৪৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুক্ষেত্রের মহাসমরে রথী-মহারথীর বিচার: ভীষ্ম, কর্ণ ও দুর্যোধনের দ্বন্দ্ব
৪৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুক্ষেত্রের মহাসমরে রথী-মহারথীর বিচার: ভীষ্ম, কর্ণ ও দুর্যোধনের দ্বন্দ্ব
মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সূচনাপর্বে এক উৎকণ্ঠাপূর্ণ মুহূর্তে রাজা ধৃতরাষ্ট্র তাঁর সঞ্জয়কে জিজ্ঞাসা করলেন, "অর্জুন যখন রণভূমিতে পিতামহ ভীষ্মকে বধের প্রতিজ্ঞা নিয়েছে, তখন আমার পুত্র দুর্যোধন কী সিদ্ধান্ত নিল? তাছাড়া সেনাপতি পদ গ্রহণ করে মহাপরাক্রমী ভীষ্মই বা কী করলেন?" সঞ্জয় তখন ধৃতরাষ্ট্রকে সেনাপতি ভীষ্ম ও দুর্যোধনের মধ্যকার আলোচনার বিবরণ দিতে শুরু করলেন। .
মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সূচনাপর্বে এক উৎকণ্ঠাপূর্ণ মুহূর্তে রাজা ধৃতরাষ্ট্র তাঁর সঞ্জয়কে জিজ্ঞাসা করলেন, "অর্জুন যখন রণভূমিতে পিতামহ ভীষ্মকে বধের প্রতিজ্ঞা নিয়েছে, তখন আমার পুত্র দুর্যোধন কী সিদ্ধান্ত নিল? তাছাড়া সেনাপতি পদ গ্রহণ করে মহাপরাক্রমী ভীষ্মই বা কী করলেন?" সঞ্জয় তখন ধৃতরাষ্ট্রকে সেনাপতি ভীষ্ম ও দুর্যোধনের মধ্যকার আলোচনার বিবরণ দিতে শুরু করলেন। সেনাধ্যক্ষের পদ গ্রহণ করে শান্তনুনন্দন ভীষ্ম ভগবান স্বামিকার্তিককে প্রণাম জানিয়ে দুর্যোধনকে আশ্বস্ত করলেন। তিনি বললেন যে ব্যূহরচনায় তিনি সিদ্ধহস্ত এবং সম্পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। এতে আশ্বস্ত হয়ে দুর্যোধন পিতামহ ভীষ্মের কাছে কৌরব ও পাণ্ডব পক্ষের প্রধান বীর, রথী ও মহারথীদের যোগ্যতার একটি স্পষ্ট বিবরণ জানতে চাইলেন।
ভীষ্ম কৌরব পক্ষের প্রধান যোদ্ধাদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে দুঃশাসনসহ একশত ভাই, সেনাপতি স্বয়ং ভীষ্ম, কৃতবর্মা, ভূরিশ্রবা, জয়দ্রথ, সুদক্ষিণ, রাজা নীল, বিন্দ-অনুবিন্দ, ত্রিগর্তের পাঁচ ভাই, লক্ষ্মণ, দণ্ডধার, বৃহদ্বল, কৃপাচার্য, শকুনি, অশ্বত্থামা, দ্রোণাচার্য, রাজা পৌরব, জরাসন্ধ, বাহ্লীক, সত্যবান, অলম্বুষ এবং গান্ধার বীর অচল ও বৃষকের সামরিক দক্ষতার প্রশংসা করলেন। দ্রোণাচার্য সম্পর্কে ভীষ্ম স্মরণ করিয়ে দিলেন যে আচার্য দ্রোণ অর্জুনকে নিজ পুত্রের চেয়েও বেশি স্নেহ করেন, তাই যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি অর্জুনের ওপর কোমল মনোভাব বজায় রাখতে পারেন। তবে কৌরব পক্ষের অন্যতম প্রধান বীর কর্ণের বিচারে এসে ভীষ্মের সুর বদলে গেল। কর্ণকে অত্যন্ত অহংকারী, বাচাল ও নীচপ্রকৃতির আখ্যা দিয়ে ভীষ্ম স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন—কর্ণ রথী বা মহারথী তো নয়ই, সে কেবল এক 'অর্ধরথী'। অর্জুনের সামনে পড়লে সে জীবিত ফিরতে পারবে না। আচার্য দ্রোণও ভীষ্মের এই বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে বললেন, প্রতিটি যুদ্ধেই কর্ণকে দম্ভ প্রকাশ করতে এবং পরবর্তীতে রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসতে দেখা গেছে, সুতরাং সে অর্ধরথীই বটে। ভীষ্ম ও দ্রোণের এই চরম অপমানজনক মন্তব্যে কর্ণ ক্রোধে ফেটে পড়লেন। তিনি ভীষ্মের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে দুর্যোধনকে বললেন যে বয়সের ভারে ভীষ্মের বুদ্ধিভ্রংশ ঘটেছে। অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে কর্ণ প্রতিজ্ঞা করলেন—"যতদিন পিতামহ ভীষ্ম জীবিত থাকবেন এবং সেনাপতির দায়িত্বে থাকবেন, ততদিন আমি এই যুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করব না। তাঁর পতনের পরই আমি নিজের বীরত্ব দিয়ে পাণ্ডবদের বিনাশ করে দেখাব।" কর্ণের এই বাক্যাণে ভীষ্মও পাল্টা কড়া জবাব দিলেন। তিনি তাঁর অতীত বীরত্বের কথা, বিশেষ করে কাশীরাজের স্বয়ংবর সভায় হাজারো রাজাকে একাকী পরাজিত করার কথা মনে করিয়ে দিয়ে কর্ণকে স্তব্ধ করে দিলেন। যুদ্ধের প্রাক্কালে কৌরব শিবিরের এই অন্তর্বিদ্রোহ ও বাকযুদ্ধে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে রাজা দুর্যোধন এগিয়ে এলেন। তিনি দুই পক্ষের বিবাদ থামিয়ে পিতামহ ভীষ্মকে অনুরোধ করলেন কৌরবদের হিতের দিকে নজর দিতে এবং প্রতিপক্ষ পাণ্ডব শিবিরের রথী ও মহারথীদের সামরিক শক্তির বিবরণ প্রকাশ করতে, কারণ পরদিন প্রভাতেই শুরু হতে যাচ্ছিল কুরুক্ষেত্রের সেই মহামারী যুদ্ধ।
Continue Reading
Fill the form to unlock the full content

Comments
Post a Comment