শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: ১ম অধ্যায়- ২৩ থেকে ২৫ তম শ্লোক বিষাদযোগ



শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: ১ম অধ্যায়- ২৩ থেকে ২৫ তম শ্লোক  বিষাদযোগ

এখানে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের ২৩ নম্বর শ্লোকের মূল পাঠ, অনুবাদ ও ব্যাখ্যার একটি মার্জিত ও পরিশীলিত পুনর্লিখন উপস্থাপন করা হলো:

মূল শ্লোক ও সহজ অনুবাদ

योत्स्यमानानवेक्षेऽहं य एतेऽत्र समागताः । धार्तराष्ट्रस्य दुर्बुद्धेर्युद्धे प्रियचिकीर्षवः ॥ २३ ॥

বাংলা উচ্চারণ: যোৎস্যমানানবেক্ষেঽহং য এতেঽত্র সমাগতাঃ। ধার্তরাষ্ট্রস্য দুর্বুদ্ধেযুদ্ধে প্রিয়চিকীর্ষবঃ ॥ ২৩ ॥

সহজ অনুবাদ: "মন্দবুদ্ধি ধৃতরাষ্ট্র-পুত্র দুর্যোধনের যুদ্ধজয়ের প্রীতিসাধন করতে যারা এখানে সমবেত হয়ে যুদ্ধ করতে উদ্যত হয়েছে, আমি সেইসব যোদ্ধাদের ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করতে চাই।"

শব্দার্থ ও গভীর তাৎপর্য

যোৎস্যমানান (Yo tṣya mā nān): যাদের মনে যুদ্ধ করার তীব্র আকুলতা বা অধৈর্য ভাব রয়েছে। অর্জুন সেইসব যোদ্ধাদেরই স্পষ্টভাবে দেখতে চেয়েছেন, যারা অন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করে যুদ্ধের ময়দানে অধীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

যোৎস্যমানানবেক্ষেঽহম্ (Yotsyamānānavekṣe 'ham): অর্জুন কৌরবপক্ষের সকল সেনানীকে একনজরে মেপে নিতে চান—কারা অধর্মের সহযোগী হয়ে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে এসেছে।

ধার্তরাষ্ট্রস্য (Dhārtarāṣṭra): শব্দটির দুটি সাধারণ অর্থ পাওয়া যায়— ১. ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র বা তাঁর আত্মীয়পরিজন। ২. যারা অন্যায়ভাবে অন্যের রাজ্য ও ধনসম্পদ জবরদখল করে রাখে। এখানে বিশেষত দুর্মতি দুর্যোধনকে নির্দেশ করা হয়েছে।

দুর্বুদ্ধেঃ (Durbuddheḥ): দুর্যোধনের কুপরামর্শ ও মন্দবুদ্ধির প্রতি ইঙ্গিত করে অর্জুন স্মরণ করিয়ে দেন যে, দুর্যোধন বারবার পাণ্ডবদের বিনাশ সাধনে ষড়যন্ত্র করেছে এবং পদে পদে তাঁদের অপমান করেছে। বৈধভাবে পাণ্ডবরা রাজ্যের অর্ধেক অংশের অধিকারী হলেও, দুর্যোধন অন্যায়ভাবে পুরো রাজ্য জবরদখল করে রেখেছে।

কৌরবপক্ষের রাজাদের ভূমিকা ও অর্জুনের উপলব্ধি

অর্জুন মনে করেন, দুর্যোধনের পাশে যেসমস্ত রাজারা সমবেত হয়েছেন, তাঁরা প্রকৃত বন্ধুর দায়িত্ব পালন করছেন না:

প্রকৃত মিত্রের কর্তব্য: একজন সৎ বন্ধুর মূল দায়িত্ব হলো বন্ধুকে এমন পথ দেখানো যা তার ইহকাল ও পরকালে কল্যাণ বয়ে আনে। রাজাদের উচিত ছিল দুর্যোধনকে পরামর্শ দেওয়া—যেন সে পাণ্ডবদের প্রাপ্য অর্ধেক রাজ্য ফিরিয়ে দিয়ে নিজের ইহলোক পবিত্র করে এবং পরলোকের শুভগতি সুনিশ্চিত করে।

অধর্মের উসকানি: দুর্যোধনকে সংশোধন করার পরিবর্তে উপস্থিত রাজারা তাঁর অন্যায্য জেদ ও মন্দবুদ্ধিকে আরও উৎসাহিত করছেন। যুদ্ধের উসকানি দিয়ে তাঁরা প্রকৃতপক্ষে দুর্যোধনকে অধঃপতন ও বিনাশের দিকেই ঠেলে দিচ্ছেন।

সংযোগ: ২৩ নম্বর শ্লোকে অর্জুনের এই দৃঢ় বক্তব্য ও আকাঙ্ক্ষা শোনার পর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তী দুটি শ্লোকে (২৪ ও ২৫) সঞ্জয় তা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে বর্ণনা করেছেন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের ২৪ ও ২৫ নম্বর শ্লোকে সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, অর্জুনের নির্দেশ পাওয়ার পর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ঠিক কী করেছিলেন।

মূল শ্লোক ও অনুবাদ

सञ्जय उवाच । 

एवमुक्तो हृषीकेशो गुडाकेशेन भारत । सेनयोरुभयोर्मध्ये स्थापयित्वा रथोत्तमम् ॥ २४ ॥

भीष्मद्रोणप्रमुखतः सर्वेषां च महीक्षिताम् । उवाच पार्थ पश्यैतान्समवेतान्कुरूनिति ॥ २५ ॥

বাংলা উচ্চারণ: সঞ্জয় উবাচ— এবমুক্তো হৃষীকেশো গুড়াকেশেন ভারত। সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে স্থাপয়িত্বা রথোত্তমম্ ॥ ২৪ ॥

 ভীষ্মদ্রোণপ্রমুখতঃ সর্বেষাং চ মহীক্ষিতাম্। উবাচ পার্থ পশ্যৈতানসমবেতান্ কুরূনিতি ॥ ২৫ ॥

সঞ্জয় বললেন—হে ভরতবংশীয় ধৃতরাষ্ট্র! নিদ্রাজয়ী অর্জুন (গুড়াকেশ) কর্তৃক এভাবে প্রার্থিত হয়ে ইন্দ্রিয়নিয়ন্তা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ (হৃষীকেশ) উভয় সৈন্যবাহিনীর মধ্যবর্তী স্থানে সেই শ্রেষ্ঠ রথটি স্থাপন করলেন। ভীষ্ম, দ্রোণ এবং উপস্থিত পৃথিবীর সমস্ত রাজন্যবর্গের সামনে রথটি দাঁড় করিয়ে তিনি বললেন: "হে পার্থ, এখানে সমবেত কুরুবংশীয়দের দর্শন করো।"

শব্দার্থ ও গভীর তাৎপর্য

গুড়াকেশ (Gudākeśa): শব্দটির দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে—

'গুড়া' অর্থ কোঁকড়ানো এবং 'কেশ' অর্থ চুল; অর্থাৎ যার চুল কোঁকড়ানো।

'গুড়াকা' অর্থ নিদ্রা বা আলস্য এবং 'ঈশ' অর্থ প্রভু। যিনি নিদ্রা ও আলস্য জয় করেছেন, তিনিই গুড়াকেশ (অর্জুন)। ভক্ত যখন নিদ্রা, আলস্য ও পার্থিব ভোগের ঊর্ধ্বে উঠে ঈশ্বরের দাসত্ব স্বীকার করেন, ঈশ্বরও তখন তাঁর কথা শোনেন এবং তাঁর নির্দেশ পালন করতে দ্বিধা করেন না।

হৃষীকেশ (Hṛṣīkeśa): 'হৃষীক' অর্থ ইন্দ্রিয়সমূহ এবং 'ঈশ' অর্থ চালক বা প্রভু। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সমস্ত ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধির চালক এবং সমগ্র মহাবিশ্বের নিয়ন্তা। তা সত্ত্বেও তিনি ভক্ত অর্জুনের প্রতি অসীম করুণাবশত সামান্য সারথির ভূমিকা গ্রহণ করে তাঁর আজ্ঞা পালন করছেন।

সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে স্থাপয়িত্বা রথোত্তমম্: শ্রীকৃষ্ণ রথটিকে দুই সেনাবাহিনীর মাঝখানে একদম উন্মুক্ত ও দৃশ্যমান স্থানে এনে দাঁড় করালেন।

ভীষ্মদ্রোণপ্রমুখতঃ সর্বেষাং চ মহীক্ষিতাম্: শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে রথটি ঠিক এমন এক জায়গায় রাখলেন, যার ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন পিতামহ ভীষ্ম, আচার্য দ্রোণ এবং কৌরব পক্ষের প্রধান প্রধান রাজাগণ।

শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্য ও লীলাকৌশল

এখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে 'ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের' (ধৃতরাষ্ট্রান্) দেখতে না বলে ইচ্ছা করেই "কুরূন্ পশ্য" (কুরুবংশীয়দের দর্শন করো) বলেছেন। এর পেছনে একটি গভীর মহতী উদ্দেশ্য ছিল:

মোেহের উন্মেষ ও বিনাশ: 'কুরু' শব্দের মধ্যে পাণ্ডব ও কৌরব—উভয় পক্ষই পড়ে। শ্রীকৃষ্ণ যদি কেবল শত্রুপক্ষ হিসেবে 'ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের' দেখতে বলতেন, তবে অর্জুনের মনে বীররস ও যুদ্ধের উৎসাহ জেগে উঠত। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ চান অর্জুনের অন্তরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত মোহ প্রকাশ পাক, যাতে তা দূর করে মানবজাতির কল্যাণে গীতার অমর বাণী প্রদান করা যায়।

চিকিৎসকের কৌশল: একজন দক্ষ চিকিৎসক যেমন প্রথমে ফোড়াটিকে ওষুধ দিয়ে পাকিয়ে তোলেন এবং পরে অস্ত্রোপচার করে পুঁজ বের করে রোগীকে সুস্থ করেন, শ্রীকৃষ্ণও ঠিক তেমনই "কুরূন্ পশ্য" বলে অর্জুনের মনে সুপ্ত 'আত্মীয়তাবোধ' ও 'মোহ' জাগিয়ে তুললেন, যাতে পরে গীতার জ্ঞানের মাধ্যমে সেই মোহের চিরতরে বিনাশ ঘটানো যায়।

পারিবারিক ভালোবাসা বনাম ঈশ্বরপ্রেম

এই শ্লোকগুলোর প্রেক্ষাপটে পারিবারিক বা সাংসারিক ভালোবাসা এবং দিব্য ঈশ্বরপ্রেমের একটি স্পষ্ট পার্থক্য ফুটে ওঠে:

ভিত্তি: পারিবারিক ভালোবাসার মূলে থাকে জড় দেহ ও রক্তের সম্পর্ক, যেখানে মোহের প্রাধান্য বেশি। কিন্তু ঈশ্বরপ্রেমের মূলে থাকে আত্মার অনুভূতির বিস্তার ও পরম সুখানুভূতি।

দৃষ্টিভঙ্গি: পারিবারিক প্রেমে মানুষ স্বজনের দোষ-ত্রুটি অন্ধভাবে এড়িয়ে যায় 'আপনত্ব'-এর মোহে, যা অনেক সময় কর্তব্যচ্যুত করে। অন্যদিকে, ঈশ্বরও ভক্তের ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন, তবে তা অন্ধ মোহে নয়—বরং নিবিড় অন্তরঙ্গতা ও অন্তরের আলোর প্রভাবে।

ফলাফল: সাংসারিক ভালোবাসা মানুষকে মোহের অন্ধকারে আবদ্ধ করে কর্তব্য বিমুখ করতে পারে। কিন্তু ঈশ্বরের প্রতি প্রেম মানুষকে দিব্য আলোয় আলোকিত করে এবং কখনো নিজ কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হতে দেয় না।

সংযোগ: ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সমবেত কুরুবংশীয়দের দেখতে বললেন। এর উত্তরে অর্জুন স্বজনদের দেখে কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন, সঞ্জয় পরবর্তী শ্লোকগুলোতে ধৃতরাষ্ট্রের কাছে তা-ই বর্ণনা করছেন।

বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে  বিরাট পর্ব ১১ ভাগে উদ্যোগপর্ব ৪৬ ভাগে  এবং ভীষ্মপর্ব দ্বিতীয় ভাগেসম্পন্ন করেছে।

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: প্রথম অধ্যায় -অর্জুনবিষাদযোগের আলোচনা। 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: প্রথম অধ্যায় (অর্জুনবিষাদযোগ) ২০ থেকে ২২তম শ্লোক পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আমাদের গল্পগুলো নিয়মিত সবার আগে বিনামূল্যে পেতে এখনই নিচে সাবস্ক্রাইব করুন।


আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :


"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।




Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি