কর্ণ ও তাঁর ভাই সংগ্রামজিতের এক অচেনা গাথা
গঙ্গার বুকে তখন ভোরের কুয়াশা মেখে আলো ফুটছে। তরঙ্গে তরঙ্গে সূর্যরশ্মি ঠিকরে পড়ে জল ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
হস্তিনাপুরের রাজকীয় সারথি অধিরথ ঘাটে নেমেছিলেন প্রাত্যহিক স্নান সারতে। ঘাটের একপাশে নীরব প্রার্থনায় বসেছিলেন তাঁর স্ত্রী রাধা। বছরের পর বছর কেটে গেছে, অথচ রাধার কোল শূন্য। সন্তানহীনতার এক গভীর, না-বলা হাহাকার দিনরাত জড়িয়ে রাখত এই দম্পতিকে।
হঠাৎই জলের বুকে একটা বেতের ঝুড়ি ভেসে আসতে দেখলেন অধিরথ। কৌতুহলে বুকটা দমে এল তাঁর। জলে নেমে সিন্দুকটি তীরে টেনে আনলেন তিনি। ঢাকনাটা সরাতেই থমকে গেল চারপাশ।
বি:দ্র: জলেতে বেতের ঝুড়ি ভাসিয়ে দেবার কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন।
ভেতরে শুয়ে রয়েছে এক দিব্য শিশু। প্রাতঃসূর্যের আলো এসে পড়েছে তার শরীরে—গাঁথা রয়েছে জ্বলজ্বলে সোনার কবচ, আর দুই কানে জ্যোতির্ময় কুণ্ডল। শিশুটি যেন মানুষ নয়, অন্য কোনো নক্ষত্রলোক থেকে খসে পড়া এক আলোর ফোঁটা।
রাধা ছুটে এলেন। নিজের অজান্তেই তাঁর দু’হাত বাড়িয়ে দিলেন সেই শিশুর দিকে। বুকে জড়িয়ে ধরতেই রাধার শুষ্ক স্তন থেকে উপচে পড়ল মাতৃত্বের সুধা। অধিরথ স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “রাধা, ঈশ্বর অবশেষে আমাদের শূন্য কোল পূর্ণ করলেন। ও সোনার অলংকার নিয়ে এসেছে, ওর নাম রাখা যাক বসুষেণ।”
এই সেই বসুষেণ—যে পরবর্তীতে ইতিহাস মনে রাখবে ‘কর্ণ’ নামে।
কিন্তু বিধাতার খেলা বড় আশ্চর্য! গঙ্গার জলে ভেসে আসা অনাথ শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে নেওয়ার পর থেকেই যেন অধিরথের সংসারে এক অদৃশ্য আশীর্বাদের ছোঁয়া লাগল। যে রাধার কোল এতদিন ছিল খাঁ খাঁ মরুভূমির মতো, সেখানে একের পর এক প্রস্ফুটিত হতে লাগল জীবনের নতুন মুকুল।
কর্ণের পদার্পণের কিছুদিন পরেই রাধার গর্ভে জন্ম নিল তাঁদের নিজেদের ঔরসজাত প্রথম সন্তান—সংগ্রামজিৎ। তার ঠিক পর পরই কোল আলো করে এল শত্রুঞ্জয় এবং বিপাট।
হস্তিনাপুরের এক কোণে সূতপল্লীর সেই ছোট্ট কুঁড়েঘরটি আচমকাই মেতে উঠল চার ভাইয়ের হাঁকডাক আর হাসিকলরবে।
অধিরথ বা রাধা কোনোদিন মনের ভুলেও কর্ণের সাথে বাকি তিন ছেলের সামান্যতম তফাত করেননি। বরং কর্ণের শান্ত, তেজস্বী রূপটা সবাইকে এক অজানা আবেশে বাঁধিয়ে রাখত। ছোট ভাই সংগ্রামজিৎ, শত্রুঞ্জয় আর বিপাট কেবল বড় ভাই বলে নয়, কর্ণের ভেতরের এক অদম্য, নিঃসঙ্গ তেজ দেখে তাঁকে ভালোবাসত পাগলের মতো।
সংগ্রামজিৎ যখন প্রথম ধনুক ধরতে শিখল, তখন সে কর্ণের দিকে তাকিয়ে বলত, “দাদা, তোমার ছায়ার পেছনে আমি চিরকাল থাকব। তোমাকে কেউ অপমান করলে এই সংগ্রামজিতের বুক আগে ফুটো হতে হবে।”
রক্তের টান হয়তো ছিল না। কর্ণ ছিলেন সূর্য আর কুন্তীর গোপনে গোপন করা সন্তান, রাজরক্তের অধিকারী। কিন্তু রাধার কোলে আর অধিরথের স্নেহে লালিত হয়ে কর্ণের ধমনীতে বইছিল সেই একই মাটির গন্ধ। আর সংগ্রামজিৎ, শত্রুঞ্জয়, বিপাটরা কর্ণের ছায়ায় বড় হতে হতে নিজেদের সঁপে দিয়েছিল সেই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার চরণে।
মহাভারতের এই চার ভাইয়ের গল্প কোনো অলৌকিক দেবতার গল্প নয়—এ হলো এক কুড়িয়ে পাওয়া পরম স্নেহের গল্প, যা রক্তের সম্পর্ককেও ছাপিয়ে এক চিরন্তন ত্যাগের গাথা হয়ে লিখে রাখা আছে ইতিহাসের পাতায়।

Comments
Post a Comment