৪৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-মহাপ্রলয়ের আগের রাতে: অহংকার ও প্রচ্ছন্ন আগুনের গল্প
৪৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-মহাপ্রলয়ের আগের রাতে: অহংকার ও প্রচ্ছন্ন আগুনের গল্প
রাতের অন্ধকার তখনও কাটেনি। কুরুক্ষেত্রের দিগন্তে কেবল ভোরের ধূসর আলো ফুটে উঠছে। ধৃতরাষ্ট্রকে সেই মুহূর্তের খবর দিতে গিয়ে সঞ্জয় শোনালেন এক অদ্ভুত আড্ডার কথা।
যুদ্ধের আগের দিন রাতে কৌরবদের শিবিরে এক অস্থির প্রশ্ন জেগেছিল দুর্যোধনের মনে। পিতামহ ভীষ্মের সামনে দাঁড়িয়ে দুর্যোধন শুধোলেন, "পিতামহ, পাণ্ডবদের এই বিশাল মহাসমুদ্রের মতো বাহিনীকে ধ্বংস করতে আপনার ঠিক কতদিন লাগবে? কিংবা দ্রোণ, কৃপ বা কর্ণেরই বা কত সময় চাই?"
ভীষ্মের মুখে ফুটল এক বিষণ্ণ আর গম্ভীর হাসি। "রাজন, শোনো," ভীষ্ম বললেন, "ধর্মযুদ্ধের নিয়ম মেনে চললে আমি প্রতিদিন দশ হাজার সেনা আর এক হাজার রথী সংহার করতে পারি। সেই হিসেবে আমার মহাঅস্ত্র প্রয়োগ করলে সময় লাগবে মাত্র এক মাস।"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দ্রোণাচার্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে সহমত হলেন— বৃদ্ধ হলেও তিনিও এক মাসের বেশি সময় নেবেন না। কৃপাচার্য চাইলেন দুই মাস, আর অশ্বত্থামা ঘোষণা করলেন দশ দিনের কথা।
কিন্তু ঠিক তখনই পরিবেশ বিষিয়ে দিলেন কর্ণ। দম্ভভরে বলে উঠলেন, "এদের সব হিসেব ভুল! মাত্র পাঁচ দিন— পাঁচ দিনেই আমি একা গোটা পাণ্ডব বাহিনীকে নিঃশেষ করে দেব!"
কথাটা শুনেই ভীষ্ম সশব্দে হেসে উঠলেন। সে হাসিতে আক্ষেপ আর উপহাস মিশে ছিল সমপরিমাণে। রাজাপুত্র কর্ণের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, "রাধাপুত্র! তোমার এই ফাঁকা অহংকার ততক্ষণই টিকবে, যতক্ষণ রণে বাঁশিওয়ালা কৃষ্ণের রথে অর্জুন এসে না দাঁড়াচ্ছে। তাঁদের মুখোমুখি হয়েও কি এই কথাগুলো বলতে পারবে?"
সূর্য ওঠার আগেই গুপ্তচরের মাধ্যমে এই সংবাদের খবর পৌঁছাল পাণ্ডব শিবিরে। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির বেশ কিছুটা চিন্তিত হয়ে অর্জুনকে ডেকে পাঠালেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মুখে মহারথীদের এই হিসেব শুনে অর্জুন একপলক তাকালেন রথের সারথি কৃষ্ণর দিকে। তারপর এক শান্ত, অথচ অগ্নিসম দৃঢ়তায় উত্তর দিলেন—
"প্রথম কথা, ভগবান শংকর আমাকে যে মহাপ্রলয় সৃষ্টিকারী পাশুপত অস্ত্র দিয়েছেন, তা প্রয়োগ করলে এক নিমেষেই আমি দেবতাসহ এই ত্রিলোক ছারখার করে দিতে পারি। ভীষ্ম, দ্রোণ কিংবা কর্ণের সে অস্ত্রের জ্ঞান নেই। কিন্তু সামান্য মানুষ মারতে আমি সেই দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ করব না। আমি সাধারণ যুদ্ধেই ওদের পরাস্ত করব। তাছাড়া আমাদের পক্ষে ভীম, সাত্যকি, ধৃষ্টদ্যুম্ন, অভিমন্যুরা রয়েছে—এঁরা প্রত্যেকেই সিংহের মতো বলশালী। আর সবচেয়ে বড় কথা, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, আপনি যদি ক্রোধভরে একবার শত্রুদের দিকে তাকান, তবে সেই দৃষ্টির তেজেই কৌরববাহিনী ভস্ম হয়ে যাবে।"
প্রভাত হতে না হতেই রণশিঙ্গার গর্জনে কেঁপে উঠল কুরুক্ষেত্র।
একদিকে কৌরবদের সুসজ্জিত ব্যূহ। দ্রোণাচার্যের নেতৃত্বে অবন্তী ও কেকয় রাজারা আগে চললেন। পিছনে শক, কিরাত, যবন, বাহ্লীক এবং শকুনি। তাদের ঠিক পিছনেই শত ভাই আর বিশাল রথী দল নিয়ে স্বয়ং দুর্যোধন। পাঁচ যোজন বিস্তৃত বিশাল এক নতুন হস্তিনাপুরের মতো রাজকীয় আয়োজনে গড়ে উঠেছে তাদের যুদ্ধশিবির।
অন্যদিকে, পাঞ্চালপুত্র ধৃষ্টদ্যুম্নের নেতৃত্বে গঙ্গার মন্দগতি স্রোতের মতো শান্ত কিন্তু অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে এগিয়ে এল পাণ্ডব সৈন্য। যুধিষ্ঠির চতুরতার সঙ্গে সেনাবাহিনীকে নতুন করে সাজালেন। ভীমসেনের নেতৃত্বে অগ্রভাগে রইল দশ হাজার অশ্বারোহী, দুই হাজার হস্তী আর রথীর দল। মধ্যভাগে কৃষ্ণ ও অর্জুনকে ঘিরে রইল অগুনতি সেনা। ঢাক, ঢোল আর শঙ্খধ্বনিতে বাতাস থমথম করে উঠল।
দুই পক্ষই এখন মুখোমুখি। এক প্রান্তে অহংকারের দম্ভ, অন্য প্রান্তে ধর্ম রক্ষার নিঃশব্দ শপথ। মহাসংগ্রামের রক্তক্ষয়ী সূচনা আর ঠেকানো গেল না।
এখানেই উদ্যোগপর্ব সমাপ্ত, এরপর শুরু হবে ভীষ্মপর্ব
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ৪৬তম ভাগের আলোচনা।
উদ্যোগপর্বের ৪৫তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
এখানেই উদ্যোগপর্ব সমাপ্ত, এরপর শুরু হবে ভীষ্মপর্ব
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আমাদের গল্পগুলো নিয়মিত সবার আগে বিনামূল্যে পেতে এখনই নিচে সাবস্ক্রাইব করুন।
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment