

দুর্যোধন তাকিয়ে দেখল, ভীম সুস্থ শরীরে আরও দুখানা রুটি চেয়ে খাচ্ছেন। বিষে যাঁর মরণ নেই, তাঁকে মারার অন্য পথ খুঁজতে বসল কুরুরাজ। কারণ, অন্ধকার যখন একবার জেদ ধরে, সে শেষ না দেখে থামে না।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন


Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

রাজা যযাতির পতন ও মুক্তি

সত্যবতী ও ব্যাসদেব