শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: ১ম অধ্যায়- ৯ম থেকে ১০ম শ্লোক বিষাদযোগ
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: ১ম অধ্যায়- ৯ম থেকে ১০ম শ্লোক বিষাদযোগ
नानाशस्त्रप्रहरणा: सर्वे युद्धविशारदा: ॥ ९ ॥
অন্যে চ বহবঃ শূরা মদর্থে নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্বে ত্যক্তজীবিতাঃ । যুদ্ধবিশারদাঃ ॥ ৯ ॥
যুদ্ধবিদ্যায় সুনিপুণ আরও অনেক বীর রয়েছেন, যাঁরা নানাবিধ অস্ত্র ও শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আমার জন্য নিজেদের জীবন বাজি রেখেছেন।
'অন্যে চ বহবঃ শূরা মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ'—উপরে উল্লিখিত বীরগণ ছাড়াও আমাদের সেনাবাহিনীতে বাহ্লীক, শল্য, ভগদত্ত, জয়দ্রথ প্রমুখ অনেক মহান রথী বীর রয়েছেন, যাঁরা আমার জন্য জীবন উৎসর্গ করে এখানে যুদ্ধ করতে এসেছেন। যুদ্ধে তাঁরা হয়তো নিহত হতে পারেন, কিন্তু তাঁরা কখনোই রণক্ষেত্র ত্যাগ করবেন না। আপনার সামনে আমি কীভাবে তাঁদের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব?
'নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্বে যুদ্ধ-
বিশারদাঃ'—এই সকল বীরই খড়্গ, গদা, ত্রিশূল এবং তীর ও তোমর (বর্শা) জাতীয় অস্ত্র ও শস্ত্র পরিচালনায় অত্যন্ত দক্ষ। তাঁরা সর্বতোভাবে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী।
দ্রোণাচার্যের বিষয়ে দুর্যোধন যখন কোনো কৌশল খাটাতে পারলেন না, তখন তাঁর মনে অন্য একটি চিন্তার উদয় হলো। সঞ্জয় পরবর্তী শ্লোকে সেই চিন্তার কথাই বর্ণনা করেছেন।
अपर्याप्तं तदस्माकं बलं भीष्माभिरक्षितम् ।
पर्याप्तं त्विदमेतेषां बलं भीमाभिरक्षितम् ॥ १० ॥
অপর্যাপ্তং তদস্মাকং বলং ভীষ্মাভিরক্ষিতম্ । পর্যাপ্তং त्विदमेतेषां बलं भीमाभिरक्षितम् ॥ ১০৷
আমাদের সৈন্যবাহিনী স্বল্প এবং সহজেই জয় করা সম্ভব, কারণ এর রক্ষক হলেন ভীষ্ম (যিনি উভয় পক্ষেরই হিতাকাঙ্ক্ষী)। কিন্তু ভীম-পরিচালিত তাদের সৈন্যবাহিনী অপরাজেয় (কারণ ভীম কেবল নিজের পক্ষের প্রতিই পক্ষপাতী)।
'অপৰ্যাপ্তং তদস্মাকং বলং ভীষ্মাভিরক্ষিতম্'—দুর্যোধন তাঁর নিজের সেনাবাহিনীর কথা ভেবে বলছেন, "পাণ্ডবদের তুলনায় আমাদের সেনাবাহিনী সংখ্যায় অনেক বড় হলেও তা সহজেই পরাজিত হতে পারে; কারণ আমাদের সেনাবাহিনী বিশৃঙ্খল, অসংযত, অনৈক্যপূর্ণ ও ভীরু প্রকৃতির। অন্যদিকে পাণ্ডবদের সেনাবাহিনী সুসংহত, সুশৃঙ্খল, ঐক্যবদ্ধ ও নির্ভীক। আমাদের সেনাবাহিনীর প্রধান রক্ষক হলেন ভীষ্ম, যিনি উভয় পক্ষেরই মিত্র। তিনি কৃষ্ণের পরম ভক্ত। তাঁর হৃদয়ে যুধিষ্ঠিরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং অর্জুনের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা রয়েছে। তাই বাহ্যিকভাবে তিনি আমাদের পক্ষে থাকলেও, অন্তরে তিনি পাণ্ডবদেরই শুভাকাঙ্ক্ষী। তিনিই আমাদের সেনাবাহিনীর সেনাপতি। এমতাবস্থায় আমাদের সেনাবাহিনী কীভাবে পাণ্ডবদের ওপর জয়লাভ করতে পারে? 'পর্যাপ্তং ত্বিদমেতেষাং বলং ভীমাভিরক্ষিতম্'—কিন্তু পাণ্ডবদের এই সেনাবাহিনী আমাদের বাহিনীকে সহজেই পরাজিত করতে পারে, কারণ তাদের সকল যোদ্ধা কোনো মতভেদ ছাড়াই ঐক্যবদ্ধ। তাদের সেনাবাহিনীর রক্ষক হলেন ভীম, যিনি অত্যন্ত সাহসী এবং শৈশব থেকেই আমাকে পরাজিত করে আসছেন। তিনি আমাকেসহ একশ ভাইকে হত্যা করার প্রতিজ্ঞা করেছেন এবং আমাদের বিনাশে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। তাঁর শরীর বজ্রের মতো কঠিন। আমি তাঁকে বিষ প্রয়োগ করেছিলাম, কিন্তু তাতেও তাঁর মৃত্যু হয়নি। ভীমের মতো রক্ষক থাকায় পাণ্ডবদের সেনাবাহিনী নিশ্চিতভাবেই আমাদের বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম।"
এখানে একটি সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে যে, দুর্যোধন নিজের সেনাবাহিনীর রক্ষক হিসেবে সেনাপতি ভীষ্মের নাম উল্লেখ করেছেন, কিন্তু পাণ্ডবদের সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে তিনি ভীমের নাম নিয়েছেন—যিনি তাদের সেনাপতি ছিলেন না। এর উত্তর হলো, সেই মুহূর্তে দুর্যোধন সেনাপতিদের কথা ভাবছিলেন না, বরং দুই সেনাবাহিনীর শক্তির কথা বিবেচনা করছিলেন। দুর্যোধন ভীমের শক্তিতে গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন, তাই তিনি পাণ্ডবদের সেনাবাহিনীর রক্ষক হিসেবে ভীমের নাম উল্লেখ করেছেন।
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে বিরাট পর্ব ১১ ভাগে উদ্যোগপর্ব ৪৬ ভাগে এবং ভীষ্মপর্ব দ্বিতীয় ভাগেসম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: প্রথম অধ্যায় -অর্জুনবিষাদযোগের আলোচনা।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: প্রথম অধ্যায় (অর্জুনবিষাদযোগ) ৮ম শ্লোক পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আমাদের গল্পগুলো নিয়মিত সবার আগে বিনামূল্যে পেতে এখনই নিচে সাবস্ক্রাইব করুন।
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment