৪০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রণক্ষেত্রের আগুন ও কৃষ্ণের চাল: কুরুক্ষেত্রে সর্বাধিনায়ক নির্বাচনের রোমাঞ্চকর লড়াই
৪০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রণক্ষেত্রের আগুন ও কৃষ্ণের চাল: কুরুক্ষেত্রে সর্বাধিনায়ক নির্বাচনের রোমাঞ্চকর লড়াই
কুরুক্ষেত্রের ধূসর প্রান্তর তখন অগ্নিগর্ভ। শান্তির শেষ বার্তা নিয়ে কৃষ্ণ ফিরে আসার পরেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল—শব্দ আর কূটনীতির দিন শেষ, এবার কথা বলবে অস্ত্র। পাণ্ডব আর কৌরব—দুই শিবিরেই শুরু হলো এক মহাঝড়ের প্রস্তুতি।
হস্তিনাপুরের রাজসভা থেকে ফিরে শ্রীকৃষ্ণ যখন পাণ্ডব শিবিরে সব খুলে বললেন, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেননি। ভাইদের ডেকে বললেন, "যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখন আমাদের সাত অক্ষৌহিণী সৈন্যকে সুসংগঠিত করো। দ্রুপদ, বিরাট, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, সাত্যকি, চেকিতান আর ভীমসেন—এই সাতজন আমাদের সেনাধ্যক্ষ। কিন্তু এই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কে হবেন? ভীষ্মরূপ অগ্নির সামনে দাঁড়ানোর সাহস কার আছে?"
পাণ্ডব ভাইদের মধ্যে সেনাপতি নির্বাচন নিয়ে মতভেদ দেখা দিল। কনিষ্ঠ সহদেব প্রস্তাব দিলেন মৎস্যরাজ বিরাটের নাম। নকুল বেছে নিলেন প্রবীণ ও শাস্ত্রজ্ঞ রাজা দ্রুপদকে। কিন্তু অর্জুন অন্য পথ হাঁটলেন। তিনি বললেন, "যিনি ধনুক ও কবচ নিয়ে অগ্নিকুণ্ড থেকে জন্মেছেন, সেই ধৃষ্টদ্যুম্নই একমাত্র ভীষ্মের সামনে দাঁড়াতে পারেন।" আবার ভীমের মত ছিল আলাদা—ভীষ্মবধের উদ্দেশ্যে যার জন্ম, সেই শিখণ্ডীকেই তিনি সেনাপতি দেখতে চাইলেন।
বিতর্ক যখন তুঙ্গে, তখন যুধিষ্ঠির শেষ কথাটি বললেন। তাঁর চোখ তখন শ্রীকৃষ্ণের ওপর। "আমাদের জয় বা পরাজয়, জীবন বা মৃত্যু—সবই কৃষ্ণের হাতে। ইনি যাকে বলবেন, তিনিই হবেন সেনাপতি।"
কমলনয়ন কৃষ্ণ মৃদু হেসে অর্জুনের দিকে তাকালেন। বললেন, "পাণ্ডবদের সকল বীরই যোগ্য। কিন্তু এই মহাযুদ্ধের চাবিকাঠি হওয়া উচিত ধৃষ্টদ্যুম্নের হাতে।"
কৃষ্ণের সিদ্ধান্ত শোনামাত্র পাণ্ডব শিবিরে আনন্দের জোয়ার ভেসে গেল। শঙ্খ ও বাদ্যের বিকট শব্দে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল। শুরু হলো কুরুক্ষেত্রের দিকে মহাসমর যাত্রা। ভীম, নকুল, সহদেব, অভিমন্যু এবং দ্রৌপদীর পুত্রদের অগ্রভাগে রেখে পাণ্ডবদের বিশাল বাহিনী মণিখচিত রথে চেপে এগিয়ে চলল। ধন-সম্পদ ও নারীদের নিরাপত্তার দায়িত্বে রেখে, দ্রৌপদীকে উপপ্লব্য শিবিরে পাঠিয় দেওয়া হলো। আর রাজাদের বিশাল বাহিনী—কেকয় রাজকুমার, ধৃষ্টকেতু, কাশীরাজপুত্র অভিভূ ও সাত্যকিদের সাথে নিয়ে যুধিষ্ঠির কুরুক্ষেত্রের এক পবিত্র, সমতল ভূমিতে এসে শিবির ফেললেন। সেখানে পৌঁছেই কৃষ্ণ ও অর্জুন তাঁদের পাঞ্চজন্য শঙ্খ বাজিয়ে যুদ্ধের হুঙ্কার দিলেন।
অন্যদিকে, দুর্যোধনের শিবির তখনও শঙ্কা আর আক্রোশে উত্তাল। কৃষ্ণ ফিরে যাওয়ার খবর পেয়ে দুর্যোধন তাঁর সঙ্গীদের—কর্ণ, দুঃশাসন ও শকুনিকে ডেকে বললেন, "যুদ্ধ এবার অনিবার্য। পাণ্ডবরা তৈরি হচ্ছে, আমাদেরও এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করা চলবে না।"
পরদিনই দুর্যোধন তাঁর এগারো অক্ষৌহিণী সৈন্যকে সাজিয়ে ফেললেন। রথ, হাতি, ঘোড়া আর পদাতিকদের সুবিন্যস্ত করা হলো। রথের সঙ্গে হাজার হাজার বাণ, চালক ও চক্ররক্ষক; আর একেকটি রণমত্ত হাতির পিঠে সাতজন করে সশস্ত্র যোদ্ধা—মহাসজ্জায় সজ্জিত হলো কৌরব বাহিনী। কৃপাচার্য, দ্রোণাচার্য, শল্য, জয়দ্রথ, অশ্বত্থামা ও কর্ণের মতো এগারোজন মহারথীকে এগারোটি বাহিনীর দায়িত্বে দেওয়া হলো।
কিন্তু সর্বাধিনায়ক কে হবেন? দুর্যোধন জোড়হাতে গিয়ে দাঁড়ালেন পিতামহ ভীষ্মের সামনে। বললেন, "পিতামহ, সেনাপতি ছাড়া সৈন্যবাহিনী কেবলি এক দিশাহীন তরঙ্গ। আপনি আমাদের সেনাপতি হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করুন।"
ভীষ্ম গম্ভীর মুখে উত্তর দিলেন, "দুর্যোধন, আমার কাছে তোমরাও যেমন, পাণ্ডবরাও তেমন। আমি প্রতিদিন পাণ্ডবপক্ষের দশ হাজার যোদ্ধা সংহার করব, কিন্তু পাণ্ডুপুত্রদের হত্যা করব না। আর আমার এক শর্ত—যতদিন আমি যুদ্ধে সেনাপতি থাকব, ততদিন সূতপুত্র কর্ণ আমার সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে পারবে না।"
অহংকারী কর্ণও সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিলেন, "ভীষ্ম জীবিত থাকতে আমি ধনুর্ধারণ করব না। তাঁর পতনের পরই আমার অস্ত্র কথা বলবে।"
শর্ত মেনেই দুর্যোধন শাস্ত্রীয় মতে ভীষ্মকে সেনাপতি পদে বরণ করলেন। কিন্তু সেই অভিষেকের মুহূর্তে আকাশে-বাতাসে ফুটে উঠল একাধিক অশুভ লক্ষণ। তা সত্ত্বেও, উদগ্র কামনায় কৌরব বাহিনী পিতামহকে সামনে রেখে কুরুক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে মুখোমুখি এসে দাঁড়াল দুই মহাবলশালী শিবির। একদিকে পাণ্ডবদের সাত অক্ষৌহিণী, অন্যদিকে কৌরবদের এগারো অক্ষৌহিণী। বাতাসে শুধুই শঙ্খধ্বনি আর মৃত্যুর গন্ধ। ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য মঞ্চ এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের
৪০তম ভাগের আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ৩৯তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আমাদের গল্পগুলো নিয়মিত সবার আগে বিনামূল্যে পেতে এখনই নিচে সাবস্ক্রাইব করুন।
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment