৪৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব শিখণ্ডী ও লিঙ্গান্তরের ইতিহাস


৪৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শিখণ্ডী ও লিঙ্গান্তরের ইতিহাস

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে দুর্যোধনের প্রশ্নের উত্তরে পিতামহ ভীষ্ম শোনাচ্ছিলেন এক অদ্ভুত এবং রহস্যময় কাহিনী। কীভাবে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা শিখণ্ডী শেষপর্যন্ত পুরুষে রূপান্তরিত হলেন—তার এক চিরন্তন ও রোমাঞ্চকর উপাখ্যান।

রাজা দ্রুপদ ছিলেন পুত্রহীন। সন্তানলাভের আশায় তিনি কঠোর তপস্যায় শিবকে প্রসন্ন করলেন। মহাদেব বর দিলেন, "তোমার এমন এক সন্তান জন্মাবে, যে জন্মাবে নারী হয়ে, কিন্তু পরবর্তীতে রূপান্তরিত হবে পুরুষে।" শিবের বাক্যে আস্থা রেখে দ্রুপদ রাজ্যে ফিরে এলেন। যথাসময়ে রানি এক পরমা সুন্দরী কন্যা সন্তানের জন্ম দিলেন। কিন্তু শিবের বচনে অবিচল দ্রুপদ ও রানি বাইরের জগৎ থেকে সত্য গোপন রাখলেন। নগরজুড়ে ঘোষণা করা হলো, পাঞ্চালরাজের পুত্র সন্তান হয়েছে। তার নাম রাখা হলো শিখণ্ডী।

শিখণ্ডী বড় হতে লাগলেন রাজপুত্রের মতোই। দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্রশিক্ষায় তিনি পারদর্শী হয়ে উঠলেন। যথাসময়ে দশার্ণরাজ হিরণ্যবর্মার কন্যা দেবতিলকার সাথে শিখণ্ডীর বিবাহ সম্পন্ন হলো। কিন্তু বাসর ঘরেই উদঘাটিত হলো চরম সত্য—শিখণ্ডী পুরুষ নন, নারী! অপমানিতা ও প্রতারিতা রাজকন্যা ক্রন্দনরত অবস্থায় সমস্ত ঘটনা তাঁর পিতাকে জানালেন।

সংবাদ শুনে দশার্ণরাজ হিরণ্যবর্মা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন। পাঞ্চাল রাজ্য ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে তিনি কাম্পিল্য নগরীর দিকে অগ্রসর হলেন। চারিদিকে থমথমে যুদ্ধাভা। পুত্র ও রাজ্যের এই আসন্ন বিপদে দ্রুপদ ও রানি গভীর শোকে ও দুশ্চিন্তায় নিমজ্জিত হলেন।

পিতা-মাতার এই তীব্র যন্ত্রণা দেখে শিখণ্ডীর মনে গভীর অনুশোচনা জাগল। নিজেকেই এই সর্বনাশের মূল কারণ মনে করে তিনি প্রাণত্যাগের সংকল্প করলেন এবং গভীর অরণ্যে প্রবেশ করলেন।

সেই নির্জন বনে বাস করতেন 'স্থূণাকর্ণ' নামের এক সমৃদ্ধিশালী ও দয়ালু যক্ষ। অনাহারে জরাজীর্ণ শিখণ্ডীকে দেখে যক্ষের হৃদয় আর্দ্র হলো। সব শুনে স্থূণাকর্ণ এক অভূতপূর্ব প্রস্তাব দিলেন—তিনি সাময়িকভাবে শিখণ্ডীকে তাঁর পুরুষত্ব ধার দেবেন, আর বদলে নিজে নেবেন শিখণ্ডীর নারীত্ব। শর্ত একটিই, দশার্ণরাজের বিভ্রান্তি দূর হলেই শিখণ্ডীকে ফিরে এসে তাঁর পুরুষত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে।

পুরুষত্ব লাভ করে প্রফুল্ল চিত্তে শিখণ্ডী রাজপ্রাসাদে ফিরে এলেন। দ্রুপদ দশার্ণরাজের কাছে দূত পাঠালেন সত্য অনুসন্ধানের জন্য। দশার্ণরাজ পরীক্ষার জন্য কয়েকজন চতুর যুবতীকে পাঠালেন। পরীক্ষা শেষে জানা গেল রাজকুমার শিখণ্ডী প্রকৃতপক্ষে একজন পূর্ণাঙ্গ পুরুষ। লজ্জিত ও সন্তুষ্ট হয়ে দশার্ণরাজ বিপুল উপহারসামগ্রী প্রদান করে দ্রুপদের সাথে মিত্রতা পুনর্স্থাপিত করলেন।

এদিকে এক অঘটন ঘটে গেল যক্ষ স্থূণাকর্ণের ভাগ্যে। ধনপতি কুবের যখন স্থূণাকর্ণের আবাসে এলেন, তখন লজ্জা ও নারীত্বের কারণে স্থূণাকর্ণ কুবেরের সামনে উপস্থিত হতে পারলেন না। কুবের কারণ জানতে পেরে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে স্থূণাকর্ণকে চিরকালের জন্য নারী হয়ে থাকার অভিশাপ দিলেন। পরবর্তীতে অন্যান্য যক্ষদের ব্যাকুল প্রার্থনায় কুবের শান্ত হয়ে শর্ত জুড়ে দিলেন—"যেদিন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শিখণ্ডীর মৃত্যু হবে, সেদিন স্থূণাকর্ণ নিজের পুরুষত্ব ফিরে পাবে।"

শিখণ্ডী কথা রাখতে বনে ফিরে এসেছিলেন সত্য, কিন্তু স্থূণাকর্ণের অভিশাপের কথা জানতে পেরে তিনি চিরতরে পুরুষ রয়ে গেলেন।

গল্প শেষ করে ভীষ্ম মৃদু হেসে দুর্যোধনকে বললেন, "রাজন! শিখণ্ডী পূর্বাশ্রমে নারী ছিলেন। শাস্ত্র ও ধর্ম মতে আমি কোনো নারীর ওপর বা পূর্বে নারী ছিলেন এমন কারও ওপর অস্ত্র উত্তোলন করব না। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শিখণ্ডী আমার সামনে এলে আমি অস্ত্র ত্যাগ করব।"

বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে। 

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ৪৫তম ভাগের আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।

উদ্যোগপর্বের ৪৪তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 


আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি