৩৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অগ্নিগর্ভা কুন্তী ও কুরুক্ষেত্রের রণভেরী
৩৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অগ্নিগর্ভা কুন্তী ও কুরুক্ষেত্রের রণভেরী
উপপ্লব্যের আকাশে তখন বিকেলের কনে-দেখা আলোটুকু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। কৌরব রাজসভার উত্তপ্ত জলহাওয়া পেছনে ফেলে কুন্তীর জীর্ণ কুটিরে যখন কৃষ্ণ প্রবেশ করলেন, তখন তাঁর মুখে এক গভীর প্রশান্তির আস্তরণ। কিন্তু সেই প্রশান্তির ভেতরে লুকিয়ে ছিল আগামী এক মহাযুদ্ধের স্পষ্ট পূর্বাভাস। ধীর পায়ে কৃষ্ণের আগমন দেখে কুন্তী তাঁর দিকে ফিরে তাকালেন। কৃষ্ণের চোখের ভাষাই বলে দিচ্ছিল, হস্তিনাপুরের রাজসভায় কী ঘটেছে।
কৃষ্ণের মাথা নত করে কৃষ্ণের দুটি হাত কুন্তীর চরণে স্পর্শ করল। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৃষ্ণ বললেন, "পিসিমা, আমি আর রাজসভার প্রবীণ ঋষিগণ অনেক চেষ্টা করেছি। যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে দুর্যোধনকে বোঝাতে চেয়েছি, শান্তির পথই যে কল্যাণের পথ—তা সুস্পষ্ট করে দিয়েছি। কিন্তু অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র অন্ধতর অহংকারে মত্ত। সে কোনো কথা শোনেনি, একবিন্দু জমিও ছাড়তে রাজি নয়। আমি এখন আপনার কাছ থেকে বিদায় নিতে এসেছি পিসিমা, আমাকে শীঘ্রই উপপ্লব্যে পাণ্ডবদের কাছে পৌঁছাতে হবে। বলুন, পাঁচ ভাইয়ের জন্য আপনার কী বার্তা নিয়ে যাব?"
কুন্তীর চোখে তখন কোনো অশ্রু ছিল না; সেখানে জ্বলছিল এক আত্মসংযমী ক্ষাত্রতেজ। মৃদু কিন্তু ইস্পাতের মতো কঠোর স্বরে কুন্তী বললেন, "কেশব! যুধিষ্ঠিরকে আমার হয়ে বলো—তার পরম ধর্ম হলো পৃথিবী পালন করা। কিন্তু সে যে অনর্থক ক্ষমার নীতি আঁকড়ে ধরে আছে, তাতে ক্ষত্রিয়ধর্মের চরম ক্ষতি হচ্ছে। পিতামহ ব্রহ্মা তাঁর বাহু থেকে ক্ষত্রিয়দের সৃষ্টি করেছেন; সুতরাং বাহুবলই তাদের একমাত্র জীবিকা ও স্বধর্ম। প্রাচীনকালে রাজা মুচকুন্দকে কুবের বিনা যুদ্ধে সমগ্র পৃথিবী উপহার দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মুচকুন্দ তা গ্রহণ করেননি। তিনি নিজের বাহুবলে রাজ্য জয় করে প্রজাপালন করেছিলেন। প্রজা যখন রাজার সুরক্ষায় সুখে ধর্মাচরণ করে, সেই ধর্মের এক-চতুর্থাংশ পান রাজা নিজে। কিন্তু রাজা যদি অধর্মে মন দেন, দণ্ডনীতি প্রয়োগে শিথিলতা দেখান, তবে তাঁকে নরকগামী হতে হয়। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর কিংবা কলি—যুগের স্রষ্টা আসলে রাজারা নিজেই।"
একটু থেমে, কৃষ্ণের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে কুন্তী আবার বলতে লাগলেন, "যুধিষ্ঠির আজ যে শান্তিকামী সিদ্ধান্ত নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাইছে, তা তার পিতা পাণ্ডু চায়নি, আমি চাইনি, এমনকি তার পিতামহও কখনো কামনা করেননি। আমি সর্বদা আমার ছেলেদের তেজ, বল, শৌর্য আর মহত্ত্বই কামনা করে এসেছি। ভিক্ষাবৃত্তি বা কৃষিকাজ ক্ষত্রিয় সন্তানের কাজ নয়। সাম, দান, দণ্ড বা ভেদ—যে নীতিতেই হোক, শত্রুর দখলে থাকা পৈতৃক রাজ্য উদ্ধার করাই বীরের কাজ। আমার মতো মা বেঁচে থাকতে আর তোদের মতো পরাক্রান্ত পুত্ররা থাকতে আমাকে অন্যের আশ্রয়ে কাটাতে হবে, এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কী হতে পারে? তাই যুধিষ্ঠিরকে গিয়ে বলো—ক্ষাত্রধর্ম মেনে সে যেন যুদ্ধের জন্যই প্রস্তুত হয়।"
কুন্তীর কণ্ঠে তখন যেন এক প্রাচীন ইতিহাসের অনুরণন বেজে উঠল। তিনি কৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "কৃষ্ণ, এই প্রসঙ্গে তোমাকে বিদুলা ও তাঁর পুত্রের এক পুরাবৃত্ত শোনাই। রাজসভায় সুখ্যাত, শাস্ত্রজ্ঞ ও তেজস্বিনী ক্ষত্রিয়াণী ছিলেন বিদুলা। একবার সিন্ধুরাজের হাতে পরাস্ত হয়ে তাঁর পুত্র চরম হতাশায় ভেঙে পড়ে ঘরে বসে ছিল। বিদুলা তাঁর সেই নিস্তেজ পুত্রকে দেখে বিন্দুমাত্র দয়া না দেখিয়ে তীব্র ধিক্কার দিয়ে বলেছিলেন—‘ওরে কাপুরুষ! তুই আমার পুত্র হতে পারিস না, তুই শত্রুর আনন্দবর্ধনকারী এক নামমাত্র পুরুষ। তরোয়াল তুলে নে, বাজপাখির মতো শত্রুসেনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়। যে পুরুষ শত্রুর সামনে নতিস্বীকার করে বেঁচে থাকে, সে মায়ের বিষ্ঠাস্বরূপ। যে বিদ্যায়, তপে, ঐশ্বর্যে বা পরাক্রমে সমাজকে স্তব্ধ করে না দিতে পারল, তার জীবন বৃথা। আমার গর্ভে কি তবে এক কলিযুগ জন্ম নিল?’"
কুন্তী বলতে থাকেন, মাতা বিদুলার সেই অগ্নিবর্ষী বাণী শুনে পুত্র সঞ্জয় ব্যথিত হয়ে বলেছিল, ‘মা, তুমি বড় নিষ্ঠুর! আমি তোমার একমাত্র পুত্র, আমি যুদ্ধে নিহত হলে এই রাজ্য, অলংকার বা ভোগবিলাসে তোমার কী সুখ হবে?’ কিন্তু বিদুলা বিন্দুমাত্র না গলে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘পুত্র! যে অবিনয়ী, শত্রু আক্রমণ করতে ভয় পায়, তাকে পুত্র বলে মনে করা ব্যর্থ। দণ্ডই রাজধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ অঙ্গ। তুই যুদ্ধে জয়ী হয়ে শত্রু বিনাশ কর, তবেই তোকে আমি কুপুত্র না ভেবে সুপুত্র বলে আলিঙ্গন করব। অর্থ নেই বলে পিছিয়ে যাস না; বুদ্ধিমান পুরুষরা শূন্য হাতেই পুরুষার্থের জোরে রাজ্য উদ্ধার করে। প্রাতঃকালে উঠে সুহৃদ ও সেনাদের সাথে প্রিয় কথা বল, তাদের আস্থা অর্জন কর, তবেই জয় নিশ্চিত হবে।’ মায়ের সেই অগ্নিবাণে বিদ্ধ হয়ে মত্ত হাতির মতো জেগে উঠেছিল সঞ্জয়। সে পুনরায় যুদ্ধ করে হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধার করেছিল।"
কুন্তী দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৃষ্ণকে বললেন, "কেশব, পঞ্চপান্ডবদের রাজত্ব হারানো বা বারো বছর বনে কাটানোতে আমার ততটা কষ্ট হয়নি, যতটা কষ্ট হয়েছিল যেদিন আমার যুবতী পুত্রবধূ দ্রৌপদীকে ভরা রাজসভায় চুল টেনে এনে কৌরবরা অপমান করেছিল। ভীম আর অর্জুনের মহাবল থাকতে দ্রৌপদীর সেই কান্না—আজও আমার বুকে তপ্ত শেলের মতো বাঁধে। তুমি অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে দিও, তার জন্মের সময় আকাশবাণী হয়েছিল যে সে ইন্দ্রের মতো পরাক্রান্ত হবে এবং কৌরবদের বিনাশ করে পঞ্চপাণ্ডবকে তিন অশ্বমেধ যজ্ঞের অধিকারী করবে। আজ সেই সময় এসেছে! ভীম ও অর্জুনকে বলো, ক্ষত্রিয়াণী মা যে উদ্দেশ্যে সন্তান জন্ম দেয়, সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। নকুল ও সহদেবকে বলো, শরীর পাত করে বীরত্ব দেখাক। আর দ্রৌপদীকে আমার ভালোবাসা ও আশীর্বাদ জানিয়ে বলো—সে মহৎ কুলের সুযোগ্য কন্যা, তার অপমান নিষ্ফল যাবে না।"
কৃষ্ণের ঠোঁটে ফুটে উঠল এক মৃদু, রহস্যময় হাসি। তিনি কুন্তীর চরণে মাথা রেখে প্রণাম করলেন, তারপর কুটির থেকে বেরিয়ে এলেন। বাইরে অপেক্ষা করছিলেন কৌরব সভার প্রবীণরা—ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর। তাঁদের কাছ থেকে নীরবে বিদায় নিয়ে কৃষ্ণ সাত্যকিকে নিয়ে রথে চড়ে বসলেন।
পবনবেগে ধাবিত হলো কৃষ্ণের রথ। চাকার ধুলো উড়তে লাগল হস্তিনাপুরের পথে। কৃষ্ণ জানতেন, হস্তিনাপুরে তিনি শান্তির বার্তা দিতে এসেছিলেন সত্য, কিন্তু ফিরে যাচ্ছেন যুদ্ধের অলিখিত পরোয়ানা হাতে নিয়ে—যা কুরুক্ষেত্রের ধূলিস্যাৎ প্রান্তরে মহাকালের নতুন ইতিহাস লিখতে চলেছে।
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ৩৬তম ভাগের আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ৩৫তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment