দ্বিতীয় ভাগ মহাভারতের ভীষ্মপর্ব-কুরুক্ষেত্রের রণপ্রান্তরে: সংহারের আগে আবাহন
দ্বিতীয় ভাগ মহাভারতের ভীষ্মপর্ব-কুরুক্ষেত্রের রণপ্রান্তরে: সংহারের আগে আবাহন
কুরুক্ষেত্রের ধূসর ধূলিরাশি তখন বাতাসে উড়ছে। ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ চোখের আলো সঞ্জয় একে একে ফুটিয়ে তুলছেন তাঁর দিব্যদৃষ্টির ক্যানভাসে। সঞ্জয় বলতে শুরু করলেন—
মহারাজ! পিতামহ ভীষ্মের নির্মিত সেই দুর্ভেদ্য, লৌহকঠিন ব্যূহ দেখে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের হৃদয় ক্ষণেকের জন্য কেঁপে উঠেছিল। বিমর্ষ মুখে তিনি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অর্জুনের দিকে চেয়ে বললেন, "ধনঞ্জয়! যার সেনাপতি খোদ পিতামহ ভীষ্ম, সেই কৌরবদের আমরা থামাব কীভাবে? এই ব্যূহ তো শাস্ত্রীয় বিধিতে গড়া এক অভেদ্য প্রাচীর! আমাদের পুরো সৈন্যদল আজ এক পরম সংকটের মুখে। কীভাবে রক্ষা পাব আমরা?"
তীরক্ষ্ণ দৃষ্টি অর্জুনের। তিনি দমে যাওয়ার পাত্র নন। বিষাদগ্রস্ত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে ধীর কণ্ঠে তিনি মনে করিয়ে দিলেন চিরন্তন সত্য— "রাজন! শত্রুর সংখ্যা বা শারীরিক বলই যে সবসময় জয়ের শেষ কথা বলে না, তা তো আপনার অজানা নয়। বহুপূর্বে দেবাসুর যুদ্ধের পর স্বয়ং ব্রহ্মা ইন্দ্রাণীসহ দেবগণকে বলেছিলেন— শুধুমাত্র পেশিশক্তি আর বাহুবলে জয় আসে না; জয় আসে সত্য, দয়া, ধর্ম এবং উদ্যমের শক্তিতে। যেখানে ধর্ম, সেখানেই জয়। আর নারদ তো স্পষ্টই বলেছেন— ‘যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণঃ...’ যেখানে কৃষ্ণ আছেন, বিজয় তাঁর অনুগমন করবেই। সনাতন পুরুষ গোবিন্দ আপনার পক্ষে থাকা সত্ত্বেও আপনার কিসের এই বিষাদ?"
অর্জুনের এই অকাট্য যুক্তিতে যুধিষ্ঠিরের মনের মেঘ কেটে গেল। তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের সৈন্যদের ব্যূহবদ্ধ হয়ে সামনে এগোনোর নির্দেশ দিলেন। দেবরাজ ইন্দ্রের মতো সুসজ্জিত রথে উঠলেন মহারাজ। পুরোহিতরা উচ্চারণ করলেন শত্রুনাশের অমোঘ আশীর্বাদ, ব্রহ্মর্ষি ও বেদজ্ঞ পণ্ডিতেরা জপ-মন্ত্র ও স্বস্তিবাচনে রণক্ষেত্র মুখরিত করে তুললেন। বস্ত্র, গাভী ও স্বর্ণমুদ্রা দান করে ধর্মরাজ প্রস্তুত হলেন পরম যুদ্ধের জন্য। অন্যদিকে, কৌরবদের ধ্বংস করতে ভীমসেনের রুদ্র রূপ দেখে ধৃতরাষ্ট্রের বাহিনীর বুক ততক্ষণে দমে গেছে।
ঠিক তখনই, রণক্ষেত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ইঙ্গিত করলেন— "হে নরশ্রেষ্ঠ! মধ্যভাগে সিংহের মতো তেজ নিয়ে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি কৌরবদের ধ্বজাধারী পিতামহ ভীষ্ম। মেঘ যেমন সূর্যকে আড়াল করে, সৈন্যদলও তাঁকে তেমনি ঘিরে রেখেছে। ভীষ্মকে স্পর্শ করার আগে এই সেনাপালকে পরাস্ত করতে হবে।"
তারপর হঠাৎ বাসুদেব ক্ষণেকের জন্য থামলেন। রণভূমির ওপর চোখ বুলিয়ে এক অলৌকিক ইঙ্গিতে অর্জুনকে বললেন— "মহাবাহো! সংহার শুরু করার আগে তুমি রথ থেকে নেমে পবিত্র মনে দেবী দুর্গার স্তব করো।"
বাসুদেবের নির্দেশ শোনামাত্র অর্জুন রথ থেকে নেমে এলেন কুরুক্ষেত্রের রক্তাভ মাটিতে। করজোড়ে, একাগ্রচিত্তে আবাহন করলেন মহাশক্তিকে—
"হে মন্দারচলবাসিনী, সিদ্ধদের সেনানেত্রী আর্দ্যে! তোমাকে প্রণতি জানাই। তুমিই কুমারী, কালী, কাপালী, কপিলা, কৃষ্ণ, পিঙ্গলা, ভদ্রকালী ও চণ্ডী। ভক্তদের সংকট থেকে তারণ করো বলেই তুমি তারিণী। কখনও তুমি সৌম্য রূপিনী কাত্যায়নী, কখনও আবার ভয়াল রূপী কালী। ময়ূরপুচ্ছের ধ্বজা আর ত্রিশূল-খড়্গ ধারণ করে থাকা হে কৃষ্ণভগিনী, তুমিই মহিষাসুরমর্দিনী কৌশিকী! বেদের শ্রুতি তুমি, বেদবিদের প্রিয় তুমি। এই মহা সংগ্রামে আমাদের জয়ী করো দেবী!"
রণক্ষেত্রের বারুদের গন্ধের মাঝে সেদিন ধ্বনিত হয়েছিল সেই অমোঘ প্রার্থনামন্ত্র, যা কৌরবদের পতনের এবং পাণ্ডবদের বিজয়ের প্রথম গান গেয়ে উঠেছিল।
এখানেই সমাপ্ত হল ভীষ্মপর্ব। এর পর শুরু হবে শ্রীমদভগবত গীতা পর্ব।
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে বিরাট পর্ব ১১ ভাগে এবং উদ্যোগপর্ব ৪৬ ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের ভীষ্মপর্বের দ্বিতীয় ভাগের আলোচনা।
ভীষ্মপর্বের প্রথম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আমাদের গল্পগুলো নিয়মিত সবার আগে বিনামূল্যে পেতে এখনই নিচে সাবস্ক্রাইব করুন।
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment