হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া

 


হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া

বারাণাবতের জতুগৃহের লেলিহান শিখা পাণ্ডবদের গ্রাস করতে পারেনি—এই সংবাদ যখন দাবানলের মতো হস্তিনাপুরের প্রাসাদে আছড়ে পড়ল, তখন এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গিয়েছিল। পাণ্ডবরা জীবিত! শুধু জীবিতই নয়, অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে দ্রুপদ-কন্যা দ্রৌপদীকে জয় করেছেন এবং পাঞ্চালরাজ এখন তাঁদের পরম মিত্র। ধৃতরাষ্ট্রের সভার গাম্ভীর্যের তলায় তখন এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের পূর্বাভাস।

দুর্যোধন তখন নিজের কক্ষের আসবাবপত্র চুরমার করছেন। তাঁর ক্রোধ পাণ্ডবদের বেঁচে থাকার সংবাদে যত না, তার চেয়ে বেশি তাঁদের উত্তরোত্তর বৃদ্ধিতে। পাঞ্চালের সঙ্গে এই মৈত্রী মানেই কৌরবদের সিংহাসনের দাবি এক প্রবল সংকটের মুখে। কক্ষের ভেতরে গুমোট অন্ধকার, আর বাইরে উত্তপ্ত দ্বিপ্রহর। সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে দুর্যোধন সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রের সামনে। পাশে ছায়ার মতো দুঃশাসন আর চিরকালের সূর্যসম তেজে উদ্ভাসিত কর্ণ।

দুর্যোধন আর্তনাদ করে উঠলেন, "পিতা, আমাদের সমস্ত পরিশ্রম, সমস্ত কৌশল কি তবে ধুলোয় মিশে যাবে? আপনি কি বুঝতে পারছেন না, কুন্তিপুত্ররা এখন আর কেবল আমাদের আত্মীয় নয়, তারা প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ফিরে আসছে? তাদের হস্তিনাপুরে ডেকে আনা মানে কালসর্পকে দুধ-কলা দিয়ে পোষা।"

দুঃশাসনের চোখে তখন হিংস্রতার ঝিলিক। তিনি দাদার কথায় ইন্ধন দিয়ে কর্কশ স্বরে বললেন, "সবই আমাদের দুর্বলতার ফল। বারাণাবতেই যদি ওদের শেষ নিঃশ্বাসটুকু নিশ্চিত করা যেত, তবে আজ এই আপসের গ্লানি সইতে হতো না। দেরি করার সময় নেই পিতা, পাঞ্চালের শক্তি আরও বাড়ার আগেই আমাদের আঘাত করতে হবে।"

কর্ণ এতক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর স্থৈর্য পাথরের মতো অটল, কিন্তু কণ্ঠস্বরে এক হিমশীতল কাঠিন্য। তিনি বললেন, "মহারাজ, সন্ধি বা আপস এখন অর্থহীন। পাণ্ডবরা আমাদের ক্ষমা করবে, এটা ভাবা মূর্খামি। ক্ষমতার লড়াইয়ে ন্যায়ের চেয়ে বীরত্ব আর কৌশলের দাম বেশি। বীরভোগ্যা বসুন্ধরা—এটাই তো শাশ্বত সত্য। আপনি যদি দ্বিধা করেন, তবে ভবিষ্যৎ আপনাকে ক্ষমা করবে না।"

দুর্যোধন অধৈর্য হয়ে পিতার হাত চেপে ধরলেন। "পিতা, পিতামহ ভীষ্ম বা বিদুর কাকা ধর্ম আর নীতির কথা বলবেন ঠিকই, কিন্তু সেই নীতি আপনার পুত্রের রাজ্য রক্ষা করবে না। তাঁদের কথায় কান দেবেন না। আমাদের গদি রক্ষা করতে হলে কঠোর হওয়া ছাড়া পথ নেই।"

ধৃতরাষ্ট্র এক নিদারুণ সংকটে পড়লেন। একদিকে রক্তের টান, পুত্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর ভয়; অন্যদিকে কুলবৃদ্ধ ভীষ্ম আর দূরদর্শী বিদুরের অমোঘ যুক্তি। অন্ধ রাজার মনের ভেতরেও তখন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দ্বৈরথ চলছে। তিনি জানেন, পাণ্ডবদের প্রত্যাবর্তনে ক্ষমতার ভাগ হবেই, আর সেই ভাগাভাগি মানেই সংঘাত।

কিন্তু সভার যখন ডাক পড়ল, তখন ধৃতরাষ্ট্র দেখলেন অন্য ছবি। বিদুর পরম শান্তিতে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর কণ্ঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অটল ধিক্কার। পিতামহ ভীষ্ম গম্ভীর স্বরে সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেন, "অধম্মের ওপর ভিত্তি করে কোনো সাম্রাজ্য টিকে থাকতে পারে না, ধৃতরাষ্ট্র। পাণ্ডবদের প্রাপ্য সম্মান দিয়ে ফিরিয়ে আনাই কুরুবংশের জন্য মঙ্গলজনক।"

বিবেকের দংশন আর লোকলজ্জার চাপে অবশেষে ধৃতরাষ্ট্রের দ্বিধাগ্রস্ত মন কিছুটা শান্ত হলো। তিনি প্রকাশ্যে পুত্রদের পক্ষ নিলেন না। বরং এক কৃত্রিম ন্যায়ের মুখোস পরে ঘোষণা করলেন, "পাণ্ডবরা আমাদেরই রক্ত। তাদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে হস্তিনাপুরে ফিরিয়ে আনা হোক।"

বিদুরকে আদেশ দিলেন রাজা— "বিদুর, তুমি নিজে পাঞ্চালে যাও। বহুমূল্য উপহার আর শ্রদ্ধার সঙ্গে কুন্তী, দ্রৌপদী আর পাণ্ডবদের নিয়ে এসো।"

দুর্যোধনের মুখ অপমানে আর রাগে নীল হয়ে উঠল। তিনি কক্ষ ত্যাগ করলেন দ্রুত পায়ে, মনে মনে এক নতুন বিষবৃক্ষের বীজ বপন করতে করতে। দুঃশাসন আর কর্ণও তাঁর অনুগামী হলেন। তাঁরা বুঝলেন, শান্তি নয়, এ কেবল এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বিরতি মাত্র।

বিদুর কিন্তু দেরি করলেন না। তাঁর চোখেমুখে এক প্রশান্তি। তিনি জানেন, এই যাত্রার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বংশের রক্ষা অথবা ধ্বংসের চাবিকাঠি। রথ প্রস্তুত হলো, বহুমূল্য উপচার সাজানো হলো। পাঞ্চালের পথে যখন বিদুরের রথ যাত্রা শুরু করল, তখন দিগন্তের আকাশে মেঘ জমেছে। সে মেঘ মিলনের না কি মহা-সংঘাতের, তা কেবল মহাকালই জানে।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র