৩৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রাজসভার বিষ ও বাসুদেবের ক্রোধ


৩৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রাজসভার বিষ ও বাসুদেবের ক্রোধ

কৌরব রাজসভায় যুদ্ধের ঘনঘটা। কৃষ্ণের অনুনয়-বিনয়, পৈতৃক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার শেষ প্রস্তাব—সবকিছু উড়িয়ে দিয়ে দুর্যোধনের কণ্ঠ তখন দম্ভে কাঁপছে। একবিন্দু নতিস্বীকার নয়, কোনো আপস নয়।

দুর্যোধন সোজা তাকালেন কৃষ্ণের দিকে। চোখ দুটো রাগে ধকধক করে জ্বলছে। বললেন, “কেশব! মেপে কথা বলবেন। পাণ্ডবদের পিরিতি দেখাতে গিয়ে আমাকে অপরাধী সাজাচ্ছেন কেন? আমি তো নিজের মধ্যে কোনো অন্যায় দেখতে পাই না। ওরা শখ করে পাশা খেলতে এসেছিল, আমার মামা শকুনির বুদ্ধির কাছে হেরে বনবাসে গেছে। এতে আমার দোষ কোথায়? আর শুনুন, আমরা ইন্দ্রের সামনেও মাথা নোয়ানোর পাত্র নই। ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ আর কর্ণের মতো বীর যাদের পাশে, তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে কে হারাবে? আমরা লড়ব। সূচগ্র মেদিনীও পাণ্ডবদের আমি বিনা যুদ্ধে দেব না!”

ঘরের নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। কৃষ্ণ হাসলেন না, তাঁর চোখের কোণে শুধুই কুঞ্চিত ক্রোধের রেখা। এক অদ্ভুত শান্ত কিন্তু বজ্রকঠিন স্বরে উত্তর দিলেন, “বীরশয্যাই যদি তোমার শেষ ইচ্ছে হয় দুর্যোধন, তবে তা-ই হবে। কিন্তু আত্মছলনা কোরো না। দ্রৌপদীকে সভায় টেনে এনে যে অসভ্যতা তুমি আর তোমার অনুচরেরা করেছিলে, বারণাবতে কুন্তীকে সহ পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার যে চক্রান্ত করেছিলে—সেসব কি পাপ নয়? তুমি রক্তপাত চাও, আর সেটাই তোমার পতন ডেকে আনবে।”

পাশের আসন থেকে দুঃশাসন বিড়বিড় করে উঠলেন, “দাদা, এরা আমাদের বেঁধে পাণ্ডবদের হাতে তুলে দেবে!”

ব্যস, সেই সলতেয় আগুন লাগল। ফুঁসে ওঠা বিষধর সাপের মতো দুর্যোধন চরম অপমানে ভরা দৃষ্টিতে ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর এবং স্বয়ং কৃষ্ণকে পদদলিত করে সভাগৃহ ত্যাগ করলেন। পেছনে ছুটে গেল তাঁর অন্ধ অনুচরদের দল।

পিতামহ ভীষ্ম নিশ্বাস ফেলে বললেন, “কৌরবদের অন্তিম সময় এসে গেছে কৃষ্ণ।” কৃষ্ণ তখন সভার বয়োবৃদ্ধদের দিকে চেয়ে স্পষ্ট গলায় বললেন, “আপনাদের সবচেয়ে বড় ভুল—আপনারা এই উন্মত্ত লোকটিকে আটকে রাখছেন না। কুল রক্ষার জন্য যদি একজন দুরাচারীকে বিসর্জন দিতে হয়, তবে তা-ই শ্রেয়। দুর্যোধন, কর্ণ আর শকুনিকে বন্দী করে পাণ্ডবদের হাতে সঁপে দিন, তবেই এই মহাবিনাশ আটকাবে।”

অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র দিশেহারা হয়ে বিদুরকে পাঠালেন গান্ধারীকে ডেকে আনতে। রাজসভায় এসে পুত্রমোহে অন্ধ স্বামীকে তিরস্কার করলেন মহীয়সী গান্ধারী, “রাজন, সব আপনার অপরাধ! পাপ জেনেও আপনি পুত্রকে সায় দিয়েছেন। আজ তারই ফল পাচ্ছেন।”

গান্ধারীর নির্দেশে বিদুর পুনরায় দুর্যোধনকে ডেকে আনলেন। কিন্তু দুর্যোধনের চোখে তখন শুধু হিংসার রক্ত আলো। গান্ধারী শেষ চেষ্টা করলেন পুত্রকে বোঝাতে, “বাছা, লোভ আর ক্রোধ রাজাকে ধ্বংস করে। অর্জুন আর কৃষ্ণকে কেউ পরাজিত করতে পারবে না। অন্যায় বনবাসের পর ওদের ন্যায়সঙ্গত প্রাপ্য ফিরিয়ে দাও, সন্ধি করো। যুদ্ধে জয় অনিশ্চিত, কেবল কুলক্ষয়ই সার।”

কিন্তু যে চোখ অন্ধ হয়ে গেছে অপমানের বিষে আর ক্ষমতার দম্ভে, সেখানে কান্নার আলো বা মায়ের বাণী পৌঁছায় না। কৌরবদের বিনাশের চাকা তখন ঘুরতে শুরু করে দিয়েছে।

বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে। 

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ৩৪তম ভাগের আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।

উদ্যোগপর্বের ৩৩তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

 পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)