Posts

৬১তম বনপর্ব-বানর সেনা, সুবর্ণলঙ্কা ও মহাবলী কুম্ভকর্ণের পতন

Image
৬১তম বনপর্ব-বানর সেনা, সুবর্ণলঙ্কা ও মহাবলী কুম্ভকর্ণের পতন ঋষি মার্কণ্ডেয় কৌরব ও পাণ্ডবদের সেই পুরাতন ইতিহাস শোনাচ্ছিলেন। তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বরে যেন অতীত যুগের হাওয়া ভেসে আসছিল। তিনি বললেন—সুগ্রীবের আজ্ঞা পাওয়া মাত্রই পৃথিবীর নানা প্রান্তর থেকে বানর ও ভালুক বীরেরা এসে সমবেত হতে লাগলেন। সর্বাগ্রে এলেন বালীর শ্বশুর মহাপ্রাজ্ঞ সুষেণ; তাঁর বি:দ্র : বালীর শ্বশুর মহাপ্রাজ্ঞ সুষেণের বিবরণ সংক্ষেপে জানতে এখানে ক্লিক করুন  পশ্চাতে শতকোটি দুরন্ত বানর সৈন্যের গর্জন। তারপর একে একে এলেন মহাবল গজ ও গবয়।  বি:দ্র : মহাবল গজ ও গবয়ের  বিবরণ সংক্ষেপে জানতে এখানে ক্লিক করুন। গন্ধমাদন পর্বতের চূড়া কাঁপিয়ে নিজ বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হলেন স্বয়ং বানররাজ। সুদূর সীমান্ত থেকে গবাক্ষ এলেন ছয় হাজার কোটি অনুচর নিয়ে, আর মহাবলী পনস নিয়ে এলেন বাহান্ন কোটি দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। বি:দ্র : মহাবলী পনসের  বিবরণ সংক্ষেপে জানতে এখানে ক্লিক করুন।  মহাতেজস্বী দধিমুখের সৈন্যদলের পদভরে যেন ধরিত্রী কেঁপে উঠল। আর প্রজ্ঞার প্রতীক বৃদ্ধ জাম্ববান এলেন পৌরুষদীপ্ত শতকোটি ভালুক সেনা সঙ্গে নিয়ে। বি:দ্...

৬০তম বনপর্ব-কিষ্কিন্ধ্যায় বালীবধ থেকে লঙ্কাপুরী:-সীতার অপেক্ষা ও পবনপুত্রের মহাসংবাদ

Image
  ৬০তম বনপর্ব-কিষ্কিন্ধ্যায় বালীবধ থেকে লঙ্কাপুরী:-সীতার অপেক্ষা ও পবনপুত্রের মহাসংবাদ রক্তের টান, সীতার অপেক্ষা ও পবনপুত্রের মহাসংবাদ সুগ্রীব যখন পম্পা সরোবরের তীরে বসে দিন গুনছিলেন, তখন তাঁর বুকের ভেতরটা ভয়ে আর অপমানে দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল। বালীর প্রচণ্ড প্রতাপ আর তাড়া করে ফেরা ত্রাসের নাম তখন কিষ্কিন্ধ্যা। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভাগ্য দুই পুরুষকে এনে দাঁড় করাল মুখোমুখি—একজন হারানো সিংহাসনের খোঁজে, অন্যজন অপহৃত প্রেয়সীর শোকে আকুল। রাম আর সুগ্রীবের সেই হাত মেলানো যেন শুধুই দুটো মানুষের মেলবন্ধন ছিল না, ছিল দুই ভাগ্যাহত আত্মার আতুড়ঘরের আদান-প্রদান। রক্তের দামে বন্ধুত্বের ঋণ: বালীবধ ও কিষ্কিন্ধ্যার রাজসিংহাসন শ্রীরামের চোখ জ্বলছিল অগ্নিশিখার মতো, যখন তিনি সীতার গায়ের সেই ফেলে যাওয়া বস্ত্রখণ্ডটি দেখলেন। সংশয় মুছে গেল—লঙ্কাপতি রাবণই হরণ করেছে তাঁর প্রাণধিক সীতাকে। কিন্তু প্রতিজ্ঞার এক কঠিন দায় চেপে বসল রামের কাঁধে। বন্ধু সুগ্রীবের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। তারপর সেই নাটকীয় সংঘাত। কিষ্কিন্ধ্যার গুহাদ্বার কেঁপে উঠল সুগ্রীবের সিংহনাদে। বালী যখন বীরদর্পে বেরোতে গেলেন, বুদ্ধিমান তারা পথ আটকে...

৫৯তম বনপর্ব-স্বর্ণমৃগের ফাঁদ, বিষাদের ছায়া ও অরণ্যের শূন্যতা

Image
৫৯তম বনপর্ব-স্বর্ণমৃগের ফাঁদ, বিষাদের ছায়া ও অরণ্যের শূন্যতা দণ্ডকারণ্যের বাতাস তখন ভারী হয়ে উঠেছে এক অশুভ আশঙ্কায়। রাবণ যখন মারীচের নির্জন আশ্রমে এসে দাঁড়ালেন, তখন মারীচ সন্ন্যাসীর শান্ত বেশে বসে থাকলেও তাঁর মন গভীর এক দোলাচলে দুলছিল। মারীচ ছিলেন অভিজ্ঞ; শ্রীরামের বাণের সেই প্রচণ্ড তেজ তিনি নিজের দেহে টের পেয়েছিলেন আগে। রাক্ষসরাজের চোখে প্রতিশোধের অন্ধ আগুন আর মুখের কোণে পরাজিত গ্লানি দেখে মারীচ বুঝলেন—আঘাত সুগভীর। শূর্পণখার অপমান, জনস্থানের ধ্বংস আর খরের মৃত্যুর বিলাপ শুনে মারীচ শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি হাত জোর করে বললেন, "রাক্ষসরাজ, রাম কোনো সাধারণ মানব নন। তাঁর সঙ্গে শত্রুতা মানে নিজের হাতে নিজের মৃত্যুদণ্ড লেখা। কোন কুবুদ্ধি আপনাকে এই মরণকূপে ঝাঁপ দিতে বলছে?" কিন্তু অন্ধ কাম আর অপমানের আগুনে জ্বলেপুড়ে খাক হওয়া রাবণের কানে হিতোপদেশ ঢোকার স্থান ছিল না। তিনি গর্জে উঠলেন, "মারীচ! আমার আদেশ পালন করো, নয়তো এই মুহূর্তেই আমার হাতে মরো!" মারীচ মনে মনে শেষ হিসাবটা কষে ফেললেন। রাবণের মতো অধার্মিকের হাতে কুকুরের মতো মরার চেয়ে রামের পবিত্র বাণে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া অনে...

৫৮তম বনপর্ব-: রামায়ণের আদি কথা-পুলস্ত্যে মুনি, রাবণ-

Image
  ৫৮তম বনপর্ব-: রামায়ণের আদি কথা-পুলস্ত্যে মুনি, রাবণ- জয়দ্রথকে পরাজিত করে, তার পাশবিক কবল থেকে দ্রৌপদীকে উদ্ধার করে যুধিষ্ঠির তখন ঋষিমণ্ডলীর মাঝে উপবিষ্ট। চারদিকে মহর্ষিরা বসে আছেন থমথমে মুখে। তাঁদের চোখেমুখে পাণ্ডবদের এই অন্তহীন দুর্দশার জন্য গভীর, অনুচ্চারিত বেদনার ছাপ। পাতার পর পাতা উল্টে যাওয়া ইতিহাসের মতো বাতাস বইছে বনের গাছপালায়। বারবার তাঁরা আক্ষেপ করছেন—আহা, এমন মহাত্মা পুরুষদেরও কী নিদারুণ, অলৌকিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে! মানুষের ভাগ্য কি তবে শুধুই এক অন্ধ নিয়তির খেলা? যুধিষ্ঠির তখন তাকালেন দীর্ঘজীবী মার্কণ্ডেয় ঋষির দিকে। যুধিষ্ঠিরের কণ্ঠে সেই পুরনো, চাপা কষ্টটুকু আবার কুয়াশার মতো ফিরে এল। তিনি একটু উদাসীন, একটু ক্লান্ত হাসলেন। তারপর বললেন, "ভগবান, আপনি তো ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান সবই জানেন, দেবর্ষিদের মধ্যেও আপনার খ্যাতি সর্বজনবিদিত। আমার বুকের ভেতর একটা প্রশ্ন অনেকদিন ধরে পাথরের মতো জমে আছে, আজ তার নিরসন করুন। দেখুন, দ্রুপদকন্যা কত সৌভাগ্যবতী—যজ্ঞবেদী থেকে তাঁর জন্ম, মাতৃগর্ভের অন্ধকার কষ্ট তাঁকে ছুঁতেও পারেনি। মহাত্মা পাণ্ডুর পুত্রবধূ হওয়ার গৌরবও তিনি পেয়েছেন। কোনোদ...

৫৭তম বনপর্ব-কাম্যক বনে জয়দ্রথের স্পর্ধা ও এক চরম লাঞ্ছনার ইতিহাস-

Image
৫৭তম বনপর্ব-কাম্যক বনে জয়দ্রথের স্পর্ধা ও এক চরম লাঞ্ছনার ইতিহাস- সেদিন কাম্যক বনের নির্জনতা ছিল অন্যরকম। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর পাতার মর্মর শব্দের আড়ালে যে এমন একটা ঝড় লুকিয়ে ছিল, তা কে জানত! ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তখন পুরোহিত ধৌম্যের নির্দেশে যজ্ঞ ও আশ্রমে আগত ব্রাহ্মণদের আহারের ব্যবস্থা করতে ভাইদের নিয়ে বনের গভীরে গিয়েছেন। কুটিরে যাজ্ঞসেনী দ্রৌপদী একেলা, সম্পূর্ণ অরক্ষিত। মহাকাব্যের এই সাময়িক নির্জনতাই যেন ডেকে আনল এক অমোঘ নিয়তি। ঠিক সেই সময়েই বনের বুক চিরে ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে আসছিল এক বিশাল রাজকীয় বহর। সিন্ধু ও সৌবীর দেশের রাজা, বৃদ্ধক্ষত্রের পুত্র জয়দ্রথ চলেছেন শাল্বদেশের দিকে—উদ্দেশ্য আরেকটি বিবাহ। বহুমূল্য রাজসিক পোশাকে সজ্জিত অহংকারী জয়দ্রথ, সঙ্গে অগণিত রাজন্যবর্গ, হস্তী, অশ্ব আর চতুরঙ্গ সেনা। ঠিক এই পথ দিয়েই যাওয়ার সময়ে হঠাতই তাঁর রথ থমকে গেল আশ্রমের আঙিনায়। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন দ্রৌপদী। কদম্ব বৃক্ষের ডালটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কৃষ্ণাঙ্গী রূপসীর শরীর থেকে যেন এক দিব্য তেজ ঠিকরে পড়ছিল, বনের অন্ধকার কোণগুলোও যেন তাঁর দেহকান্তিতে আলোড়িত। জয়দ্রথের সঙ্গীরা সেই অলৌকিক রূপ দেখে চোখ ফেরাতে পা...

৫৬তম বনপর্ব-অক্ষয় পাত্রের মহিমা এবং দুর্বাসা ঋষির দর্পচূর্ণ-

Image
৫৬তম বনপর্ব-অক্ষয় পাত্রের মহিমা এবং দুর্বাসা ঋষির দর্পচূর্ণ- অরণ্যের আলো-ছায়ার খেলা তখন অন্যরকম। রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা নেই ঠিকই, কিন্তু পাণ্ডবদের এই বনবাসকাল যেন এক তপোবনের শান্তি বয়ে এনেছিল। সুখে-দুঃখে, ভাইয়ে-ভাইয়ে নিবিড় বাঁধনে দ্রৌপদীকে নিয়ে তাঁরা এমন এক নিরাসক্ত আনন্দে দিন কাটাচ্ছিলেন, যা নগরের ঐশ্বর্যকেও হার মানায়। কিন্তু হস্তিনাপুরের প্রাসাদে বসে এই শান্তির খবর ধৃতরাষ্ট্র-নন্দন দুর্যোধনের বুকে শেলের মতো বিঁধছিল। পাণ্ডবরা বনে গিয়েও সুখে আছে? এই ঈর্ষা তাঁকে ঘুমোতে দেয় না। ছলনায় ও চাতুরীতে বিজ্ঞ কর্ণ আর দুঃশাসনকে পাশে বসিয়ে দুর্যোধন গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে লাগলেন। কীভাবে পাণ্ডবদের এই মানসিক শান্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ করা যায়, সেটাই হয়ে উঠল তাঁদের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। দুর্যোধনের কুটকৌশল ও ঋষির বরদান ঠিক এমন সময় হস্তিনাপুরে পদার্পণ করলেন ত্রিলোকবিখ্যাত, পরম ক্রোধী মহর্ষি দুর্বাসা। দুর্যোধন চতুর, তিনি জানতেন এই ঋষির ক্রোধ যেমন প্রলয়ঙ্কর, তেমনি তাঁর তুষ্টি পরম ফলদায়ী। বিন্দুমাত্র আলস্য না করে, ভাইদের নিয়ে দুর্যোধন ঋষির পায়ের কাছে গিয়ে নত হলেন। দাসের মতো জোড়হাতে দিন-রাত...

৫৫তম বনপর্ব-অকিঞ্চন মুদগল ঋষির মোক্ষলাভ-

Image
  ৫৫তম বনপর্ব-অকিঞ্চন মুদগল ঋষির মোক্ষলাভ- এগারো বছর কেটে গেছে। এগারোটা বছর, যেন এগারোটা যুগ। বনের গহন স্তব্ধতার ভেতর দিয়ে সময় বয়ে যায় এক আশ্চর্য মন্থরতায়—গাছের পাতা ঝরে, আবার নতুন কুঁড়ি গজায়, কিন্তু পাণ্ডবদের ভেতরের সেই একটানা, প্রচ্ছন্ন কষ্টের অনুভূতিটা কিছুতেই মুছে যায় না। যাঁরা একদিন রাজপ্রাসাদের সুবর্ণছায়ায় সুখভোগের যোগ্য ছিলেন, আজ বনের ফলমূল আর বন্য লতাপাতা খেয়ে তাঁদের দিন কাটাতে হচ্ছে। তবু তাঁরা কেউ ভেঙে পড়েননি। মহাপুরুষদের এই এক লক্ষণ, তাঁরা জানতেন—এ কষ্টের একটা অদৃশ্য সময়সীমা আছে, এবং চরম ধৈর্য ধরে এই কালবেলা পার হয়ে যেতে হবে। যুধিষ্ঠিরের মনে অবশ্য একটা সূক্ষ্ম কাঁটা সবসময় বিঁধে থাকত। রাতে গভীর জঙ্গল যখন নিশুতি হয়ে যেত, ঘুম আসত না তাঁর। বিষণ্ণ মনে ভাবতেন—আমার জন্যই তো ভাইদের এই দুর্দশা। আমার সেই আত্মঘাতী পাশা খেলার অপরাধেই আজ ওরা বনে বনে ঘুরছে। এই অপরাধবোধ কিছুতেই তাঁকে শান্ত হতে দিত না। কিন্তু ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব, কিংবা দ্রৌপদী—কেউই যুধিষ্ঠিরের সামনে সেই দুঃখের ছায়া মুখে ফুটতে দিতেন না। ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ হলেও, বাইরে তাঁরা ছিলেন হ্রদের মতো স্থির, শ...