৪১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব রক্তস্নানের প্রাক্কালে: দম্ভ, ত্যাগ আর অমোঘ নিয়তি
৪১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব
রক্তস্নানের প্রাক্কালে: দম্ভ, ত্যাগ আর অমোঘ নিয়তি
কুরুক্ষেত্রের আকাশে তখন আসন্ন প্রলয়ের মেঘ। বার্তা এলো, কৌরবদের সেনাপতি পদে বরণ করা হয়েছে বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্মকে। খবরটা শোনামাত্র শান্ত, স্থির ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির চমকে উঠলেন। অনুজদের আর কৃষ্ণকে কাছে ডেকে ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন, "তোমরা অতি সাবধানে থেকো। আমাদের প্রথম লড়াইটাই তো সাক্ষাৎ পিতামহের বিরুদ্ধে! এখনই আমাদের বাহিনী সাজাতে হবে, সাতজন যোগ্য সেনাপতির কাঁধে দিতে হবে দায়িত্ব।"
বাসুদেব কৃষ্ণ মৃদু হেসে সায় দিলেন, "রাজন, ঠিক সময় উপযোগি সিদ্ধান্তই নিয়েছেন আপনি। দ্রুত সেনানায়ক নির্বাচন শেষ করুন।"
শাস্ত্রীয় বিধান মেনে দ্রুপদ, বিরাট, সাত্যকি, ধৃষ্টকেতু, শিখণ্ডী, মগধরাজ সহদেব এবং ধৃষ্টদ্যুম্নকে সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করা হলো। আর এই সমস্ত বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেন সব্যসাচী অর্জুন—যার পথের দিশারী স্বয়ং জনার্দন।
এমন সময় পাণ্ডবদের শিবিরে এলেন বলরাম। সঙ্গে যাদব বীরদের এক বিরাট দল—অক্রূর, গদ, প্রদ্যুম্ন, শাম্ব। যুধিষ্ঠির ও কৃষ্ণ সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন বলভদ্রকে। কিন্তু বলরামের চোখেমুখে ছিল গভীর বিষাদ। বিষণ্ণ স্বরে তিনি বললেন, "কৃষ্ণ, এ এক অমোঘ নিয়তি! এক ভয়ংকর নরসংহার থামানো আমাদের সাধ্যের বাইরে। তবে আমার মন বড় চঞ্চল। একদিকে এই পাণ্ডবরা, অন্যদিকে দুর্যোধন—দুজনই তো আমার প্রিয় শিষ্য, আমার আত্মীয়। কৃষ্ণ তো অর্জুনের প্রেমে অন্ধ, কিন্তু আমি রক্তক্ষয়ী এই কুরুবংশের বিনাশ চোখের সামনে দেখতে পারব না। আমি নিরপেক্ষ হয়ে সরস্বতী নদীর তীরে তীর্থযাত্রায় চললাম।" বিদায় নিয়ে চলে গেলেন বলরাম।
ঠিক তখনই মহা আড়ম্বরে পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশ করলেন রাজা ভীষ্মকের পুত্র অহঙ্কারী রুক্মী। এক অক্ষৌহিণী সৈন্য নিয়ে এসে অর্জুনকে দেখে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, "অর্জুন, ভয় পেয়ো না! আমি এসেছি বলেই জেনো জয় তোমাদের নিশ্চিত। দ্রোণ, ভীষ্ম, কর্ণ—সবাই একসঙ্গে এলেও আমি একাই ওদের ধুলোয় মিশিয়ে দেব!"
অর্জুন কেবল একটু হাসলেন। সহাস্যে বললেন, "মহাবীর, গাণ্ডীব যাঁর হাতে আর কৃষ্ণ যাঁর রথ চালায়, তাঁর আবার ভয় কিসের? ঘোষযাত্রার সময় বা বিরাট পর্বে যখন কৌরব সেনাকে একা পরাস্ত করেছিলাম, তখন কে এসেছিল সাহায্য করতে? ঈশ্বর আর আমার ধনুুর্বিদ্যার ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। আমার কোনো সহায়তার প্রয়োজন নেই, আপনি স্বেচ্ছায় চলে যেতে পারেন।"
রুক্মী অপমানিত হয়ে দুর্যোধনের কাছে গেলেন, কিন্তু স্বাভিমানী দুর্যোধনও রুক্মীর দম্ভ দেখে তাঁর সাহায্য প্রত্যাখ্যান করলেন। ফলে বলরাম নিরপেক্ষ রইলেন তাঁর নীতিতে, আর রুক্মী বাদ পড়লেন তাঁর অহংকারের কারণে।
ওদিকে অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়কে ডেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "সঞ্জয়, সৈন্য তো সাজানো হলো, এবার কী হবে? আমার স্পষ্ট মনে হয়, ভাগ্যই সব—পুরুষার্থ তুচ্ছ। আমি সবই বুঝি, কিন্তু দুর্যোধন সামনে এলেই আমার মতিচ্ছন্ন ঘটে। যা হওয়ার, তা-ই হবে!"
Continue Reading
Fill the form below to unlock the full post.
Comments
Post a Comment