৩৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-ঈশ্বরের চোখে জ্বলন্ত ধূপ: কৌরব সভার সেই অগ্নিঝড়


৩৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-ঈশ্বরের চোখে জ্বলন্ত ধূপ: কৌরব সভার সেই অগ্নিঝড়

কর্ণের কুন্ডল ও বর্মের সেই পুরনো তেজ যেন ছড়িয়ে পড়েছিল কৃষ্ণের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তাঁর কান থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছিল ভয়াল আগুনের রক্তিম শিখা, আর শরীরের প্রতিটি রোমকূপ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল হাজারটা মধ্যাহ্নসূর্যের এক অচিন আলো।

হস্তিনাপুরের কৌরব সভা তখন এক থমথমে অন্ধকারের গর্ভে। দূর থেকে নেমে আসা এক অলৌকিক দাপটে থরথর করে কাঁপছিল সভাতল। সাধারণ রাজারা সেই তেজ সহ্য করতে না পেরে আতঙ্কে চোখ বুজলেন। একটা গোটা রাজসভা যেন হঠাৎ আলোহীন, নিথর। শুধু কজন মানুষ চোখের পাতা মোছার সাহসটুকু পেলেন—ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর, সঞ্জয় আর সভাসীন তপস্বী ঋষিগণ। জনার্দন কৃষ্ণ নিজেই যে তাঁদের বুনে দিয়েছিলেন এক অন্য দেখার চোখ—এক দিব্যদৃষ্টি!

স্তব্ধ সভাঘরের মাথার ওপরের নীল আকাশ থেকে তখন অলক্ষ্যে নেমে এল দেবতাদের দুন্দুভির বাজনা, ঝরে পড়ল অগুনতি পারিজাত।

সেই ঘোর অন্ধকারের ভেতর থেকে কাতর গলায় কেঁদে উঠলেন এক বৃদ্ধ অন্ধ পিতা। ধৃতরাষ্ট্র ব্যাকুল হয়ে দু-হাত বাড়ালেন, "কমলনয়ন! তুমিই তো বিশ্বজগতের কল্যাণময় রূপ। আজ আমার ওপর একটু করুণা করো। আমাকে শুধু একটিবার সেই চোখ দাও, আমি কেবল তোমাকেই দেখতে চাই! এই চোখে তোমাকে ছাড়া আর তো কাউকে দেখার সাধ আমার নেই..."

বাসুদেব কৃষ্ণ সামান্য হাসলেন। স্নিগ্ধ, অথচ এক গূঢ় কণ্ঠে বললেন, "কুরুনন্দন, আদৃশ্য রূপেই ফুটে উঠুক আপনার দুই চোখের আলো।"

মুহূর্তের মধ্যে এক আশ্চর্য অঘটন ঘটল। এক অন্ধ রাজা হঠাৎ আলো দেখতে পেলেন—চক্ষুষ্মান হলেন ধৃতরাষ্ট্র! সভার রাজারা যখন এই অলৌকিক কাণ্ড দেখে স্তব্ধ হয়ে শ্রীকৃষ্ণের স্তব গাইছেন, ঠিক তখনই কেঁপে উঠল মাটি, সাগরের জল উল্টেপাল্টে উথলে উঠল যেন কোন এক মহাপ্রলয়ের সংকেতে। সভার সমস্ত দাপুটে রাজারা তখন স্রেফ হতভম্ব জড়পুত্তলিকা।

কিন্তু কৃষ্ণ বেশি সময় দিলেন না। ধীরে ধীরে নিজের সেই অপরূপ মহাজাগতিক রূপ গুটিয়ে নিলেন তিনি। ফিরিয়ে আনলেন তাঁর মাটির শরীরের রূপ। তারপর ঋষিদের প্রণাম জানিয়ে, সাত্যকি আর কৃতবর্মাকে পাশে নিয়ে শান্ত পায়ে হেঁটে বেরিয়ে এলেন সভাঘরের বাইরে। নারদ আর অন্য ঋষিরাও ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেলেন নিমেষে।

কৌরব রাজারা পিছন পিছন হন্তদন্ত হয়ে ধেয়ে এলেন বটে, কিন্তু কৃষ্ণ আর কারো দিকে ফিরেও তাকালেন না। বাইরে তখন রথ নিয়ে দাঁড়িয়ে দারুক। কৃষ্ণের ইশারায় কৃতবর্মা রথে উঠতেই জনার্দন রথের লাগাম ছুঁলেন।

ঠিক তখনই ধৃতরাষ্ট্র এসে রথের পাশে দাঁড়ালেন। বড় অসহায় তাঁর গলা, "জনার্দন! আমার ছেলেদের ওপর আমার ঠিক কতটুকু শাসন চলে—তা তো আজ নিজের চোখেই দেখলে! আমি তো মন থেকেই চেয়েছিলাম কৌরব আর পাণ্ডবদের মধ্যে একটা মিটমাট হয়ে যাক... আমার এই চেষ্টার কথাটা তুমি অন্তত ভুলে যেও না। আমায় সন্দেহ কোরো না..."

কৃষ্ণ রথের ওপর সোজা হয়ে বসলেন। ধৃতরাষ্ট্র, দ্রোণ, ভীষ্ম, বিদুর, কৃপাচার্য আর বাহ্লীকের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো বিঁধে দিলেন শব্দ কটি—"রাজসভায় আজ যা যা ঘটল, তা আপনারা নিজেদের চোখেই দেখেছেন। ওই মন্দবুদ্ধি দুর্যোধন কীভাবে অন্ধ রাগে ফেটে পড়ল, তা-ও আপনারাই সাক্ষী। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রও জানিয়ে দিলেন যে তাঁর কিছুই করার নেই। সুতরাং, আপনাদের অনুমতি নিয়েই আমি এখন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের কাছে ফিরে যাচ্ছি।"

রথের চাকা ঘুরতে শুরু করল। ভীষ্ম, দ্রোণ, অশ্বত্থামা, বিকর্ণ, যুযুৎসুরা স্তব্ধ হয়ে খানিকটা দূর পর্যন্ত রথের পিছন পিছন হাঁটলেন শেষবিদায় জানাতে। ধুলো উড়িয়ে কৃষ্ণের রথ ছুটে চলল অন্য এক গন্তব্যে—যেখানে অপেক্ষা করে আছেন তাঁর পিসিমা কুন্তী।

বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে। 

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ৩৫তম ভাগের আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।

উদ্যোগপর্বের ৩৪তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

 পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)