প্রথম ভাগ মহাভারতের ভীষ্মপর্ব-শরশয্যায় মহাকাল: কুরুলীলার রক্তসন্ধ্যা
প্রথম ভাগ মহাভারতের ভীষ্মপর্ব-শরশয্যায় মহাকাল: কুরুলীলার রক্তসন্ধ্যা
মহাভারতের যুদ্ধ শুধুই অস্ত্রবিক্ষোভের কাহিনি নয়, তা এক চিরন্তন মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি। কুরুক্ষেত্রের প্রান্তর যখন রণদুন্দুভির আশঙ্কায় থমথম করছে, তখন একদিকে পাণ্ডব শিবিরের বিপুল আয়োজন, অন্যদিকে কৌরব পক্ষের ব্যূহ রচনা—সব মিলিয়ে সমগ্র আর্যাবর্ত যেন এক রক্তক্ষয়ী ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল।
যুধিষ্ঠির সমন্তপঞ্চক তীর্থের প্রান্তরে বিশাল সৈন্য সমাবেশ ঘটালেন। সেই বিপুল সৈন্যের পদভারে ধরাতল কেঁপে উঠল; কুরুক্ষেত্র ব্যতীত সমগ্র পৃথিবী যেন এক নিমেষে জনশূন্য, শুধু বৃদ্ধ, শিশু ও নারীরাই স্বগৃহে রয়ে গেল। পৃথিবীর সর্বপ্রান্ত থেকে আসা বীরদের জন্য খাদ্যের সুব্যবস্থা করে, পোশাক ও সংকেত নির্দিষ্ট করে যুধিষ্ঠির যুদ্ধের শৃঙ্খলা রক্ষা করলেন।
যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে ধর্ম ও মানবিকতার মর্যাদা রক্ষার্থে উভয় পক্ষ এক ঐতিহাসিক নিয়মাবলীতে আবদ্ধ হয়েছিল। স্থির হলো—দিনের শেষে যুদ্ধ থামলে সকলে আবার পূর্বের ন্যায় মিত্রভাবে মিলিত হবে; বাকযুদ্ধ কেবল বাকযুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকবে; রথী লড়বেন রথীর সঙ্গে, পদাতিক পদাতিকের সঙ্গে; আর শরণাগত, অস্ত্রহীন, ভীত কিংবা রণবাদ্যবাদকদের ওপর কোনো আঘাত হানা যাবে না। কিন্তু এই সমস্ত ধর্মনীতির অন্তরালে লুকিয়ে ছিল অনিবার্য বিনাশের নিষ্ঠুর বার্তা।
মহর্ষি ব্যাসদেব অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রকে দিব্যদৃষ্টি দিতে চাইলে, আত্মীয়ক্ষয়ের সেই ভয়াবহ দৃশ্য নিজ চোখে দেখতে অস্বীকার করেন ধৃতরাষ্ট্র। তখন ব্যাসদেব সঞ্জয়কে দেন সেই অলৌকিক দৃষ্টি, যার সাহায্যে দূর রণক্ষেত্রের প্রতিটি সূক্ষ্ম ঘটনা, এমনকি মনোগত ভাবও ধৃতরাষ্ট্রের গোচরে আসবে। ব্যাসদেব স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, "এ দৈবেরই বিধান, যেখানে ধর্ম, সেখানেই জয়।" প্রাক-যুদ্ধের আকাশে তখন বিদ্যুৎ চমক আর রক্তাভ মেঘের অশুভ সংকেত ফুটে উঠছিল।
পরবর্তীকালে, ধৃতরাষ্ট্রের প্রশ্নের উত্তরে সঞ্জয় বর্ণনা করলেন এই পৃথিবীর পরম মহত্ত্বের কথা—কেন রাজারা ভূমির লোভে এমন রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতেও কুণ্ঠিত হন না। চরাচর জগতের সমস্ত জীব, স্থাবর ও জঙ্গম, এই ভূমিতেই উৎপন্ন হয় এবং এখানেই বিলীন হয়। সেই ভূমির অধিকারই মানুষকে অন্ধ করে তোলে।
কিন্তু যুদ্ধের দশম দিনে ঘটল সেই অলৌকিক ও মর্মান্তিক অধ্যায়। সঞ্জয় অত্যন্ত বিষাদগ্রস্ত হয়ে রণভূমি থেকে ফিরে ধৃতরাষ্ট্রকে শোনালেন এক নিদারুণ সংবাদ। শান্তনুনন্দন, হিমালয়ের ন্যায় স্থির, পরশুরামকেও পরাস্তকারী পিতামহ ভীষ্ম আজ কুরুক্ষেত্রের ধূলিতে শায়িত! শিখণ্ডীকে সামনে রেখে অর্জুনের শরবর্ষণে শত শত বাণে বিদ্ধ হয়ে তিনি আজ শরশয্যা গ্রহণ করেছেন।
যে পিতামহ দশ দিনে লক্ষ লক্ষ সৈন্য সংহার করে কৌরব বাহিনীকে রক্ষা করে এসেছিলেন, ঝড়ে উৎপাটিত মহীরুহের মতো তাঁর এই পতন ধৃতরাষ্ট্রের ভুল নীতিরই এক নির্মম পরিণতি। কুরুক্ষেত্রের বুকে ভীষ্মের এই পতন কেবল একজন মহাবীরের পতন ছিল না, তা ছিল কৌরব বংশের পতনের সূচনালগ্ন।
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে বিরাট পর্ব ১১ ভাগে এবং উদ্যোগপর্ব ৪৬ ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের ভীষ্মপর্বের -প্রথম ভাগের আলোচনা।
উদ্যোগপর্বের ৪৬তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
ভীষ্মপর্ব চলবে
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আমাদের গল্পগুলো নিয়মিত সবার আগে বিনামূল্যে পেতে এখনই নিচে সাবস্ক্রাইব করুন।
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment