৩৮তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-গঙ্গাতীরের গোপন রক্তঋণ ও এক ট্র্যাজিক সত্য


৩৮তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-গঙ্গাতীরের গোপন রক্তঋণ ও এক ট্র্যাজিক সত্য

যুদ্ধ তখন আর কোনো দূরের সম্ভাবনা নয়, দরজায় এসে থাপ্পড় মারছে। শ্রীকৃষ্ণ কৌরবদের সভা থেকে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার পর থেকেই হস্তিনাপুরের বাতাসে বারুদের গন্ধ। যে কোনো মুহূর্তে কুরুক্ষেত্র জ্বলে উঠবে।

বিদুর সেদিন রাতে ঘুমোতে পারেননি। বিষণ্ণ পায়ে তিনি এসেছিলেন রাজমাতা কুন্তীর কক্ষে। কোনো ভূমিকা না করেই বলেছিলেন, "দেবী, আমি তো যুদ্ধ চাইনি। দুর্যোধন অন্ধ, সে কথা শেনেনি। এমনকি কৃষ্ণও পারলেন না সন্ধি করাতে। এবার সব শেষ হবে। কৌরবদের এই অন্ধ অহংকারের আগুনে রাজপরিবারের রক্ত বইবে।"

কথাগুলো কুন্তীর বুকে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি একা বসে রইলেন। সম্পদ, রাজ্য, ক্ষমতা—এই সব কিছুর মূল্য কি স্বজনদের রক্ত? ভীষ্ম বা দ্রোণাচার্য হয়তো অনিচ্ছাসত্ত্বেও দুর্যোধনের পক্ষে লড়বেন। কিন্তু কুন্তীর আসল ভয় অন্য জায়গায়। তিনি জানেন, কর্ণ নামের ওই তীব্র তেজস্বী বীরটি যার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে হারানো অসম্ভব। কর্ণ ভালোবাসে না কৌরবদের, কিন্তু সে অনুগত। তার ভেতরের জমে থাকা ঘৃণা আর জেদ পাণ্ডবদের ছাই করে দেওয়ার জন্য তৈরি।

কুন্তী আর স্থির থাকতে পারলেন না। এই একটাই সময়, যখন সত্যিটা বলতে হবে।

দুপুরের রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। জপ শেষে চোখ খুলতেই কর্ণ দেখলেন, সামনে এক রাজকীয় বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে। কুন্তী। হস্তিনাপুরের রাজমাতা।

কর্ণ বিনীতভাবে হাত জোড় করলেন, "আমি সূতপুত্র কর্ণ, অধিরথ ও রাধার সন্তান। দেবী, আপনি গঙ্গাতীরে এই অকিঞ্চন দাসের কাছে কেন এসেছে? আদেশ করুন, কী সেবা করতে পারি?"

কুন্তীর কণ্ঠ কেঁপে উঠল, "তুমি সূতপুত্র নও, কর্ণ। তুমি রাধার সন্তান নও, আর অধিরথ তোমার পিতা নয়। তুমি আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র। সূর্যদেবের বরে আমার কুমারী বয়সে তোমার জন্ম। এই যে তোমার শরীরে জন্মগত কবচ আর কুণ্ডল, এ তো রাজরক্তের চিহ্ন। আজ অচেনা ভাইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে যাচ্ছ তুমি? অর্জুনের সঙ্গে তোমার শত্রুতা কেন হবে? তোমরা দুজন এক হলে তো এই বিশ্বজগত তোমাদের পায়ে লুটাবে। কৌরবদের অন্যায় সহ্য কোরো না, নিজের অধিকার ছিনিয়ে নাও।"

ঠিক তখনই আকাশ থেকে এক গম্ভীর, উষ্ণ বাতাস বয়ে গেল। সূর্যের সেই অদৃশ্য কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "কুন্তী সত্য বলছেন কর্ণ। মায়ের কথা শোনো, এতেই তোমার কল্যাণ।"

কর্ণ ক্ষণিকের জন্য চোখ বুজলেন। পিতা সূর্যদেব এবং জন্মদাত্রী মাতা—দুজনই তাঁর সামনে। কিন্তু কর্ণের ঠোঁটে ফুটে উঠল এক বিষাদময় হাসি। স্থির, অবিচল কণ্ঠে তিনি বললেন, "ক্ষত্রিয়দেবী! আজ আপনি যা চাইছেন, তা আমার ধর্মকে হত্যা করা। আপনি যখন আমাকে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, তখন আমার ক্ষত্রিয় পরিচয়ও ভেসে গিয়েছিল। এতদিন আমি কোথায় ছিলাম? আজ যুদ্ধের মুখে এসে আপনার মাতৃত্ব জেগে উঠল? এতদিন পর আমাকে ভাইয়ের পাশে দাঁড়ালে লোকে আমাকে কাপুরুষ বলবে না?"

একটু থেমে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে কর্ণ আবার বললেন, "দুর্যোধন আমাকে সম্মান দিয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে, রাজত্ব দিয়েছে। আজ যখন তার মৃত্যুর দিন এগিয়ে আসছে, তখন আমি তাকে ছেড়ে পালাব? আমি অন্যায়ের সঙ্গ দিচ্ছি জানি, কিন্তু নুন তো খেয়েছি। সেই ঋণ শোধ করার সময় এসেছে। আমি পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে লড়বই।"

কুন্তীর চোখ ফেটে জল এল। কর্ণ তাঁর দিকে শান্ত চোখে তাকালেন, "তবে শুনুন মাতা, আপনার এই আসা একেবারে ব্যর্থ হবে না। আমি প্রতিজ্ঞা করছি—অর্জুন ছাড়া আপনার অন্য চার পুত্রকে, অর্থাৎ যুধিষ্ঠির, ভীম, নকুল ও সহদেবকে আমি প্রাণসংশয়ে ফেললেও বধ করব না। আমার যুদ্ধ কেবল অর্জুনের সঙ্গে। যদি আমি মরি, তবে অর্জুনসহ আপনার পাঁচ পুত্র থাকবে। আর যদি অর্জুন মরে, তবে আমি আপনার পুত্র হিসেবে বেঁচে থাকব। আপনার পাণ্ডব পাঁচজনই থাকবে।"

কুন্তী আর কিছু বলতে পারলেন না। শুধু জড়িয়ে ধরলেন তাঁর এই অভিশপ্ত, তেজস্বী সন্তানকে। ফিসফিস করে বললেন, "কপাল! নিয়তি যা চেয়েছিল, তাই হচ্ছে।"

সূর্য তখন পাটে নামছে। গঙ্গাতীরের ম্লান আলোয় দুই বিপরীত মেরুর মানুষ দুজন আবার নিজেদের পথে হেঁটে চললেন। একজন যুদ্ধের রক্তের দিকে, অন্যজন অনুশোচনার অন্ধকারের দিকে।

বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে। 

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ৩৮তম ভাগের আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।

উদ্যোগপর্বের ৩৭তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

 পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আমাদের গল্পগুলো নিয়মিত সবার আগে পেতে এখনই বিনামূল্যে সাব< Subscribe Form

Subscribe Now

স্ক্রাইব করুন।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)