ভগবদ্গীতার প্রথম শ্লোক
মহাভারতের 'ভীষ্ম পর্বের' পঁচিশতম অধ্যায়ে এসে অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়কে প্রথম প্রশ্নটি করলেন, যা ভগবদ্গীতার প্রথম শ্লোক নামে পরিচিত:
धृतराष्ट्र उवाच ।
धर्मक्षेत्रे कुरुक्षेत्रे समवेता युयुत्सवः ।
मामकाः पाण्डवाश्चैव किमकुर्वत सञ्जय ॥
ধৃতরাষ্ট্র উবাচ।
"ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ। মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়" ॥ ১ ॥
ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করিলেন, "হে সঞ্জয়! ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধকামনায় সমবেত হইয়া আমার পুত্রগণ এবং পাণ্ডুর পুত্রগণ অতঃপর কী করিল?"
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পরম তত্ত্বজ্ঞানের এক অমৃতময় মহাসাগর, যাহার অপার মহিমা স্বয়ং ‘গীতা-মাহাত্ম্য’-এ বর্ণিত হইয়াছে। এই পরম শাস্ত্রের প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করিতে হইলে পরমেশ্বর ভগবানের তত্ত্বদর্শী একনিষ্ঠ ভক্তের শ্রীচরণাশ্রয়ে তত্ত্বজ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক। ব্যক্তিগত অহংকার বা মনগড়া দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা গীতার অর্থ বিশ্লেষণ করা ঘোর অপরাধ। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখপদ্ম হইতে অর্জুন যেভাবে সরাসরি এই গীতোপদেশ গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং যে শ্রদ্ধাসিক্ত মনোভাব লইয়া তাহা হৃদয়ে ধারণ করিয়াছিলেন, আমাদেরও ঠিক সেই নিবেদিত চিত্তে গীতা পাঠ করা উচিত। শ্রীগুরুপরম্পরার শুভ ধারায় ব্যাখ্যানুসারে যদি কেহ গীতার যথাযথ অর্থ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন, তবে তিনি সর্বপ্রকার বৈদিক জ্ঞান তথা নিখিল বিশ্বশাস্ত্রের মূল সত্য লাভ করেন। অন্যান্য শাস্ত্রে যাহা কিছু সৎজ্ঞান রহিয়াছে, তাহা গীতায় বিদ্যমান; তদুপরি গীতায় এমন এক পরম গুহ্যতত্ত্ব পরিবেশিত হইয়াছে, যা অন্য কোথাও লভ্য নহে। স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজ শ্রীমুখে এই পরমজ্ঞান প্রদান করিয়াছেন বলিয়াই গীতা সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্ররূপে বন্দিত।
শ্রীমহাভারতে বর্ণিত ধৃতরাষ্ট্র ও সঞ্জয়ের মধ্যকার পরম সুপবিত্র কথোপকথনই গীতার এই অমূল্য তত্ত্বদর্শনের মূল উপাদান। সুপ্রাচীন বৈদিক কাল হইতেই কুরুক্ষেত্র এক মহাপবিত্র তীর্থক্ষেত্ররূপে পূজিত। ভক্ত ও মানবজাতির উদ্ধারের নিমিত্ত পরমেশ্বর ভগবান যখন ধরাধামে অবতীর্ণ হন, তখন এই পুণ্যময় রণাঙ্গনেই তিনি এই পরম তত্ত্বজ্ঞান বিচ্ছুরিত করেন।
উক্ত শ্লোকে 'ধর্মক্ষেত্র' শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই কুরুক্ষেত্রেই ধর্মসংস্থাপক শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং পাণ্ডবদের পক্ষে অবস্থান করিতেছিলেন। পাপাচারী কৌরবদের পিতা ধৃতরাষ্ট্র নিজ পুত্রদের বিজয়ের সম্ভাবনা লইয়া সংশয়াকুল ছিলেন। তাই দ্বিধাগ্রস্ত হৃদয়ে তিনি সঞ্জয়কে জিজ্ঞাসা করেন, "আমার পুত্রেরা ও পাণ্ডুপুত্রেরা কুরুক্ষেত্রে সমবেত হইয়া কী করিল?" কুরুক্ষেত্র যে দেবতাদেরও পূজনীয় অতি সুপবিত্র স্থান, তাহা বেদাদিশাস্ত্রে সুবিদিত। ধৃতরাষ্ট্র আশঙ্কা করিয়াছিলেন যে, এই পবিত্র তীর্থের শুভ প্রভাব নিশ্চিতভাবেই ধর্মপরায়ণ পাণ্ডবদের উপর বর্ষিত হইবে। সঞ্জয় মহামতি ব্যাসদেবের কৃপায় দিব্যচক্ষু লাভ করিয়াছিলেন, যাহার প্রভাবে তিনি গৃহে বসিয়াই রণাঙ্গনের সমস্ত ঘটনা প্রত্যক্ষ করিতে সক্ষম হন।
পাণ্ডবগণ ও ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ একই বংশের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ধৃতরাষ্ট্রের বাক্যে অন্ধ পুত্রস্নেহ ও বিভেদের চরম প্রকাশ ঘটিয়াছে। তিনি কেবল নিজ পুত্রদিগকেই 'কৌরব' ভাবিয়া পাণ্ডুপুত্রদের ন্যায়সংগত অধিকার হইতে বঞ্চিত করিতে চাহিয়াছিলেন। ক্ষেত্রপতি যেমন শস্যক্ষেত্রের আগাছা নির্মূল করিয়া সৎশস্য রক্ষা করেন, তেমনই সাক্ষাৎ ধর্মস্বরূপ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণও এই কুরুক্ষেত্ররূপ ধর্মক্ষেত্রে অধর্মী ধৃতরাষ্ট্রপুত্রদের সমূলে উৎপাটিত করিয়া পরম ধার্মিক যুধিষ্ঠির ও পাণ্ডবগণের মাধ্যমে পুনঃধর্ম সংস্থাপনের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন।
অতএব, কেবল বৈদিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ হইতেই নহে, বরং সমগ্র গীতার পরম শাশ্বত দর্শনের নিরিখে 'ধর্মক্ষেত্রে' ও 'কুরুক্ষেত্রে'—এই শব্দদ্বয় পরম তাৎপর্যময় ও মাহাত্ম্যপূর্ণ।
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে বিরাট পর্ব ১১ ভাগে উদ্যোগপর্ব ৪৬ ভাগে এবং ভীষ্মপর্ব দ্বিতীয় ভাগেসম্পন্ন করেছে।
শ্রীমদভগবদ্গীতা: (ভূমিকা) পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের শ্রীমদভগবদ্গীতার আলোচনা।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আমাদের গল্পগুলো নিয়মিত সবার আগে বিনামূল্যে পেতে এখনই নিচে সাবস্ক্রাইব করুন।
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment