মহাকাব্যের পাতায় কত যুদ্ধই তো লেখা আছে। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের সেই মহামানবের সমুদ্র-মন্থনের বহু আগেই, অলক্ষ্যে আর একটি যুদ্ধের বীজ বোনা হয়ে গিয়েছিল। সে যুদ্ধ অসি আর ধনুকের নয়, সে যুদ্ধ অপমান, জেদ আর এক নারীর বুকভাঙা অভিশাপের।
ভীষ্ম তখন তাঁর অপরাজেয় যৌবনের চূড়ায়। ভাই বিচিত্রবীর্যের জন্য কাশীরাজের স্বয়ংবর সভা থেকে তিন রাজকন্যা—অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকাকে বলপূর্বক হরণ করে আনলেন হস্তিনাপুরে। বীরের দর্প, ক্ষাত্রধর্মের হুঙ্কার! কিন্তু অন্তপুরের দরজায় দাঁড়িয়ে জ্যেষ্ঠা কন্যা অম্বা যখন নিচু স্বরে বললেন, “ভীষ্ম, আপনি ধর্মের সূক্ষ্ম গতি জানেন। আমি মনে মনে শাল্বরাজকে বরণ করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন।”—ভীষ্ম সেদিন তাঁকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। ধর্মের মর্যাদায় অম্বাকে যেতে দেওয়া হলো শাল্বরাজের রাজ্যে।
কিন্তু পুরুষতন্ত্রের সমাজ বড় নির্মম। শাল্বরাজ অম্বাকে ফিরিয়ে দিলেন এক ঠান্ডা হাসিতে— “যে নারী পরপুরুষের রথে উঠেছে, অন্য হাত যাকে স্পর্শ করেছে, তাকে শাল্ব গ্রহণ করে না। ফিরে যাও হস্তিনাপুরে।”
অম্বার মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ল। হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদ তাঁর জন্য বন্ধ, শাল্বের প্রেম এক নিমেষে পরিণত হলো মিথ্যে প্রবঞ্চনায়। জনপদের ধুলোয় একা দাঁড়িয়ে কাঁদলেন অম্বা। কিন্তু সেই জল রক্তে রূপ নিতে সময় নিল না। কার জন্য আজ তাঁর এই নিঃস্ব রূপ? কে কেড়ে নিল তাঁর নারীত্ব, তাঁর সম্মান? ভীষ্ম! এক ও একমাত্র ভীষ্ম!
প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে অম্বা গেলেন অরণ্যে, শরণ নিলেন মহামুনি পরশুরামের। স্বয়ং ভীষ্মের ধনুর্বিদ্যার গুরু, একবিংশতিবার ক্ষত্রিয়ের রক্তে ধরণী ভিজিয়ে দেওয়া সেই মহাপুরুষ অম্বার করুণ মুখে দেখে প্রতিশ্রুতি দিলেন—“ভীষ্মকে আমার কথা মানতে হবে, নতুবা তার বিনাশ নিশ্চিত।”
কুরুক্ষেত্রের সরস্বতী নদীর তীরে সেদিন গুরু আর শিষ্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর দৃশ্য আজও বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে ভেসে বেড়ায়।
পরশুরাম আজ্ঞা দিলেন, “ভীষ্ম, এই কন্যাকে বিবাহ করো। তোমার স্পর্শে ও আজ স্থানভ্রষ্ট।” ভীষ্ম মাথা নোয়ালেন, কিন্তু একচুলও সরলেন না তাঁর ভীষণ প্রতিজ্ঞা থেকে। মৃদু কিন্তু দৃঢ় স্বরে বললেন, “গুরুদেব, আমি আজন্ম ব্রহ্মচারী। যে নারী অন্য পুরুষকে মন সঁপেছে, তাকে গ্রহণ করা ক্ষাত্রধর্ম নয়। আপনি আজ্ঞা দিলেও আমি ধর্ম ত্যাগ করতে পারব না।”
গুরুর চোখ লাল হলো, ক্রোধে কেঁপে উঠল কুরুক্ষেত্রের প্রান্তর। “তবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও, ভীষ্ম!”
শুরু হলো মহাযুদ্ধ। একপাশে সর্বাস্ত্রবিদ গুরু পরশুরাম, অন্যপাশে তাঁরই শ্রেষ্ঠ শিষ্য, গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম। পঁচিশ দিন ধরে কুরুক্ষেত্রের প্রান্তর কেঁপে উঠল দিব্যাস্ত্রের হুঙ্কারে, বাণের আলোড়নে সূর্য ঢাকা পড়ল, দেবতারা স্তব্ধ হয়ে দেখলেন দুই মহাবীরের রণ তাণ্ডব। শিষ্যের বাণে গুরু ক্ষতবিক্ষত হন, গুরুর পরশু সামলান শিষ্য। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত হয় না। অবশেষে দেবতারা ও পিতৃপুরুষেরা স্বয়ং আবির্ভূত হয়ে থামালেন সেই যুদ্ধ। পরশুরাম অম্বাকে ডেকে করুণ চোখে বললেন, “কন্যা, ভীষ্মকে যুদ্ধে পরাস্ত করা ত্রিভুবনে কারও পক্ষে সম্ভব নয়। আমি পরাজিত। তুমি অন্য উপায় দেখো।”
অম্বা হাসলেন। সে হাসি কোনো পরাজিত নারীর নয়, সে হাসি এক ভয়ঙ্কর আগ্নেয়গিরির। তিনি বুঝে গেলেন, পুরুষের অস্ত্র দিয়ে ভীষ্মকে বধ করা যাবে না। ভীষ্মকে মারতে হলে নিজেকেই অস্ত্র হতে হবে।
নগর, গৃহ, বন্ধন—সব ত্যাগ করে অম্বা প্রবেশ করলেন গভীর অরণ্যে। শুরু হলো ঘোর তপস্যা। শীতে জল, গ্রীষ্মে পঞ্চাগ্নি—শরীর শুকিয়ে কাঠ হলো, জটা বাঁধল চুলে, কিন্তু চোখের ভেতরের আগুন নেভাল না কোনো বৃষ্টি। দেবাধিদেব মহাদেব প্রসন্ন হয়ে দেখা দিলেন।
“কী বর চাও, কন্যা?” অম্বার শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটে ফুটে উঠল একটিই কথা—“ভীষ্মের মৃত্যু!”
শিব বললেন, “পরজন্মে তুমি দ্রুপদ রাজার ঘরে জন্ম নেবে। নারী হয়ে জন্ম নিলেও তুমি পুরুষত্ব লাভ করবে এবং কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে ভীষ্মের পতনের কারণ হবে।”
সেই শেষ। অম্বা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করেননি। মহাদেবের বর পাওয়ার পরেই তিনি কাষ্ঠচিতা সাজালেন। জ্বলন্ত আগুনের শিখায় নিজের দেহ আহুতি দেওয়ার সময় তাঁর চোখে কোনো ভয়ের ছায়া ছিল না। তিনি ছাই হয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বাতাসে রেখে যাচ্ছিলেন একটি শব্দ—প্রতিশোধ।
পরজন্মে পঞ্চালরাজ দ্রুপদের ঘরে জন্ম নিল এক কন্যা—শিখণ্ডী। যে পরবর্তীতে তপস্যার গুণে পুরুষত্ব অর্জন করেছিল। কুরুক্ষেত্রের দশম দিনে, যখন বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্মের বাণে পাণ্ডব সেনা ছিন্নভিন্ন হচ্ছে, ঠিক তখনই অর্জুনের রথের সামনে এসে দাঁড়াল সেই শিখণ্ডী।
ভীষ্ম ধনুক নামিয়ে রাখলেন। রাজসভায় দেওয়া সেই চিরন্তন প্রতিজ্ঞা—কোনো নারী, বা যে পূর্বে নারী ছিল, তার গায়ে গঙ্গাপুত্র শস্ত্র তুলে নেবেন না। অর্জুন শিখণ্ডীর আড়াল থেকে শরের পর শর বিদ্ধ করলেন ভীষ্মের শরীরে।
যে অম্বাকে ভীষ্ম একদিন রথে তুলে নিয়ে এসেছিলেন, শতাব্দীর পরিক্রমায় সেই অম্বাই শিখণ্ডী হয়ে ভীষ্মকে শুইয়ে দিলেন শরশয্যায়। মহাকাব্যের নিয়ম বড় বিচিত্র—প্রতিটি অহংকারের জন্য একটি করে অভিশাপ অপেক্ষা করে থাকে, আর প্রতিটি অপমানের হিসাব প্রকৃতি ঠিক কোনো না কোনো জন্মে কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নেয়।
Comments
Post a Comment