যক্ষের প্রশ্ন ও যুধিষ্ঠিরের উত্তর (যক্ষ প্রশ্নাবলী) থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নোত্তর
মহাভারতের বনপর্বে বর্ণিত বিখ্যাত যক্ষের প্রশ্ন ও যুধিষ্ঠিরের উত্তর (যক্ষ প্রশ্নাবলী) থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নোত্তর নিচেবিষদ ভাবে অলোচনা করা হলো
যুধিষ্ঠির বললেন-'আমি আপনার অধিকৃত জিনিস নিতে চাই না। আপনি আমাকে প্রশ্ন করুন। কোনো সং ব্যক্তি নিজের প্রশংসা করেন না। আমি আমার বুদ্ধি অনুসারে তার উত্তর দেব।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'সূর্য কার দ্বারা উদিত হয়? তাঁর চার দিকে কারা চলেন? কে তাঁকে অন্তে পাঠায়? আর তিনি কিসে প্রতিষ্ঠিত?'
যুধিষ্ঠির বললেন-'সূর্য ব্রহ্ম দ্বারা উদিত হন। তাঁর চারদিকে দেবতারা চলেন। ধর্ম তাঁকে অন্তে পাঠায় এবং তিনি সত্যে প্রতিষ্ঠিত।'
যক্ষ প্রশ্ন করল-'মানুষ কিসের দ্বারা বেদাধ্যেতা হয়? কিসের দ্বারা মহৎ পদ লাভ হয়? কিসের সাহায্যে তারা ব্রহ্মরূপ প্রাপ্ত হয়? এবং কী করে বুদ্ধিমান হয়?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'শ্রুতির দ্বারা মানুষ বেদাধ্যেতা হয়। তপস্যার দ্বারা মহৎপদ প্রাপ্ত হয়। ধৃতির দ্বারা ব্রহ্মরূপ প্রাপ্ত হয় এবং বৃদ্ধ ব্যক্তিদের সেবার দ্বারা বুদ্ধিমান হয়।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'ব্রাহ্মণদের দেবত্ব কী? তাদের মধ্যে সৎপুরুষের ন্যায় ধর্ম কী? মনুষ্যত্ব কী? অসৎ ব্যক্তির ন্যায় আচরণ কী?'
যুধিষ্ঠির বললেন-'বেদের স্বাধ্যায়ই ব্রাহ্মণদের দেবত্ব, তপস্যাই সৎ পুরুষদের ধর্ম, মৃত্যুই মানুষ ভাব এবং নিন্দা করাই হল অসৎ ব্যক্তির ন্যায় আচরণ।'
যক্ষ প্রশ্ন করল-ক্ষত্রিয়দের দেবত্ব কী? তাদের মধ্যে সৎপুরুষের ন্যায় ধর্ম কী? মনুষ্যত্ব কী? এবং তাদের অসৎ ব্যক্তির ন্যায় আচরণ কী?
যুধিষ্ঠির বললেন-অস্ত্রশিক্ষায় পারদর্শিতা ক্ষত্রিয়দেরমদেবত্ব, যজ্ঞ করা হল তাঁদের সৎপুরুষের ন্যায় ধর্ম, ভয় হল মানবিক ভাব এবং দীনকে রক্ষা না করা হল অসৎ ব্যক্তির আচরণ।
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'যজ্ঞীয় সাম বস্তুটি কী? যজ্ঞীয় যজুঃ কী? কোন বস্তুটি যজ্ঞকে বরণ করে? এবং কাকে যজ্ঞ অতিক্রম করে না?'
যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন- 'প্রাণই যজ্ঞীয় সাম, মন যজ্ঞীয় যজুঃ, একমাত্র ঋক্ যজ্ঞ অতিক্রম করে না।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'দেবতর্পণকারীদের কোন বস্তু শ্রেষ্ঠ? পিতৃপুরুষদের তর্পণকারীদের জন্য কী শ্রেষ্ঠ? প্রতিষ্ঠা যারা চায় তাদের নিকট কোন বস্তু শ্রেষ্ঠ? সন্তান আকাঙ্ক্ষাকারীদের নিকট শ্রেষ্ঠ কী?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'দেবতর্পণকারীদের পক্ষে বর্ষাই শ্রেষ্ঠ, পিতৃতর্পণকারীদের জন্য ধন-ধান্য সম্পত্তি শ্রেষ্ঠ, প্রতিষ্ঠা যারা চায় তাদের কাছে গোধন শ্রেষ্ঠ এবং সন্তান আকাঙ্ক্ষাকারীদের কাছে পুত্রই শ্রেষ্ঠ।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'এমন কোন ব্যক্তি আছে যে ইন্দ্রিয়ের বিষয় অনুভব করে, শ্বাস গ্রহণ করে, বুদ্ধিমান, সম্মানিত এবং সকল প্রাণীগণের নিকট মাননীয় হয়েও প্রকৃতপক্ষে জীবিত নয়।'
যুধিষ্ঠির বললেন-'যে ব্যক্তি দেবতা, অতিথি, সেবক, মাতা-পিতা ও আত্মা-এই পাঁচকে পোষণ করে না, সে শ্বাস-প্রশ্বাসকারী হলেও জীবিত নয়।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'পৃথিবীর থেকে ভারী কী?আকাশের থেকে উঁচু কী? বায়ুর থেকে বেগে কী চলে এবং তৃণের থেকে সংখ্যায় অধিক কী?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'মাতা পৃথিবীর থেকে ভারী অর্থাৎ বেশি, পিতা আকাশের থেকেও উঁচু, মন বায়ুর থেকেও বেগে চলে এবং চিন্তা তৃণের থেকেও অধিক।'
যক্ষ প্রশ্ন করল-'ঘুমোলে কার পলক বন্ধ হয় না? জন্মালেও নিশ্চেষ্ট থাকে কে? কার হৃদয় নেই? বেগের সাহায্যে কে বৃদ্ধি পায়?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'মাছ ঘুমোলেও পলক বন্ধ করে না। ডিম উৎপন্ন হয়েও নিশ্চেষ্ট থাকে। পাথরের হৃদয় নেই নদী বেগের সাহায্যে বৃদ্ধি পায়।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'বিদেশে গমনকারীর মিত্র কে? গৃহে বাসকারীর মিত্র কে? রোগীর মিত্র কে? মৃত্যুর নিকট পৌঁছান ব্যক্তির মিত্র কে?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'সঙ্গের যাত্রীই বিদেশ গমনকারীয় মিত্র। গৃহবাসকারীর মিত্র তার স্ত্রী, বৈদ্য রোগীর মিত্র এবং মুমূর্ষু ব্যক্তির দানই হল তার মিত্র।'
যক্ষ জিজ্ঞাসা করলেন- 'সমস্ত প্রাণীর অতিথি কে সনাতন ধর্ম কী? অমৃত কী এবং এই সমস্ত জগৎ কী?'
যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন- 'অগ্নি সমস্ত প্রাণীর অতিথি, অবিনাশী নিত্যধর্মই সনাতন ধর্ম, গোরুর দুধ অমৃত এবং বায়ু হল সমস্ত জগৎ।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'কে একাকী বিচরণ করে? একবার উৎপন্ন হয়ে কে পুনর্বার উৎপন্ন হয়? শীতের উপশম কী? মহান্ ক্ষেত্র কোনটি?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'সূর্য একাকী বিচরণ করেন। চন্দ্র একবার জন্ম নিয়ে পুনরায় জন্ম নেয়, শীতের প্রতিকার অগ্নি এবং পৃথিবী হল সর্বাপেক্ষা মহাক্ষেত্র।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'ধর্মের প্রধান স্থান কী? যশের প্রধান স্থান কী? স্বর্গের প্রধান স্থান কী?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'ধর্মের মুখ্য স্থান দক্ষতা, যশের মুখ্য স্থান দান, স্বর্গের মুখ্য স্থান সত্য এবং সুখের প্রধান স্থান শীল।'
যক্ষ প্রশ্ন করলেন-'মানুষের আত্মা কী? তা দৈবকৃত সখা কে? জীবনের সহায়ক কে এবং তার পরম আশ্রয় কী?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'পুত্র মানুষের আত্মা। স্ত্রী তার দৈবকৃত সখা। মেঘ তার জীবনের সহায়ক এবং দানই হল পরম আশ্রয়।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'যিনি ধন্যবাদের পাত্র তাঁর উত্তম গুণ কী? ধনের মধ্যে উত্তম ধন কী? লাভের মধ্যে প্রধান লাভ কী এবং সুখের মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠ সুখ?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'ধন্যবাদের যোগ্য ব্যক্তিদের ক্ষতাই উত্তম গুণ, ধনাদির মধ্যে শাস্ত্রজ্ঞান উত্তম, লাভের মধ্যে আরোগ্যই প্রধান এবং সুখের মধ্যে সন্তোষই প্রধান সুখ।
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'ইহলোকে শ্রেষ্ঠ ধর্ম কী? নিত্য ফলদায়ক ধর্ম কী? কাকে বশে রাখলে শোক হয় না? কার সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করলে তা নষ্ট হয় না?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'ইহলোকে শ্রেষ্ঠ ধর্ম হল দয়া, বেদোক্ত ধর্ম নিত্য ফলদায়ক। মনকে বশে রাখলে শোক হয় না এবং সৎব্যক্তির সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করলে তা নষ্ট হয় না।
যক্ষ প্রশ্ন করল-'কোন বস্তু ত্যাগ করলে মানুষ প্রিয় হয়? কী ত্যাগ করে দিলে মানুষ শোক করে না? কী ত্যাগ বলে মানুষ অর্থবান হয় এবং কী ত্যাগ করলে সে সুখী ?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'মান ত্যাগ করলে মানুষ প্রিয় হয়, ক্রোধ ত্যাগ করলে শোক হয় না। কাম ত্যাগ করলে অর্থবান হয় এবং লোভ ত্যাগ করলে সুখী হয়।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'ব্রাহ্মণকে কেন দান করা হয়? নট ও নটীদের কেন দান করা হয়? সেবকদের দান করার প্রয়োজন কী? এবং রাজাকে কেন দান দেওয়া হয়?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'ব্রাহ্মণকে ধর্মের জন্য দান করা হয়, নট ও নটীদের যশের জন্য দান বা পুরস্কৃত করা হয়, সেবকদের পালন-পোষণের জন্য দান (বেতন) দিতে হয়। রাজাকে ভয় হতে রক্ষার জন্য দান (কর) দেওয়া হয়।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'জগৎ কোন বস্তু দিয়ে আচ্ছাদিত? কিসের জন্য এটি প্রকাশিত হয় না? মানুষ কীসের জন্য মিএকে ত্যাগ করে? এবং কোন্ কারণে স্বর্গগমন হয় না ?'
যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন- 'জগৎ অজ্ঞান দ্বারা আচ্ছাদিত, তমোগুণের কারণে তা প্রকাশিত হয় না।।
লোভের জন্য মানুষ মিত্রকে পরিত্যাগ করে এবং আসক্তির অন্য স্বর্গে গমন করে না।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'পুরুষকে কোন অবস্থায় মৃত বলা হয়? কোন অবস্থায় রাষ্ট্রকে মৃত বলা হয়? শ্রাদ্ধ কী করে মৃত হয়, এবং যজ্ঞ কীভাবে মৃত হয়?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'দরিদ্র ব্যক্তি মৃততুল্য, রাজা বিহনে রাষ্ট্র মৃততুল্য হয়ে থাকে। শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণ ব্যতীত শ্রাদ্ধ মৃত, বিনা দক্ষিণায় যজ্ঞ মৃত।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'দিশা (দিক) কী? জল কী? অন্ন কী? বিষ কী? এবং শ্রাদ্ধের সময় কী, তা বলো।'
যুধিষ্ঠির বললেন-'সৎ ব্যক্তিই দিশা (দিক) । আকাশ জল, গাভী অন্ন, প্রার্থনা (কামনা) বিষ এবং ব্রাহ্মণই শ্রাদ্ধের সময়।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'ক্ষমা কী? লজ্জা কাকে বলে? তপের লক্ষণ কী? এবং দম কাকে বলে?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'দ্বন্দ্ব সহ্য করাই ক্ষমা, করার মতো কাজ থেকে দূরে থাকাই লজ্জা, নিজ ধর্মে স্থিত থাকাই তপ এবং মনকে দমন করাকেই দম বলা হয়।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'রাজন! জ্ঞান কাকে বলে? শম কী? দয়া কার নাম এবং সরলতা কাকে বলা হয়?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'প্রকৃত বস্তুকে সঠিকভাবে জানাই হল জ্ঞান, চিত্তের শান্তি হল শম, সকলের জন্য সুখের ইচ্ছ্য থাকা দয়া এবং সমচিত্ত হওয়াই সরলতা।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'মানুষের দুর্জয় শত্রু কে? অনন্ত ব্যাধি কী? সাধু বলে কাকে গণ্য করা হবে এবং অসাধু কাকে বলা হয়?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'ক্রোধ দুর্জয় শত্রু। লোভ অনন্ত ব্যাধি; যে সকল প্রাণীর হিত করে থাকে সে সাধু এবং নির্দয় পুরুষকে অসাধু বলা হয়।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'রাজন! মোহ কাকে বলে? মান কাকে বলে? আলস্য কাকে বলে এবং শোক কাকে বলে?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'ধর্মমূঢ়তাই মোহ, আত্মাভিমানই মান, ধর্মপালন না করা হল আলস্য এবং অজ্ঞানই শোক।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'ঋষিগণ স্থৈর্য কাকে বলেন? ধৈর্য কাকে বলে, স্নান কাকে বলে এবং দান কিসের নাম?'
যুধিষ্ঠির বললেন-'নিজ ধর্মে স্থির থাকাই দৈর্য, ইন্দ্রিয়-নিগ্রহ ধৈর্য, মানসিক কলুষ ত্যাগ করা হল স্নান এবং প্রাণীদের রক্ষা করাকে বলা হয় দান।'
যক্ষ প্রশ্ন করল-'কোন ব্যক্তিকে পণ্ডিত বলে বুঝতে হবে? নাস্তিক কাকে বলে? মূর্খ কে? কাম কাকে বলে? এবং মৎসর কাকে বলা হয়?'
যুধিষ্ঠির বললেন-'ধর্মজ্ঞ ব্যক্তিকে পণ্ডিত বলা হয়, মূর্খকে নাস্তিক বলা হয় আর নাস্তিক ব্যক্তি মূর্খ হয়, যা জন্ম-মৃত্যু চক্রে নিক্ষেপ করে সেই বাসনাকে কাম বলা হয় এবং হৃদয়ের সন্তাপকে বলা হয় মৎসর।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'অহংকার কাকে বলে? দম্ভ কাকে বলে? পরমদৈব কাকে বলা হয়? পৈশুন্য কার নাম?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'অহংকার হল মহা অজ্ঞান, নিজেকে অযথা বড় ধর্মাত্মা বলে জাহির করা হল দম্ভ। দানের ফলকে দৈব বলে এবং অপরের দোষ অন্যকে বলা হল পৈশুন্য।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'ধর্ম, অর্থ ও কাম-এগুলি পরস্পর বিরোধী। এই নিত্য বিরুদ্ধগুলি কী করে একস্থানে সংযুক্ত হয়?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'যখন ধর্ম ও ভার্যা পরস্পর বশবর্তী হয় তখন ধর্ম, অর্থ ও কাম-এই তিনের সংযুক্তি হওয়া সম্ভব।
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'ভরতশ্রেষ্ঠ! অক্ষয় নরক কোন ব্যক্ত প্রাপ্ত হয়?'
যুধিষ্ঠির বললেন-'যে ব্যক্তি কোনো দরিদ্র ভিক্ষার্থী ব্রাহ্মণকে ডেকে তাকে ভিক্ষা না দেয়, সে অক্ষয় নরক প্রাপ্ত হয়। যে ব্যক্তি বেদ, ধর্মশাস্ত্র, ব্রাহ্মণ, দেবতা এবং পিতৃধর্মে মিথ্যাবুদ্ধি রাখে, সে অক্ষয় নরক প্রাপ্ত হয়।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'রাজন্! কুল, আচার, স্বাধ্যায় এবং শাস্ত্রশ্রবণ-এগুলির মধ্যে কার সাহায্যে ব্রাহ্মণত্ব সিদ্ধ হয়, ঠিক করে তা আমাকে জানাও।'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'প্রিয় যক্ষ শোনো! কুল, স্বাধ্যায় এবং শাস্ত্রশ্রবণ-এগুলির কোনোটিই ব্রাহ্মণত্বের কারণ নয়; আচার ও আচরণই ব্রাহ্মণত্বের কারণ। সুতরাং যত্ন
পূর্বক সদাচার রক্ষা করা উচিত। ব্রাহ্মণদের বিশেষভাবে এদিকে দৃষ্টি রাখা উচিত; কারণ যার সদাচার অক্ষুণ্ণ থাকে, তারই ব্রাহ্মণত্ব বজায় থাকে। যার সদাচার নষ্ট হয়ে গেছে, সে স্বয়ং নাশ হয়ে যায়। যে পড়ে, যে পড়ায় এবং যে শাস্ত্রবিচার করে তারা সব বিলাসী এবং মূর্খ; সেই পণ্ডিত, যে নিজ কর্তব্য ঠিকমতো পালন করে। চারবেদ পাঠ করার পরেও যদি কেউ দুষ্ট আচরণ সম্পন্ন হয়, তাহলে সে শূদ্রেরও অধম। প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি অগ্নিহোত্রে তৎপর এবং জিতেন্দ্রিয় তাকে 'ব্রাহ্মণ' বলা হয়।'
যক্ষ প্রশ্ন করল- 'মধুর বাক্য যারা বলে তারা কী পায়? যারা ভেবে চিন্তে কাজ করে তারা কী পায়? যে অনেক বন্ধু তৈরি করে, তার কী লাভ হয়? যে ব্যক্তি ধর্মনিষ্ঠ, সে কী পায়?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'যারা মধুর বাক্য বলে, তারা সকলের প্রিয় হয়। যারা ভেবে-চিন্তে কাজ করে তারা বেশি সাফল্য লাভ করে; যে ব্যক্তি অনেক বন্ধু তৈরি করে, সে সুখে দিন কাটায় এবং যে ধর্মনিষ্ঠ, সে সম্প্রতি লাভ করে।' যক্ষ প্রশ্ন করল- 'সুখী কে? আশ্চর্য কী? পথ কী? বার্তা কী? আমার এই চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'যার কোনো ঋণ নেই, যে ব্যক্তি প্রবাসী নয়, যে দিনের পঞ্চম বা ষষ্ঠ ভাগেও নিজ গৃহে শাক-ভাত রান্না করে খেতে পারে-সেই সুখী। প্রাণী নিত্য যমের দ্বারে যাচ্ছে; কিন্তু যে বেঁচে থাকে, সে সর্বদা বেঁচে থাকার আশা করে এর থেকে বেশি আশ্চর্যের আর কি হতে পারে! তর্কের কোনো স্থিতি নেই, শ্রুতিও ভিন্ন ভিন্ন হয়, কোনো একজন ঋষির বচন শিরোধার্য বলে মানা যায় না, ধর্মের তত্ত্ব অত্যন্ত গূঢ়; সুতরাং যে পথে মহাপুরুষ গমন করেন, তাই হল প্রকৃত পথ। এই মহামোহরূপ কড়াইতে কালরূপ ভগবান সমস্ত প্রাণীকে মাস ও ঋতুরূপ হাতা দিয়ে সূর্যরূপ অগ্নি এবং রাত ও দিনরূপ ইন্ধন দিয়ে রান্না করছেন এটাই বার্তা।'
যক্ষ বলল-'তুমি আমার সব প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর দিয়েছ। এবার তুমি পুরুষের ব্যাখ্যা করো এবং বল সবথেকে ধনী কে?'
যুধিষ্ঠির বললেন- 'যে ব্যক্তির পুণ্যকর্মের কীর্তির আওয়াজ স্বর্গ ও ভূমি স্পর্শ করে, পুরুষ সেই পর্যন্ত থাকেন। যাঁর কাছে প্রিয়-অপ্রিয়, সুখ-দুঃখ এবং ভূত-ভবিষ্যৎ-সব সমান, তিনিই সব থেকে ধনী ব্যক্তি।'

Comments
Post a Comment