শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: প্রথম অধ্যায় (অর্জুনবিষাদযোগ)-২য় শ্লোক


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: প্রথম অধ্যায় (অর্জুনবিষাদযোগ)-২য় শ্লোক

সঞ্জয় উবাচ

दृष्ट्वा तु पाण्डवानीकं व्यूढं दुर्योधनस्तदा। आचार्यमुपसंगम्य राजा वचनमब्रवीत्॥ ২ ॥

দৃষ্টা তু পাণ্ডবানীকং ব্যুঢ়ং দুর্যোধনস্তদা। আচার্যমুপসঙ্গম্য রাজা বচনমব্রবীৎ ॥ ২॥

সঞ্জয় বললেন-হে রাজন। পাণ্ডবদের বিশাল ও সুসজ্জিত বাহিনী দর্শন করে রাজা দুর্যোধন পরম শঙ্কিতচিত্তে পরম গুরু ও সেনাপতি দ্রোণাচার্যের নিকটে গিয়ে নিবেদন করলেন

ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন প্রজ্ঞা ও পারমার্থিক তত্ত্বদর্শনহীন ভাবাসক্ত এক অন্ধ পিতা। তিনি বিলক্ষণ জানতেন যে, তাঁর পুত্র অধর্মের পথে পরিচালিত এবং পরম ধর্মপ্রাণ পাণ্ডবদের সাথে কোনো শুভ ও ন্যায়সঙ্গত আপসে তারা রাজি হবে না। তথাপি, কুরুক্ষেত্রের মতো পবিত্র ও মহা-ধর্মক্ষেত্রের অপ্রাকৃত প্রভাব নিয়ে তাঁর মন সংশয়ে দোলাচ্ছিল—ভাবছিলেন, এই তীর্থভূমির প্রভাবে কি অধর্মের বিনাশ ও ধর্মাত্মাদের জয় সুনিশ্চিত হবে? ধৃতরাষ্ট্রের এই গভীর উদ্বেগ বুঝতে পেরে চতুর সঞ্জয় তাঁকে সত্যের আভাস দিলেন যে, এই ধর্মক্ষেত্রের কৃপায় অধর্মের পরাজয় সুনিশ্চিত।

পাণ্ডবদের মহতী সৈন্যসজ্জা ছিল বস্তুত ঈশ্বরমুখী ধর্ম ও ন্যায়ের প্রতীক। তা দর্শনমাত্রই রাজসিংহাসনে উপবিষ্ট চতুর রাজনীতিবিদ দুর্যোধনের অন্তঃকরণে প্রচণ্ড ভীতি সঞ্চারিত হলো। নিজের রাজনৈতিক চতুরতার আবরণে তিনি সেই অন্তর্দাহ ঢেকে রাখার চেষ্টা করলেও, মনের ভয় তাড়াতে বাধ্য হয়ে গুরু ও সেনাপতি দ্রোণাচার্যের শরণাপন্ন হলেন। কারণ, যেখানে ধর্মের অধিষ্ঠান এবং স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের কৃপা বিদ্যমান, সেখানে অসুরের ন্যায় যতই চাতুরী থাক না কেন, অধর্মের ভীতিকে কখনো গোপন রাখা যায় না।

সঞ্জয় উবাচ— 

সরল ভাবার্থ: সঞ্জয় বললেন—হে রাজন! সেই সময় পাণ্ডবদের ধর্মভিত্তিক ও সুবিন্যস্ত সৈন্যবাহিনী দর্শন করে, রাজা দুর্যোধন পরম গুরু আচার্য দ্রোণের নিকটে উপস্থিত হয়ে এই বাক্য বললেন।

তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

'তদা' (ঐশ্বরিক সময়ের বার্তা): এই শব্দটির মাধ্যমে সেই মহাসন্ধিক্ষণকে নির্দেশ করা হয়েছে, যখন উভয় পক্ষের বাহিনী সুসজ্জিত এবং ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতিতে ধর্ম ও অধর্মের লড়াই চূড়ান্ত রূপ লাভ করছে।

'তু' (ধর্ম ও অধর্মের বিভাজন): ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ পুত্রস্নেহ ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রশ্নের উত্তরে সঞ্জয় 'তু' শব্দ ব্যবহার করে প্রথমেই অধর্মের প্রতিনিধি দুর্যোধনের বর্তমান মানসিক অবস্থা ও উদ্বেগের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

'দৃষ্ট্বা পাণ্ডবানীকং ব্যূঢ়ম্' (ধর্মের সত্য রূপ ও বল): পাণ্ডবদের বাহিনী ছিল সুসংগঠিত ও ঐক্যে আবদ্ধ, কারণ তাঁদের মূল ভিত্তি ছিল সত্য, ধর্ম এবং স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ধর্ম যেখানে অধিষ্ঠিত, সেখানে অল্প সৈন্য নিয়েও অমিত শক্তির সঞ্চার হয়। পাণ্ডবদের এই ঐশ্বরিক ও নীতিপূর্ণ সৈন্যসজ্জা দেখে অধর্মপরায়ণ দুর্যোধনের মনে প্রভূত ভীতি ও উদ্বেগের সঞ্চার হয়েছিল।

'রাজা দুর্যোধনঃ' (সংসারাসক্তি ও অহংকার): এখানে দুর্যোধনকে 'রাজা' হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে, কারণ ধৃতরাষ্ট্রের মোহগ্রস্ত স্নেহ তাকে বস্তুজগতের রাজ্যভার ও যুবরাজ পদে আসীন করেছিল। সমস্ত অধর্ম ও কুচক্রের কেন্দ্রে থাকা সত্ত্বেও, সাংসারিক রাজনীতির কূট কৌশলে দুর্যোধন ছিলেন অত্যন্ত চতুর।

'আচার্যমুপসঙ্গম্য' (স্বার্থান্বেষী শ্রদ্ধা ও গুরুর শরণাগতি): পরম পূজনীয় পিতামহ ভীষ্ম সর্বাধিনায়ক হওয়া সত্ত্বেও দুর্যোধন কেন দ্রোণাচার্যের কাছে গেলেন? এর পেছনে বেশ কিছু গভীর কারণ রয়েছে:

স্বার্থসিদ্ধি ও মনস্তাত্ত্বিক চাল: আচার্য দ্রোণ যাতে পাণ্ডবদের প্রতি (বিশেষ করে প্রিয় শিষ্য অর্জুনের প্রতি) কোনো কোমলতা প্রদর্শন না করেন এবং কৌরবদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট থাকেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে গিয়েছিলেন।

শিষ্যের সৌজন্য প্রকাশ: পরম গুরু দ্রোণাচার্যের প্রতি বাহ্যিক শ্রদ্ধা ও সম্মান নিবেদন করাটা দুর্যোধনের রাজনীতির অংশ ছিল।

পিতামহ ভীষ্মের প্রতি নিশ্চিতি: দুর্যোধন জানতেন পিতামহ ভীষ্ম প্রবীণ, পরম স্নেহশীল এবং পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ; তাই তাঁকে সন্তুষ্ট রাখা সহজ। কিন্তু আচার্য দ্রোণ ছিলেন শিক্ষাগুরু, যাঁর সাথে রক্তসম্পর্ক ছিল না। মানুষ নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য আত্মীয়ের চেয়ে অনাত্মীয় কিন্তু ক্ষমতাবান গুরুর চাটুকারিতা বেশি করে।

'বচনমব্রবীৎ' (চতুরতা ও প্ররোচনা): এখানে কেবল 'বললেন' না বলে 'বচন বললেন' জোর দিয়ে বলার উদ্দেশ্য হলো—দুর্যোধন সাধারণ কোনো কথা বলেননি। ভীতি আড়াল করতে এবং গুরুর মনে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে ঈর্ষা ও উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলতে তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণ, চতুর ও স্বার্থপূর্ণ শব্দচয়ন করেছিলেন।

অধর্মের পথে চলা মানুষ যতই শক্তিশালী বা চতুর হোক না কেন, ধর্মের প্রভাবে তাদের অন্তঃকরণে সর্বদা এক অন্তর্দাহ ও ভীতি জাগ্রত থাকে।

বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে  বিরাট পর্ব ১১ ভাগে উদ্যোগপর্ব ৪৬ ভাগে  এবং ভীষ্মপর্ব দ্বিতীয় ভাগেসম্পন্ন করেছে।

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: প্রথম অধ্যায় -অর্জুনবিষাদযোগের আলোচনা। 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: প্রথম অধ্যায় (অর্জুনবিষাদযোগ) ১ম শ্লোক পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

 পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আমাদের গল্পগুলো নিয়মিত সবার আগে বিনামূল্যে পেতে এখনই নিচে সাবস্ক্রাইব করুন।

 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি