শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: ১ম অধ্যায়- ৩য় শ্লোক বিষাদযোগ




শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: ১ম অধ্যায়- ৩য় শ্লোক  বিষাদযোগ

पश्यैतां पाण्डुपुत्राणामाचार्य महतीं चमूम् ।

व्यूढां द्रुपदपुत्रेण तव शिष्येण धीमता ।। 3।।

পশ্যৈতাং পাণ্ডুপুত্রাণামাচার্য মহতীং চমূম্। ব্যুঢ়াং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা ৷৷ ৩ ॥

কুরুক্ষেত্র প্রান্তরে দুর্যোধনের কূটনীতি ও দ্রোণাচার্যের উদারতা: একটি পর্যালোচনা

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ে কুরুক্ষেত্রের ধর্মক্ষেত্রে অধর্মের বিরুদ্ধে ধর্মের মহাসংগ্রামের সূচনাপর্বে কৌরবরাজ দুর্যোধনের কূটকৌশল ও গুরু দ্রোণাচার্যের প্রতি তাঁর সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক চাপের এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য উন্মোচিত হয়েছে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সূচনাতেই দুর্যোধন আচার্য দ্রোণের সম্মুখে পাণ্ডবদের সুবিশাল সৈন্যবাহিনী দেখে গভীর সংশয়ে নিপতিত হন এবং শ্লোকাকারে স্বীয় আচার্যকে উদ্দেশ্য করে বলেন—


পশ্যৈতাং পাণ্ডুপুত্রাণামাচার্য মহতীং চমূম্। ব্যূঢ়াং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা ॥

শব্দার্থ

পশ্য – দেখুন।

এতাম – এই।

পাণ্ডু-পুত্রাণাম – পাণ্ডুপুত্রদের।

আচার্য – হে গুরুদেব।

মহতীম – বিশাল।

চমূম – সৈন্যবাহিনীকে।

ব্যূঢ়াম – ব্যূহ আকারে সাজানো।

দ্রুপদ-পুত্রেণ – দ্রুপদপুত্রের (ধৃষ্টদ্যুম্ন) দ্বারা।

তব – আপনার।

শিষ্যেণ – শিষ্যের দ্বারা।

ধীমতা – বুদ্ধিমান।

কুরুক্ষেত্র প্রান্তরে কৌরবরাজের সূক্ষ্ম কূটনীতি ও দ্রোণাচার্যের পরম উদারতা: একটি পরমার্থিক পর্যালোচনা

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সূচনাপর্ব—প্রথম অধ্যায়ের তৃতীয় শ্লোকে—কুরুক্ষেত্রের ধর্মক্ষেত্রে অধর্মের বিরুদ্ধে ধর্মের মহাসংগ্রামের প্রাক্কালে কৌরবরাজ দুর্যোধনের কূটকৌশল, সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং আচার্য দ্রোণের মহতী উদারতার এক অত্যন্ত গভীর ও ভাবগম্ভীর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দুই বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থানের সময় দুর্যোধন তাঁর পরম গুরু দ্রোণাচার্যের সমীপে উপস্থিত হয়ে বিনম্র শ্রদ্ধার আবরণে পাণ্ডবদের সৈন্যবিন্যাস দেখিয়ে বলেন—

পশ্যৈতাং পাণ্ডুপুত্রাণামাচার্য মহতীং চমূম্। ব্যূঢ়াং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা ॥

অর্থাৎ, "হে আচার্য, আপনার পরম বুদ্ধিমান শিষ্য, দ্রুপদনন্দন ধৃষ্টদ্যুম্ন কর্তৃক পরম দক্ষতার সহিত ব্যূহবদ্ধ পাণ্ডবদের এই বিশাল বাহিনী কৃপাপূর্বক অবলোকন করুন।" এই সংক্ষিপ্ত উদবোধনের আড়ালে নিহিত রয়েছে দুর্যোধনের গভীর রাজনৈতিক অভিসন্ধি এবং কুরুক্ষেত্রের প্রেক্ষাপটের এক ট্রাজিক ইতিহাস।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও দ্রোণাচার্যের ব্রহ্মতেজ

এই শ্লোকটির তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে অতীত ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক। পঞ্চালরাজ দ্রুপদের সঙ্গে আচার্য দ্রোণের তীব্র রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল। সেই শত্রুতার বশবর্তী হয়ে দ্রুপদরাজ যাজ ও উপযাজ নামক দুই মহর্ষি দ্বারা এক মহাসত্র যজ্ঞের আয়োজন করেন। সেই যজ্ঞের অগ্নিকুণ্ড থেকে বরপ্রাপ্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করেন ধৃষ্টদ্যুম্ন, যার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল দ্রোণাচার্যকে বধ করা।

আচার্য দ্রোণ এই ধ্রুব সত্য ও ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন। তথাপি, যখন ধৃষ্টদ্যুম্ন ধনুর্বেদ ও অস্ত্রশিক্ষার উদ্দেশ্যে তাঁর আশ্রমে আগমন করেন, তখন পরম উদারচেতা ও সত্যনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ দ্রোণাচার্য কোনো প্রকার সংকীর্ণতা, দ্বিধা বা বৈরিতা প্রকাশ করেননি। তিনি নিজ হস্তেই ধৃষ্টদ্যুম্নকে সমস্ত দিব্যাস্ত্র এবং সামরিক কৌশল শিক্ষা দেন। সনাতন ঐতিহ্যে এটি গুরুর নিরাসক্ত কর্তব্যপালন, উদারতা ও পরম ব্রহ্মতেজের এক অনুপম নিদর্শন।

দুর্যোধনের শব্দচয়ন ও সূক্ষ্ম কূটকৌশল

রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে চতুর কূটনীতিবিদ দুর্যোধন আচার্য দ্রোণের এই উদারতাকেই তাঁর দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ চালান। তিনি দ্রোণাচার্যের অন্তরে শত্রুতার অগ্নি পুনরুজ্জীবিত করতে এবং পাণ্ডবদের প্রতি তাঁর স্বভাবজাত প্রীতিকে দমন করতে অত্যন্ত চতুরতার সহিত শব্দচয়ন করেন:

'আচার্য' সম্বোধন: দুর্যোধন স্মরণ করিয়ে দিতে চান যে, দ্রোণ কৌরব ও পাণ্ডব—উভয় পক্ষেরই সমভাবে গুরু। তাই ধর্মযুদ্ধে প্রিয় শিষ্যদের প্রতি তাঁর কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব করা অনুচিত।

'তব শিষ্যেন ধীমতা' (আপনার বুদ্ধিমান শিষ্য): দুর্যোধন ইঙ্গিত দেন যে, দ্রোণাচার্য সরল হৃদয়ে শত্রুপক্ষের সন্তানকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, আর সেই চতুর শিষ্য আজ দ্রোণেরই শেখানো বিদ্যায় গুরুকে বধ করার জন্য ব্যূহ রচনা করেছে।

'দ্রুপদপুত্রেণ' (দ্রুপদ-পুত্র): সেনাপতির নাম সরাসরি 'ধৃষ্টদ্যুম্ন' না বলে ইচ্ছাকৃতভাবে 'দ্রুপদপুত্র' বলে দুর্যোধন পুরনো শত্রুতার কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি বোঝাতে চান যে, পাণ্ডবরা যদি গুরুকে সত্যি শ্রদ্ধা করত, তবে দ্রোণের পরম শত্রুর পুত্রকে তাদের সেনাপতি পদে বরণ করত না।

পাণ্ডব বাহিনীর মহতী রূপ ও দুর্যোধনের শঙ্কা

কৌরবদের সৈন্যসংখ্যা ছিল এগারো অক্ষৌহিণী, যার বিপরীতে পাণ্ডবদের ছিল মাত্র সাত অক্ষৌহিণী (উল্লেখ্য, এক অক্ষৌহিণী সৈন্য বাহিনীতে ২১,৮৭০টি রথ, ২১,৮৭০টি হস্তী, ৬৫,৬১০টি অশ্ব এবং ১,০৯,৩৫০ জন পদাতিক সৈন্য থাকে)। গাণিতিক হিসাবে পাণ্ডব বাহিনী ক্ষুদ্র হলেও দুর্যোধনের চোখে তা 'মহতী চমূ' বা বিশাল সৈন্যবলেই প্রতীয়মান হচ্ছিল।

এর মূল কারণ ছিল পাণ্ডব বাহিনীর সুসংগঠিত সৈন্যব্যূহ, যোদ্ধাদের অটুট একতা এবং সর্বোপরি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাঁদের পরম ভক্তি। অধর্মের পক্ষে থাকা দুর্যোধনের অন্তরে যে ভয় ও সংশয় বিরাজ করছিল, তা-ই পাণ্ডবদের ক্ষুদ্র বাহিনীকে তাঁর চোখে পর্বতপ্রমাণ করে তুলেছিল। তাই তিনি "এতাম্ পশ্য" (এটি দেখুন) বলে আচার্যকে অনতিবিলম্বে কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পূর্ণ শক্তিতে যুদ্ধ করার অনুরোধ জানান।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই প্রারম্ভিক দৃশ্যটি কেবল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বিবরণ প্রদান করে না, বরং মানবচরিত্রের সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব, রাজনীতিবিদের কুটিল চাল এবং গুরুর মহতী নিরপেক্ষতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটায়। দুর্যোধনের বাক্যবাণ প্রমাণ করে যে, সংকটকালে অহেতুক মোহাচ্ছন্নতা বা কোমলতা অধর্মের হাতকেই শক্তিশালী করে। অন্যদিকে, দ্রোণাচার্যের চরিত্র স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত জ্ঞান ও ধর্ম উদর হৃদয়ে শত্রুকেও শিষ্যরূপে গ্রহণ করতে দ্বিধা করে না—যদিও তার পরিণাম হয় চরম আত্মত্যাগ।

বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে  বিরাট পর্ব ১১ ভাগে উদ্যোগপর্ব ৪৬ ভাগে  এবং ভীষ্মপর্ব দ্বিতীয় ভাগেসম্পন্ন করেছে।

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: প্রথম অধ্যায় -অর্জুনবিষাদযোগের আলোচনা। 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: প্রথম অধ্যায় (অর্জুনবিষাদযোগ) ২য় শ্লোক পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


 পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আমাদের গল্পগুলো নিয়মিত সবার আগে বিনামূল্যে পেতে এখনই নিচে সাবস্ক্রাইব করুন।


আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।





Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি