সুদর্শন চক্র ও এক অহংকারী দুর্বাসা ঋষির দর্পচূর্ণ



এখানে দুর্বাসা মুনির মূলত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও পুরাণ-বর্ণিত সূর্যবংশীয় পরম ধার্মিক রাজা অম্বরীষ এবং তাঁর ওপর সুদর্শন চক্রের আক্রমণের সেই বিখ্যাত পৌরাণিক কাহিনিটি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা হলো: 

সুদর্শন চক্র ও এক অহংকারী দুর্বাসা ঋষির দর্পচূর্ণ

একাদশী ব্রতের শেষে দ্বাদশীর সকালটা যখন কুরুক্ষেত্রের আকাশে আলোর রেখা ফুটিয়ে তুলছিল, রাজা অম্বরীষ তখন পদ্মাসনে বসে। চোখে তাঁর পরম বিষ্ণুভক্তির এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। সারা বছরের কঠোর উপবাস আর কৃচ্ছ্রসাধনের পর আজ ব্রত উদযাপনের দিন। ঠিক সেই মুহূর্তেই তপোবনের শান্ত বাতাসকে চিরে দিয়ে সশিষ্য এসে উপস্থিত হলেন মহর্ষি দুর্বাসা। জটাধারী, রূঢ় স্বভাবের সেই ঋষির আগমনে রাজপ্রাসাদের বাতাসে যেন এক লহমায় উত্তেজনার পারদ চড়ে গেল।

অম্বরীষ উঠে দাঁড়িয়ে পরম শ্রদ্ধায় পাদ্য-অর্ঘ্য দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন মুনিকে। বিনীত স্বরে বললেন, "মহর্ষি, আজ আমার পরম ভাগ্য। দ্বাদশীর এই পুণ্যলগ্নে আপনি অনুগ্রহ করে অন্নগ্রহণ করুন।"

দুর্বাসা রুক্ষ গলায় বললেন, "অপেক্ষা করো রাজন, আমি যমুনার জলে স্নান আর নিত্য আহ্নিক সেরে আসছি। তার আগে যেন অন্নস্পর্শ না হয়।"

সময় বয়ে যেতে লাগল। নদীর ঘাটে ঋষির স্নান আর শেষ হয় না। এদিকে দ্বাদশী তিথির পুণ্য সময়টুকু পেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। সনাতন নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পারণ না করলে সমস্ত বছরের ব্রতের ফল এক নিমেষে পণ্ড হয়ে যায়। আবার অতিথিকে বসিয়ে রেখে নিজে অন্নগ্রহণ করাও মহাপাপ। এই মহাসংকটে পড়ে ব্যাকুল অম্বরীষ রাজপুরোহিতদের শরণাপন্ন হলেন। পণ্ডিতেরা বিধান দিলেন—এক ফোঁটা তুলসী জল পান করুন রাজন। জলগ্রহণ করলে শাস্ত্র মতে উপবাসও ভাঙা হবে, আবার অন্নগ্রহণ না করায় অতিথিকে অপমানও করা হবে না। অম্বরীষ ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে তাই করলেন।

কিন্তু নিয়তির খেলা অন্যরকম ছিল। স্নান সেরে ফিরে এসেই দুর্বাসা মুনি তাঁর ত্রিকালজ্ঞ দিব্যদৃষ্টিতে সবটা জেনে ফেললেন। অম্বরীষ জল স্পর্শ করেছেন! এই সামান্য ঘটনায় ক্রোধে অন্ধ হয়ে গেলেন ঋষি। তাঁর চোখ দুটো যেন আগুনের গোলক হয়ে উঠল। চিৎকার করে বললেন, "রে পামর রাজা! তুই নিজেকে পরম ভক্ত ভাবিস? অতিথিকে অভুক্ত রেখে নিজে আগে জলগ্রহণ করিস! আজই তোকে এর চরম শিক্ষা দেব।"

কথাটা শেষ করেই নিজের মাথা থেকে এক গোছা জটা ছিঁড়ে মাটিতে আছাড় মারলেন দুর্বাসা। সেই জটা থেকে নিমেষের মধ্যে জন্ম নিল ‘কৃত্যা’ নামের এক প্রলয়ংকরী, ভয়ংকর রাক্ষসী। লকলকে জিভ আর হাতের খাঁড়া নিয়ে সে ছুটে গেল শান্ত, হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকা অম্বরীষের দিকে। অম্বরীষ নড়লেন না, পালালেন না। শুধু চোখ দুটি বুজে তাঁর আরাধ্য শ্রীহরির চরণে নিজেকে সঁপে দিলেন।

আর ঠিক তখনই ঘটল সেই অলৌকিক কাণ্ড। শূন্য চিরে, মেঘের বুক ফুঁড়ে নেমে এল এক তীব্র সূর্যসম আলো—ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র! তার ঘূর্ণনের শব্দে কেঁপে উঠল দিকবিদিক। এক পলকে সুদর্শন চক্র সেই ভয়ংকর রাক্ষসীকে ভস্মস্তূপে পরিণত করল। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়; ভক্তের দিকে যে হাত বাড়িয়েছিল, সেই অপরাধে চক্র এবার তীব্র গতিতে তাড়া করল স্বয়ং দুর্বাসা মুনিকে।

সেই প্রলয়ংকরী উত্তাপ আর মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে দুর্বাসা দৌড়াতে শুরু করলেন। ব্রহ্মলোকে গেলেন, ব্রহ্মা মুখ ফিরিয়ে নিলেন। শিবের কৈলাসে গেলেন, মহাদেব বললেন, "শ্রীহরির চক্রকে শান্ত করার ক্ষমতা আমার নেই ঋষি।" মরিয়া হয়ে দুর্বাসা ছুটলেন খোদ বৈকুণ্ঠে, শ্রীবিষ্ণুর চরণে আছাড় খেয়ে পড়লেন প্রাণভিক্ষা চেয়ে।

নীলকান্তমণি সম শান্ত স্বরে ভগবান বিষ্ণু বললেন, "মহর্ষি, আমি ভক্তের অধীন। আমার কোনো স্বাধীন সত্তা নেই। আপনি আমার পরম প্রিয় ভক্ত অম্বরীষের চরণে অপরাধ করেছেন। সুদর্শনকে শান্ত করার ক্ষমতা আমারও নেই। আপনি যাঁর ক্ষতি করতে চেয়েছিলেন, তাঁর কাছেই ফিরে যান। একমাত্র সেই ভক্তের ক্ষমাই আপনাকে রক্ষা করতে পারে।"

মহাবিশ্বের সমস্ত অহংকার চূর্ণ হয়ে গেল দুর্বাসার। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত ও সুদর্শন চক্রের তাপে দগ্ধ ঋষি ফিরে এলেন মর্ত্যে, রাজা অম্বরীষের রাজসভায়। যে ঋষির পায়ের ধূলো নিতে রাজারা লাইন দিতেন, আজ সেই ঋষি এসে আছাড় খেয়ে পড়লেন এক সাধারণ মর্ত্যের রাজার পায়ে।

অম্বরীষ লজ্জিত হলেন, ব্যথিত হলেন। তিনি হাত জোড় করে সুদর্শনের স্তুতি গাইলেন, "হে পরম পবিত্র সুদর্শন, যদি আমি সত্যই নিষ্কাম চিত্তে ভগবানের আরাধনা করে থাকি, তবে তুমি শান্ত হও। এই ব্রাহ্মণকে রক্ষা করো।"

ক্ষণিকের মধ্যে সেই রুদ্ররূপী চক্র শান্ত হয়ে শূন্যে মিলিয়ে গেল। সুদর্শনের সেই তীব্র প্রতাপ আর একনিষ্ঠ ভক্তের অলৌকিক ক্ষমার রূপ দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন দুর্বাসা। সেই দিন তিনি চিনেছিলেন ভগবানের চেয়েও তাঁর ভক্তের শক্তি কত বেশি। আর সেই দিন থেকেই ‘অম্বরীষের সেই ভয়ংকর সুদর্শন’ তাঁর মনের ভেতর এক চিরন্তন ভয়ের আসন পেতে বসেছিল, যা তিনি মহাভারতের বনবাসে পাণ্ডবদের কুটিরে এসেও ভুলতে পারেননি।

বি: দ্র:- মহাভারতের বনবাসে পাণ্ডবদের কুটিরে দুর্বাসা মুনির গল্পটি জানতে এখানে ক্লিক করুন।


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ