ষষ্ঠ ভাগ উদ্যোগপর্ব-(বিদুর নীতি-দ্বিতীয় অধ্যায়)আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটা রাজা: বিদুরের রাত্রিভাষণ


 ষষ্ঠ ভাগ উদ্যোগপর্ব-(বিদুর নীতি-দ্বিতীয় অধ্যায়)আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটা রাজা: বিদুরের রাত্রিভাষণ

রাত অনেক হয়েছে। হস্তিনাপুরের প্রাসাদে তখন শুধু একটা প্রদীপ জ্বলছে, আর তার আলোয় দুটো মুখ—একজন অন্ধ, আরেকজন প্রজ্ঞাবান। ধৃতরাষ্ট্র সেদিন নিজের ভেতরের অন্ধকারটাকেও যেন ছুঁয়ে দেখছিলেন। বললেন, "বিদুর, আমি যেন এক চিতার আগুনে পুড়ছি, তবু বেঁচে আছি। বলো তো, আমার এখন কী করা উচিত? তুমি তো ধর্ম আর রাজনীতি দুটোই বোঝো। যা যুধিষ্ঠিরের ভালো, আবার দুর্যোধনেরও যাতে মঙ্গল হয়—সেই পথটা আমাকে দেখাও। আমার মন কু ডাকছে, বিদুর। চারদিকে শুধু বিপদের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। যুধিষ্ঠির আসলে কী চান, আমাকে খুলে বলো।"

বি:দ্র: বিদুরের জন্ম কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন 

বিদুর একটু চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, যেন কথাগুলো অনেকদিন ধরে তাঁর ভেতরে জমে ছিল।

"মহারাজ, একটা মানুষ যদি সত্যিই চায় না যে তার আপনজন হারুক, তাহলে তাকে না জিজ্ঞেস করলেও ভালো-মন্দ যা বলার, বলে দেওয়া উচিত। তাই আজ আমি আপনাকে সেই কথাই বলব, যাতে কৌরবদের সবার ভালো হয়। একটু ধৈর্য ধরে শুনবেন।

"ছলনা করে, অসৎ পথে কোনো কাজ সিদ্ধ হলে তাকে কখনো প্রশ্রয় দেবেন না। আবার উল্টোটাও সত্যি—সৎ পথে, সাবধানে কোনো কাজ করেও যদি তা সফল না হয়, তাহলে সেজন্য মন খারাপ করে বসে থাকাটাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কোনো কাজ শুরু করার আগে বুঝে নিতে হয়, আসলে তার দরকারটা কী। তাড়াহুড়ো করে কিছু করা চলবে না। ধৈর্য ধরে ভাবতে হবে—কাজটার প্রয়োজন কী, তার ফল কী হবে, আর তাতে নিজের কতটা উন্নতি হবে। যে রাজা নিজের অবস্থান, লাভ-ক্ষতি, ধনভাণ্ডার, রাজ্যের অবস্থা, শাস্তিবিধান—এসবের মাত্রা বোঝেন, তাঁর রাজত্ব টিকে যায়। যিনি এসব বিষয়ে সত্যিকারের জ্ঞান রাখেন, ধর্ম আর অর্থনীতিতে যিনি দক্ষ, রাজ্য তো তাঁরই প্রাপ্য।

"আর একটা কথা মনে রাখবেন—'এখন তো রাজা হয়েই গেছি' ভেবে বেপরোয়া হয়ে গেলে চলবে না। উচ্ছৃঙ্খলতা সম্পদকে তেমনিভাবে খেয়ে ফেলে, যেমন বার্ধক্য খেয়ে ফেলে রূপ। মাছ যেমন ভালো খাবারের লোভে বঁড়শি গিলে ফেলে, পরিণতির কথা না ভেবেই—তেমনি লোভে পড়ে মানুষও সর্বনাশ ডেকে আনে। তাই যে নিজের ভালো চায়, তার উচিত এমন জিনিসই নেওয়া, যা সত্যিই গ্রহণযোগ্য আর মঙ্গলজনক।

"গাছ থেকে যে কাঁচা ফল পাড়ে, সে শুধু ফলের রসটাই মাটি করে না—বীজটাকেও নষ্ট করে দেয়। কিন্তু যে অপেক্ষা করে, পাকা ফল তোলে, সে ফলের স্বাদও পায়, আবার সেই বীজ থেকে নতুন গাছও জন্মায়। মৌমাছি যেমন ফুলকে ব্যথা না দিয়েই মধু নিয়ে যায়, রাজারও উচিত প্রজাদের কষ্ট না দিয়ে রাজস্ব আদায় করা। মালী বাগানের ফুল একটা একটা করে তোলে, কিন্তু গাছের শিকড়ে হাত দেয় না—রাজারও তেমনি প্রজাদের রক্ষা করেই কর নেওয়া উচিত। কোন কাজে শেষ পর্যন্ত লাভ, কোনটায় ক্ষতি—এই হিসেব কষেই এগোতে হয়। এমন অনেক কাজ আছে যার আসলে কোনো ফলই নেই, তাই সেই কাজে পরিশ্রম করাটাই বৃথা। যে রাজার প্রসন্নতায় কিছু হয় না, রাগেও কিছু হয় না, প্রজারা তাঁকে চায় না—ঠিক যেমন কোনো নারী নপুংসককে স্বামী হিসেবে চায় না। যে কাজের শুরুটা ছোট, কিন্তু ফল বিশাল—বুদ্ধিমান মানুষ সেই কাজ দেরি না করেই শুরু করে দেয়, তাতে কোনো বাধা আসতে দেয় না।

"যে রাজার চোখেই স্নেহ ঝরে পড়ে, তিনি মুখে কিছু না বললেও প্রজারা তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়। সম্পদ অনেক থাকলেও অতিরিক্ত দানশীল হওয়া ঠিক নয়। আর দানশীল হলেও সবসময় নিজের গাম্ভীর্য বজায় রাখতে হয়। রাজা দুর্বল হলেও নিজেকে শক্তিশালী বলে জাহির করতে হয়—তাহলে তিনি ধ্বংস হন না। যে রাজা চোখ, মন, কথা আর কাজ—এই চারটে দিয়ে প্রজাদের সন্তুষ্ট রাখেন, প্রজারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। হরিণ যেমন শিকারিকে ভয় পায়, তেমনি যাঁকে দেখে সব প্রাণী ভয় পায়, তিনি সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত রাজ্যের রাজা হলেও প্রজারা তাঁকে মন থেকে গ্রহণ করে না।

"বাবা-ঠাকুরদার রাজ্য পেয়েও যে রাজা অন্যায় করেন, তিনি সেই রাজ্যকে সেভাবেই ধ্বংস করেন, যেমন প্রবল ঝড় মেঘকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কিন্তু যে রাজা পূর্বপুরুষের দেখানো ধর্মপথে চলেন, তাঁর রাজ্য ধনে-ধান্যে পূর্ণ হয়ে ওঠে, উন্নতির চূড়ায় পৌঁছয়। আর যে রাজা ধর্ম ছেড়ে অধর্মের পথ ধরেন, তাঁর রাজ্য আগুনের ওপর রাখা চামড়ার মতো কুঁচকে যায়, শুকিয়ে যায়।

"অন্য রাজ্য ধ্বংস করার যে চেষ্টা, সেই একই চেষ্টা নিজের রাজ্যকে বাঁচাতে আর বড় করতে ব্যয় করা উচিত। ধর্মের পথে রাজ্য পেলে, ধর্মের পথেই তা রক্ষা করতে হয়। কারণ ধর্মের হাত ধরে যে রাজলক্ষ্মী আসেন, রাজা তাঁকে ছাড়েন না, তিনিও রাজাকে ছেড়ে যান না।

"আরেকটা কথা বলি, মহারাজ। যারা অকারণে বকবক করে, এলোমেলো কথা বলে যায়, এমনকি পাগলও—তাদের কথার মধ্যেও মাঝেমাঝে খনির পাথরের ভেতর সোনার মতো একটা সারকথা লুকিয়ে থাকে। যেমন ভিক্ষুক একটা একটা করে দানার শিষ কুড়িয়ে নেয়, তেমনি ধৈর্যশীল মানুষেরও উচিত এখান-ওখান থেকে ভালো কথা, ভালো কাজ কুড়িয়ে নেওয়া। গরু চেনে গন্ধে, ব্রাহ্মণ চেনেন বেদে, রাজা চেনেন গুপ্তচরের চোখে, আর সাধারণ মানুষ চেনে নিজের চোখেই।

"যে গাই দুধ দিতে গিয়ে অনেক কষ্ট দেয়, তাকে বারবার কষ্ট সহ্য করতে হয়। কিন্তু সহজে দোহন করা যায় যাকে, তার কষ্ট কম। যে ধাতু আগুনে না ঢুকিয়েই বেঁকে যায়, তাকে কেউ জোর করে আগুনে দেয় না। যে কাঠ এমনিতেই বাঁকা, তাকে কেউ আর বাঁকাতে চায় না। এই দৃষ্টান্ত মনে রেখেই বুদ্ধিমান মানুষের উচিত শক্তিশালীর সামনে মাথা নত করা। যে বলবানের সামনে নত হয়, সে যেন ইন্দ্রকেই প্রণাম করছে।

"পশুদের আশ্রয় মেঘ, রাজার আশ্রয় মন্ত্রী, নারীর আশ্রয় স্বামী, আর ব্রাহ্মণের আশ্রয় বেদ। সত্য দিয়ে ধর্ম টিকে থাকে, অভ্যাস দিয়ে বিদ্যা টিকে থাকে, পরিচ্ছন্নতা দিয়ে রূপ টিকে থাকে, আর সদাচার দিয়ে কুল টিকে থাকে। শস্য বাঁচে ওজন করে রাখলে, ঘোড়া বাঁচে দৌড় করালে, গরু বাঁচে যত্ন নিলে, আর নারী বাঁচে... না, এখানে একটা কথা আছে যেটা আজকের দিনে অচল, তাই এড়িয়ে যাই। শুধু এইটুকু বলি—উঁচু বংশে জন্ম নিলেই কেউ শ্রেষ্ঠ হয়ে যায় না, যদি না তার আচরণ ভালো হয়। নিচু বংশে জন্মেও সদাচারী মানুষ শ্রেষ্ঠত্ব পায়।

"যে মানুষ অন্যের ধন, রূপ, শক্তি, বংশমর্যাদা, সুখ আর সম্মান দেখে হিংসায় জ্বলে, তার কপালে দুঃখ ছাড়া কিছু নেই। যা করা উচিত নয় তা করে ফেললে, যা করা উচিত তা করতে ভুল করলে, আর কাজ সম্পূর্ণ হবার আগেই গোপন কথা ফাঁস হয়ে গেলে—এই তিন জায়গায় সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হয়। যা নেশার জোগান দেয়, তা এড়িয়ে চলাই ভালো। বিদ্যার অহংকার, অর্থের অহংকার, আর উঁচু বংশের অহংকার—এই তিনটে বড় সাংঘাতিক নেশা। অহংকারী মানুষের কাছে এগুলো মদের মতো, কিন্তু সজ্জন মানুষের কাছে এই তিনটেই আত্মসংযমের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

"একটা মজার কথা বলি—দুষ্ট মানুষ নিজেকে দুষ্ট জেনেও ভালো মানুষের সামনে নিজেকে ভালো বলে জাহির করে। ভালো মানুষ ভালো মানুষকে সাহায্য করে, এমনকি দুষ্টকেও সাহায্য করে—কিন্তু দুষ্ট মানুষ কখনো ভালো মানুষের সহায় হয় না। আসলে চরিত্রটাই সবচেয়ে বড় কথা। যার চরিত্র নষ্ট হয়ে গেছে, এই পৃথিবীতে তার জীবন, ধন, বন্ধু—কিছু দিয়েই আর কোনো লাভ হয় না।

"ভরতশ্রেষ্ঠ, একটা মজার পর্যবেক্ষণ শুনুন—ধনী মানুষের পাতে মাংস থাকে, মধ্যবিত্তের পাতে দুধ-দই, আর গরিবের পাতে তেল। অথচ সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার খায় গরিবরাই, কারণ ক্ষুধাই তো আসল স্বাদের জননী। ধনীদের কাছে সেই ক্ষুধাটাই দুর্লভ। মহারাজ, এই পৃথিবীতে ধনীদের প্রায়ই খাবার হজম করার ক্ষমতা থাকে না, অথচ গরিব মানুষ কাঠও হজম করে ফেলতে পারে। নিচু স্তরের মানুষ জীবিকা হারানোর ভয় পায়, মধ্যবিত্ত মৃত্যুকে ভয় পায়, আর উঁচু স্তরের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় অপমানকে। মদ তো নেশা বটেই, কিন্তু ঐশ্বর্যের নেশা সবচেয়ে ভয়ংকর—কারণ ঐশ্বর্যের অহংকারে মত্ত মানুষ সহজে সঠিক পথে ফিরে আসতে পারে না।

"যে মানুষ তার পাঁচটা ইন্দ্রিয়কে জয় করতে পারে, তার ভাগ্য শুক্লপক্ষের চাঁদের মতো দিনে দিনে বেড়ে ওঠে। কিন্তু নিজের মন আর ইন্দ্রিয়কে জয় না করে যে মন্ত্রীদের বশে আনতে চায়, মন্ত্রীদের বশে না এনে যে শত্রুকে জয় করতে চায়—সেই ব্যর্থ মানুষকে সবাই একসময় ছেড়ে চলে যায়। যিনি প্রথমে নিজের মন আর ইন্দ্রিয়কেই শত্রু ভেবে জয় করেন, তারপর মন্ত্রী বা শত্রুর দিকে হাত বাড়ান, তিনিই সফল হন সহজে। যিনি ইন্দ্রিয় আর মনকে জয় করেন, অপরাধীকে যথাযথ শাস্তি দেন, আর ভেবেচিন্তে কাজ করেন—লক্ষ্মী তাঁর সহায় হন।

"রাজন, একটা ছবি মনে করুন—মানুষের শরীর একটা রথ, বুদ্ধি তার সারথি, আর ইন্দ্রিয়গুলো তার ঘোড়া। যে সতর্ক আর বুদ্ধিমান মানুষ এই ঘোড়াগুলোকে বশে রাখতে পারে, সে নির্বিঘ্নে যাত্রা করে সুখে। যেমন প্রশিক্ষণহীন ঘোড়া অদক্ষ সারথিকে পথেই আছাড় দিয়ে মেরে ফেলে, তেমনি ইন্দ্রিয় বশে না থাকলে মানুষও অকালে মৃত্যুর মুখে পড়ে। ইন্দ্রিয় বশে না থাকলে মূর্খ মানুষ ভালোকে মন্দ ভাবে, মন্দকে ভালো ভাবে, আর চরম দুঃখকেও সুখ মনে করে বসে থাকে। যে ধর্ম আর অর্থ ছেড়ে ইন্দ্রিয়ের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়, সে খুব তাড়াতাড়ি নিজের ঐশ্বর্য, প্রাণ, ধন আর স্ত্রী—সব হারায়। যে প্রচুর ধনের মালিক হয়েও ইন্দ্রিয়কে বশে রাখতে পারে না, তার সেই ঐশ্বর্যও একদিন হাত ফসকে যায়।

"তাই মন, বুদ্ধি আর ইন্দ্রিয়—এই তিনটেকে বশে রেখে নিজের ভেতরের আসল সত্তাকে চেনার চেষ্টা করা উচিত। কারণ নিজের আত্মাই নিজের সবচেয়ে বড় বন্ধু, আবার নিজের আত্মাই নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু। যিনি নিজেকে জয় করেছেন, তাঁর আত্মাই তাঁর প্রকৃত বন্ধু হয়ে ওঠে। মহারাজ, সূক্ষ্ম ছিদ্রওয়ালা জালেও যেমন বড় মাছ জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়, তেমনি কাম আর ক্রোধ একসঙ্গে এসে জ্ঞানকে ঢেকে দেয়। যিনি ধর্ম আর অর্থ বিচার করে জীবনের সামগ্রী জোগাড় করেন, তিনি সবসময় সুখী আর সমৃদ্ধ থাকেন। কিন্তু যিনি নিজের মনের ভেতরের এই পাঁচ শত্রুকে—অর্থাৎ পাঁচ ইন্দ্রিয়কে—জয় না করে বাইরের শত্রুকে হারাতে চান, শত্রুরাই শেষে তাঁকে হারিয়ে দেয়। ইন্দ্রিয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় অনেক বড় বড় সাধু আর রাজাও ভোগবিলাসে ডুবে থাকেন।

"দুষ্ট মানুষের সঙ্গ না ছেড়ে তার সাথে মিশে থাকলে নিরপরাধ ভালো মানুষও একই শাস্তি পান—যেমন শুকনো কাঠের পাশে থাকলে ভেজা কাঠও পুড়ে যায়। তাই দুষ্ট মানুষের সঙ্গ কখনো রাখবেন না। যে মানুষ মোহবশত পাঁচটা বিষয় আর পাঁচটা ইন্দ্রিয়কে বশে আনতে পারে না, বিপদ তাকে গ্রাস করে নেয়। কারো গুণে দোষ খুঁজতে যাবেন না—সরলতা, পবিত্রতা, সন্তোষ, মিষ্টি কথা, ইন্দ্রিয় সংযম, সত্যবাদিতা, স্থৈর্য—এই গুণগুলো দুষ্ট মানুষের মধ্যে কখনো থাকে না। আত্মজ্ঞান, শান্ত মন, সহনশীলতা, ধর্মপরায়ণতা, কথা রাখা, আর দান করা—এসবও দুরাত্মাদের মধ্যে খুঁজে পাবেন না।

"মূর্খ মানুষ পণ্ডিতদের গালাগাল দিয়ে, নিন্দা করে কষ্ট দেয়। যে গালি দেয় সে পাপের ভাগী হয়, আর যে ক্ষমা করে সে পাপ থেকে মুক্তি পায়। দুষ্ট মানুষের শক্তি হিংসা, রাজার শক্তি শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা, নারীর শক্তি সেবা, আর গুণী মানুষের শক্তি ক্ষমা। রাজন, কথা পুরোপুরি সংযত রাখা খুব কঠিন কাজ, কিন্তু অর্থপূর্ণ, মনোমুগ্ধকর কথাও বেশি বলা যায় না। মিষ্টি কথা অনেক কল্যাণ করে, কিন্তু সেই একই কথা যদি কর্কশভাবে বলা হয়, তাহলে তা মহা অনর্থের কারণ হয়ে ওঠে।

"তীরবিদ্ধ পশু সেরে ওঠে, কুড়ুল দিয়ে কাটা বনও আবার সবুজ হয়ে ওঠে—কিন্তু কর্কশ কথার ক্ষত কখনো সারে না। শরীর থেকে তীর তুলে ফেলা যায়, কিন্তু কর্কশ কথার কাঁটা মন থেকে তুলে ফেলা যায় না, কারণ সেটা হৃদয়ে গেঁথে থাকে চিরকাল। মুখ থেকে বেরোনো কথা যখন তীরের মতো অন্যের মর্মে গিয়ে বেঁধে, তখন সেই মানুষ দিনরাত সেই দুঃখ বয়ে বেড়ায়। তাই জ্ঞানী মানুষের উচিত কখনো এমন ব্যবহার না করা।

"দেবতারা যাকে হারাতে চান, তাঁরা আগে তার বুদ্ধিটাই কেড়ে নেন। তখন সেই মানুষ শুধু নীচ কাজের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। ধ্বংসের সময় ঘনিয়ে এলে বুদ্ধি ঘোলাটে হয়ে যায়, তখন অন্যায়কেও ন্যায় বলে মনে হতে থাকে।

"ভরতশ্রেষ্ঠ, আপনার ছেলেদেরও বুদ্ধি এভাবেই নষ্ট হয়ে গেছে। পাণ্ডবদের সাথে আপনার বিরোধের কারণে আপনি নিজের ছেলেদের কুমতলবটাও ঠিকমতো ধরতে পারছেন না। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, যাঁর মধ্যে রাজলক্ষণ আছে, যিনি তিন ভুবনেরও রাজা হতে পারতেন, সেই যুধিষ্ঠির আজও আপনার আদেশ মেনে চলেন—তিনি এই পুরো পৃথিবী শাসন করার যোগ্য। তিনি ধর্ম আর অর্থের তত্ত্ব জানেন, তেজ আর বুদ্ধি দুটোই তাঁর আছে, সৌভাগ্যও তাঁর পূর্ণ—আপনার সব ছেলের চেয়ে তিনি সবদিক থেকে শ্রেষ্ঠ। রাজেন্দ্র, ধর্মধারীদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ, সেই যুধিষ্ঠির শুধু দয়া আর ভদ্রতাবশতই এতদিন সব কষ্ট সহ্য করে চলেছেন—আপনার প্রতি সৌজন্য দেখিয়ে।"

প্রদীপের শিখাটা তখনও কাঁপছিল। ধৃতরাষ্ট্র চুপ করে বসে রইলেন—দেখার চোখ নেই তাঁর, কিন্তু বিদুরের প্রতিটা কথা যেন তাঁর বুকের ভেতর একটা করে আয়না ধরে দিচ্ছিল। রাত তখনও অনেক বাকি।

বি:দ্র: পাঠকদের সুবিধার্থে উপরিউক্ত অংশটি মহাভারতের 'উদ্যোগ পর্ব'-এর অন্তর্গত বিখ্যাত বিদুর নীতি-র দ্বিতীয় অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ। নিচে মূল বিষয়গুলোকে সহজ ও প্রাঞ্জল ভাবে তুলে ধরা হলো:

১. রাজধর্ম ও রাজ্য পরিচালন নীতি

উপযুক্ত বিচার ও কর্মসূচনা: কোনো কাজ শুরু করার আগে তার প্রয়োজন, পরিণতি এবং লাভ-ক্ষতির পূর্ণ হিসাব করা বুদ্ধিমানের কাজ। অসৎ বা ছলনার মাধ্যমে অর্জিত সাফল্য স্থায়ী হয় না।

প্রজাপালন ও কর ব্যবস্থা: মৌমাছি যেমন ফুলকে না ফুটিয়ে মধু নেয় বা মালী যেমন গাছের শিকড় না কেটে শুধু ফুল তোলে, রাজার উচিত প্রজাদের কষ্ট না দিয়ে ন্যায়সঙ্গত রাজস্ব আদায় করা।

দূরদর্শিতা ও ধৈর্য: কাঁচা ফল পাড়লে রস ও বীজ দুটোই নষ্ট হয়; অপেক্ষা করে পাকা ফল তুললে তার আসল স্বাদ পাওয়া যায়। রাজ্য পরিচালনায় তাড়াহুড়ো না করে ধৈর্যের সাথে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

রাজার আচরণ ও ব্যক্তিত্ব: রাজার চোখ ও বাণীতে প্রজা-স্নেহ থাকা দরকার। শক্তি না থাকলেও সাময়িক কৌশল হিসেবে নিজেকে শক্তিশালী জাহির করা এবং চোখ, মন, কথা ও কাজ—এই চার উপায়ে প্রজাদের সন্তুষ্ট রাখা আবশ্যক।

২. আত্মসংযম ও ইন্দ্রিয়জয়

নিজের মন ও ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ: মানুষের শরীর একটি রথ, বুদ্ধি তার সারথি এবং ইন্দ্রিয়গুলো হলো ঘোড়া। যে রাজা বা ব্যক্তি নিজের ইন্দ্রিয় ও মনকে বশে রাখতে পারেন না, তিনি অকালে ধ্বংস হন।

 প্রকৃত শত্রু ও বন্ধু: মানুষের নিজের আত্মাই তার সবচেয়ে বড় বন্ধু, আবার সেই আত্মাই সবচেয়ে বড় শত্রু। বাইরের শত্রুকে জয় করার আগে ভেতরের কাম, ক্রোধ ও ইন্দ্রিয়রূপী শত্রুকে পরাস্ত করা জরুরি।

অহংকার ও আসক্তি ত্যাগ: বিদ্যা, অর্থ এবং উচ্চ বংশের অহংকার মানুষকে অন্ধ করে দেয়। অহংকারী মানুষের কাছে এগুলো মদের মতো ধ্বংসাত্মক, কিন্তু সজ্জনের কাছে তা আত্মসংযমের মাধ্যম।

৩. বাক্যসংযম ও মিষ্টি ভাষার গুরুত্ব

 কর্কশ কথার প্রভাব: অস্ত্র বা তীরের আঘাত একসময় শুকিয়ে যায়, কুড়ুল দিয়ে কাটা বনও আবার সবুজ হয়; কিন্তু মুখ থেকে বেরোনো কর্কশ কথার ক্ষত হৃদয়ে চিরকাল গেঁথে থাকে এবং কখনোই সারে না।

ক্ষমা ও কথা কমানো: কথা সংযত রাখা কঠিন হলেও তা মঙ্গলজনক। দুষ্টের শক্তি যেখানে হিংসা ও বলপ্রয়োগ, গুণী মানুষের প্রকৃত শক্তি হলো 'ক্ষমা'।

 ৪. চরিত্র, আচরণ ও সৎসঙ্গ

 আচরণই শ্রেষ্ঠত্ব: শুধু উঁচু বংশে জন্মালেই কেউ শ্রেষ্ঠ হয় না; মানুষের আসল পরিচয় তার সদাচারে। নিচু বংশে জন্মেও সদাচারী ব্যক্তি শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে।

 সঙ্গ দোষ ও প্রভাব: ভেজা কাঠ যেমন শুকনো কাঠের সাথে থাকলে পুড়ে যায়, তেমনি অসৎ বা দুষ্ট মানুষের সাথে থাকলে নিরপরাধ ভালো মানুষও শাস্তির ভাগীদার হয়।

 জ্ঞান আহরণ: একজন জ্ঞানীর উচিত যেকোনো স্থান বা ব্যক্তির কাছ থেকে—এমনকি অর্থহীন বা অগোছালো কথার ভেতর থেকেও—সোনার মতো সারকথা বা জ্ঞান কুড়িয়ে নেওয়া।

৫. জীবনসত্য ও সময়জ্ঞান

 ক্ষুধা ও তৃপ্তি: প্রকৃত সুস্বাদু খাবারের উৎস হলো ক্ষুধা, যা প্রায়শই ধনীদের চেয়ে দরিদ্রদের কাছে বেশি থাকে। ধনসম্পদ থাকলেই সুখ আসে না, যদি তা ভোগ ও হজম করার ক্ষমতা না থাকে।

 বিনাশকালে বিপরীত বুদ্ধি: দেবতারা যাঁকে ধ্বংস করতে চান, প্রথমে তার বুদ্ধি হরণ করেন। বিনাশ ঘনিয়ে এলে অন্যায়কেই ন্যায় বলে মনে হতে থাকে—যেমনটা ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের ক্ষেত্রে ঘটেছে।

যুধিষ্ঠিরের যোগ্যতা ও ধর্মপথ: পাণ্ডবরা শক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কেবল ধর্ম, দয়া ও সৌজন্যের খাতিরে ধৃতরাষ্ট্রের অন্যায় আদেশ ও কষ্ট সহ্য করে যাচ্ছেন।

সংক্ষেপে মূল বার্তা: রাজ্য বা জীবন চালাতে গেলে কেবল শক্তি বা ধন নয়, বরং ধর্ম, আত্মসংযম, উপযুক্ত বিচারবোধ ও বাক্যসংযমই হলো উন্নতির মূল চাবিকাঠি।

বি:দ্র:এর পরের ভাগে থাকছে ধৃতরাষ্ট্রকে বিদুরের নীতির উপদেশ (বিদুর নীতির তৃতীয় অধ্যায়  ) যাহলো মহাভারতের উদ্যোগ পর্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত অধ্যায়।

আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের  ষষ্ঠভাগ  (বিদুর নীতির দ্বিতীয় অধ্যায়)  আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।  

উদ্যোগপর্বের পঞ্চমভাগ  (বিদুর নীতির প্রথম অধ্যায়) সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি