৩৭তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কর্ণের ভাগ্যলিপি ও কুরুক্ষেত্রের পূর্বাভাস


৩৭তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কর্ণের ভাগ্যলিপি ও কুরুক্ষেত্রের পূর্বাভাস

হস্তিনাপুরের রাজসভায় তখন এক ভারী, আচ্ছন্ন নীরবতা। কুন্তীর মুখ থেকে শ্রীকৃষ্ণের বয়ে আনা বার্তা শোনার পর পিতামহ ভীষ্ম আর আচার্য দ্রোণ স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন, ঝড়ের আর বেশি দেরি নেই। রাজকুমার দুর্যোধনের দিকে চেয়ে ভীষ্মের কণ্ঠস্বরে ফুটে বেরোল গভীর হতাশা, “রাজন! কৃষ্ণ মারফৎ কুন্তী যে বার্তা পাঠিয়েছেন, তা শুধু ধর্মসংগত নয়, অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। তুমি কি তা অনুধাবন করেছ? পাণ্ডবরা এবার কৃষ্ণের পরামর্শেই চলবে। নিজেদের ন্যায্য অধিকার না নিয়ে তারা ছাড়বে না। সন্ধি করবে না কি যুদ্ধ—এই সিদ্ধান্ত এখন পুরোপুরি তোমার হাতে।”

দুর্যোধন কোনো উত্তর দিলেন না। অপমানে ও বিষাদে তাঁর মুখ অবনত হলো, কপালে ফুটে উঠল কঠিন কুঞ্চন। ভীষ্ম তখন দ্রোণের দিকে ফিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “যে যুধিষ্ঠির কোনোদিন কারো প্রতি ঈর্ষা রাখেনি, সর্বদা গুরুজনদের সেবা করেছে, আজ তার বিরুদ্ধেই আমাদের অস্ত্র ধরতে হবে! এর চেয়ে বড় অভিশাপ আর কী হতে পারে?” দ্রোণাচার্যও যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি যোগ করলেন, “আমার নিজের পুত্র অশ্বত্থামার চেয়েও অর্জুন আমার প্রিয়। আজ তাকেই হত্যা করতে আমায় ধনুর্ধারণ করতে হবে। ধিক এই ক্ষাত্রধর্মকে!”

দুর্যোধনকে উদ্দেশ্য করে আচার্য আবার বললেন, “পিতামহ, বিদুর, শ্রীকৃষ্ণ এবং আমি—কেউই তোমাকে বোঝাতে পারলাম না। আমাদের বয়স শেষ হয়ে এসেছে, জীবনের যা করণীয় তা আমরা করে ফেলেছি। কিন্তু এই অহংকারের যুদ্ধে তোমার সুখ, রাজ্য, অর্থ আর মিত্র—সব ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। এখনো সময় আছে, বীর পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি করো। কুরুকুলকে বিনাশের হাত থেকে বাঁচাও।”

কিন্তু দুর্যোধন নীরব রইলেন। অনমনীয়, জেদী ও স্তম্ভিত।

হস্তিনাপুরের রাজসভা থেকে বেরিয়ে শ্রীকৃষ্ণ রথে তুলে নিলেন রাধেয় কর্ণকে। নগরীর সীমানা পেরিয়ে নির্জন পথে রথ চলার সময় কৃষ্ণের কণ্ঠে ঝরে পড়ল মৃদু অথচ গভীর এক গোপনীয় সত্য।

“কর্ণ,” কৃষ্ণ বললেন, “তুমি বেদজ্ঞ, ধর্মবেত্তা। কিন্তু আজ তোমাকে এমন এক সত্য বলছি যা তুমি জানতে না। কুন্তী দেবী তাঁর কুমারী অবস্থায় তোমায় গর্ভে ধারণ করেছিলেন। শাস্ত্র ও ধর্মানুসারে তুমি পাণ্ডুপুত্রদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। এই রাজসিংহাসনের আসল দাবিদার তুমিই, যুধিষ্ঠির নয়।”

কৃষ্ণের প্রস্তাব ছিল অত্যন্ত প্রলুব্ধকর—যদি কর্ণ পাণ্ডবপক্ষে যোগ দেন, তবে যুধিষ্ঠির তাঁর অনুগত হয়ে চামর দোলাবেন, ভীম ধরবেন শ্বেতছত্র, আর অর্জুন হবেন তাঁর রথসারথি। পঞ্চপাণ্ডব, দ্রৌপদীর পুত্রগণ এবং সমস্ত যাদবকুল কর্ণের চরণবন্দেজি করবে। ধৌম্য মুনি আজই তাঁর রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন করবেন।

কর্ণ স্থির হয়ে শুনলেন। তারপর এক মলিন, আত্মমর্যাদাপূর্ণ হাসি ফুটল তাঁর মুখে।

“কেশব, আপনার এই স্নেহের কথা আমি অস্বীকার করি না,” কর্ণ ধীরে ধীরে বললেন। “আমি জানি ধর্মানুসারে আমি পাণ্ডুরই পুত্র। কিন্তু জন্ম দেওয়ার পরই তো মাতা কুন্তী আমায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। আমাকে তুলে নিয়ে লালন-পালন করেছেন সূত অধিরথ আর মাতা রাধা। পরম স্নেহে যিনি আমার মলমূত্র পরিষ্কার করে বড় করেছেন, আজ সাম্রাজ্যের লোভে আমি কীভাবে তাঁর পিণ্ডলোপ করি? কীভাবে অধিরথকে পিতা ভাবা বন্ধ করি?”

কর্ণের কণ্ঠস্বর আরও শক্ত হয়ে উঠল, “আজ দুর্যোধন আমাকে ভরসা করেই এই মহাসংগ্রামের ঝুঁকি নিয়েছে। অর্জুনের মুখোমুখি হওয়ার দায়িত্ব সে আমার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। আজ ভয়, লোভ বা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও আমি দুর্যোধনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না। তবে কেশব, আমাদের এই কথোপকথন যেন গোপন থাকে। যুধিষ্ঠির অত্যন্ত ধর্মাত্মা; তিনি যদি জানেন আমি তাঁর জ্যেষ্ঠ, তবে তিনি আমাকেই রাজ্য দিয়ে দেবেন। আর আমি সেই রাজ্য পাওয়ার পর তা তুলে দেব দুর্যোধনকেই। তাই এই রাজ্যশাসনের ভার ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের হাতেই থাক।”

এক অদ্ভুত সমর্পণে কর্ণ ভবিষ্যৎবাণী করলেন কুরুক্ষেত্রের মহাবিনাশের। ভীমের হাতে দুঃশাসনের রক্তপান, ধৃষ্টদ্যুম্নের হাতে দ্রোণবধ এবং ভীমের গদাঘাতে দুর্যোধনের পতনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে কর্ণ বললেন, “এই যুদ্ধ বস্তুত এক রণযজ্ঞ, কেশব। কুরুক্ষেত্র হবে সেই পবিত্র ভূমি, যেখানে ক্ষাত্রধর্ম পালন করে সমস্ত বীর স্বর্গলাভ করবেন। আপনি অর্জুনকে প্রস্তুত হতে বলুন।”

শ্রীকৃষ্ণ মৃদু হেসে বললেন, “তবে তাই হোক কর্ণ। প্রলয় যখন সুনিশ্চিত, তখন অন্যায়কেই মানুষ ন্যায় বলে ভুল করে। আজ থেকে সপ্তম দিনে অমাবস্যা, সেই দিনই কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ শুরু হোক। তুমি ভীষ্ম, দ্রোণ ও কৃপাচার্যকে এই কথা জানিয়ে দিও।”

কর্ণ রথ থেকে নামার আগে কৃষ্ণকে গাঢ় আলিঙ্গন করলেন। তাঁর চোখে তখন এক বিষাদময় দীপ্তি। “কেশব, এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে যদি বেঁচে থাকি, তবে আবার দেখা হবে। নতুবা পরলোকে।”

রথ থেকে নেমে কর্ণ নিজের সুবর্ণমণ্ডিত রথে চেপে ফিরে গেলেন হস্তিনাপুরে। আর শ্রীকৃষ্ণ সাত্যকিকে নিয়ে দ্রুতগতিতে রথ ছোটালেন পাণ্ডব শিবিরের উদ্দেশ্যে—এক অনিবার্য মহাবিনাশের দিন গণনা শুরু করতে।

বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে। 

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ৩৭তম ভাগের আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।

উদ্যোগপর্বের ৩৬তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

 পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি