৪২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুক্ষেত্রের রক্তসংকেত


৪২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব কুরুক্ষেত্রের রক্তসংকেত

হিরণ্যবতী নদীর ঘাটে তখন সন্ধ্যার বাতাস ভারী হয়ে নেমেছে। একপাশে মহাত্মা পাণ্ডবদের শিবির, অন্যপাশে নিয়ম মেনে সাজানো কৌরবদের সেনাক্যাম্প। যুদ্ধের রণদামামা বাজার ঠিক আগের মুহূর্তে রাজমহলের রাজনীতি কতটা কটু, কতটা বিষাক্ত হতে পারে—তা প্রমাণ করতেই যেন কৌরবপতি দুর্যোধন তাঁর অনুচর উলুককে ডেকে পাঠালেন। কর্ণ, শকুনি আর দুঃশাসনের সঙ্গে নিভৃত পরামর্শের পর দুর্যোধনের মুখে ফুটল এক হিংস্র হাসি। তিনি উলুককে বললেন, “যাও পাণ্ডবদের শিবিরে। শ্রীকৃষ্ণের সামনে দাঁড়িয়ে অর্জুনকে আমার বার্তা শোনাও। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে বোলো—তিনি তো বড় ধার্মিক, তবে আজ কেন এই অধর্মের পথ? তাঁর এই ধর্ম আসলে এক বিড়াল-তপস্বীর ছদ্মবেশ ছাড়া কিছু নয়!”

হিরণ্যবতী নদীর ঘাটে তখন সন্ধ্যার বাতাস ভারী হয়ে নেমেছে। একপাশে মহাত্মা পাণ্ডবদের শিবির, অন্যপাশে নিয়ম মেনে সাজানো কৌরবদের সেনাক্যাম্প। যুদ্ধের রণদামামা বাজার ঠিক আগের মুহূর্তে রাজমহলের রাজনীতি কতটা কটু, কতটা বিষাক্ত হতে পারে—তা প্রমাণ করতেই যেন কৌরবপতি দুর্যোধন তাঁর অনুচর উলুককে ডেকে পাঠালেন। কর্ণ, শকুনি আর দুঃশাসনের সঙ্গে নিভৃত পরামর্শের পর দুর্যোধনের মুখে ফুটল এক হিংস্র হাসি। তিনি উলুককে বললেন, “যাও পাণ্ডবদের শিবিরে। শ্রীকৃষ্ণের সামনে দাঁড়িয়ে অর্জুনকে আমার বার্তা শোনাও। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে বোলো—তিনি তো বড় ধার্মিক, তবে আজ কেন এই অধর্মের পথ? তাঁর এই ধর্ম আসলে এক বিড়াল-তপস্বীর ছদ্মবেশ ছাড়া কিছু নয়!” দুর্যোধনের নির্দেশে উলুক পাণ্ডবদের পূর্ণসভায় দাঁড়িয়ে একে একে কটুভাষণে বিষ ঢালতে লাগলেন। তিনি বিড়াল ও ইঁদুরের সেই পুরনো গল্প মনে করিয়ে দিয়ে বললেন, “গঙ্গাতীরে এক বিড়াল যেমন তপস্যার সং সেজে ইঁদুরদের বিশ্বাস অর্জন করেছিল আর তারপর প্রতিদিন একটা করে ইঁদুর খেয়ে মোটা হয়েছিল, যুধিষ্ঠিরও ঠিক তেমনই! মুখে শান্তির কথা, আর ভেতরে রাজ্যাভিলাষ। এই শান্তির সং ছেড়ে এবার ক্ষাত্রধর্মের মুখোমুখি হও!” শুধু যুধিষ্ঠির নন, উলুকের মুখে দুর্যোধনের স্পর্ধা পৌঁছে গেল সবার কাছে— শ্রীকৃষ্ণকে: “তুমি মায়াজাল আর কায়দা দেখিয়ে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের ভয় দেখাতে চাও? জেনে রেখো, কংসের সেবকের সঙ্গে যুদ্ধ করাই আমার মতো রাজার অপমান। আজ অর্জুনের রথ চালিয়েই তোমার দিন কাটবে।” ভীমকে: “হে অর্বাচীন ভীম, দুঃশাসনের রক্ত পান করার যে দর্প করেছিলে, ক্ষমতা থাকলে আজ তা করে দেখাও।” অর্জুনকে: “যখন দ্যূতসভায় দাসত্বের পণ ধরে হেরেছিলে, তখন তোমার গাণ্ডীব কোথায় ছিল? কৃষ্ণের ভরসায় লাফিয়ো না। যুদ্ধের ময়দানে আমার বাণ যখন ছুটবে, তখন শত শত কৃষ্ণ আর অর্জুন প্রাণভয়ে দশদিকে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালাবে।” সভায় তখন এক থমথমে নীরবতা। পাণ্ডব শিবিরের রক্তে যেন আগুন ধরে গেল। ভীমসেন রাগে দন্তঘর্ষণ করে গর্জে উঠলেন, “ওরে মূর্খ! ধর্মরাজের সত্যরক্ষার জন্য আমরা এতকাল তোদের সব অন্যায় সহ্য করেছি। কিন্তু তোদের শিয়রে আজ কালনৃত্য করছে! কুরুক্ষেত্রের মাটিতে আমি দুঃশাসনের রক্ত পান করবই—স্বয়ং যম, কুবের বা রুদ্রও তোদের রক্ষা করতে পারবে না!” সহদেব উলুককে সতর্ক করে বললেন, “পাপী শকুনিকে গিয়ে বোলো, এই কুরুবংশ ধ্বংসের জন্য সেই দায়ী। যুদ্ধে আমি আগে উলুক, তোকে সংহার করব, তারপর তোর বাপের প্রাণ নেব!” তবে ধনঞ্জয় অর্জুন সহাস্যে পরিস্থিতি সামলে নিলেন। ভীমকে শান্ত করে তিনি বললেন, “দাদা, দূত তো শুধু বার্তা বয়ে এনেছে, তার ওপর রাগ করে লাভ কী? উলুক, তোমার রাজাকে গিয়ে বোলো—কাল ভোরেই গাণ্ডীবের ভাষা সে শুনতে পাবে। পিতামহ ভীষ্মকে সামনে রেখেই আমি কৌরবদের বিনাশ শুরু করব।” শ্রীকৃষ্ণ শান্ত কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন, “কাল সকালেই যুদ্ধের ময়দানে আমাদের দেখা হবে। আগুন যেমন শুকনো খড় জ্বালিয়ে ছাই করে, তেমনই কৌরবদের অহংকার এই রণক্ষেত্রে ভস্ম হয়ে যাবে।” সবশেষে রাজা যুধিষ্ঠির এক বিষণ্ণ অথচ কঠোর স্বরে বললেন, “আমি একটি কীট-পতঙ্গকেও কষ্ট দিতে চাইনি, তাই কেবল পাঁচটি গ্রাম চেয়েছিলাম। কিন্তু তোদের মন লোভে অন্ধ। উলুক, তুমি ফিরে গিয়ে দুর্যোধনকে বোলো, নিজের পরাক্রমের ওপর ভরসা না করে যারা অন্যের আশ্রয়ে যুদ্ধ করে, তারা নপুংসক। কাল সকালেই ক্ষাত্রধর্মের হিসাব হবে।” উলুক কৌরব শিবিরে ফিরে গিয়ে পাণ্ডবদের এই কঠোর সংকল্প ও প্রত্যুত্তরের কথা ব্যক্ত করলে দুর্যোধনের অহংকারে আঘাত লাগল। তিনি তৎক্ষণাৎ সূর্যোদয়ের আগেই সেনা সাজানোর নির্দেশ দিলেন। অন্যদিকে, পাণ্ডব সেনাপতি ধৃষ্টদ্যুম্নও বীরদের দায়িত্ব ভাগ করে দিলেন—অর্জুনের মুখে কর্ণ, ভীমের মুখে দুর্যোধন, শিখণ্ডীর সামনে ভীষ্ম এবং দ্রোণাচার্যের মুখোমুখি নিজে ধৃষ্টদ্যুম্ন। কুরুক্ষেত্রের প্রান্তর জুড়ে তখন এক মহাবিনাশের প্রহর গোনা শুরু হলো।

বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে। 

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ৪২তম ভাগের আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।

উদ্যোগপর্বের ৪১তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

 পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

Continue Reading

Fill the form to unlock the full content

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)