দশম ভাগ উদ্যোগপর্ব-বিদুর নীতি ষষ্ঠ অধ্যায় -বিদুর-উবাচ: সিংহাসনের গোপন খসড়া

 


দশম ভাগ উদ্যোগপর্ব-বিদুর নীতি ষষ্ঠ অধ্যায় -বিদুর-উবাচ: সিংহাসনের গোপন খসড়া

বিদুর বললেন বৃদ্ধ কাছে এলে বুকের খাঁচায় একটা ছটফটানি জাগে—একটা অজানা ভয়। কিন্তু নিচু হয়ে প্রণাম করতেই ধুকপুকানিটা থিতিয়ে আসে, সব শান্ত। শ্রদ্ধা আদতে কোনো দুর্বলতা নয়, আত্মাকে শান্ত করার এক গোপন শিল্প।

সংসারের নিয়মগুলো বড্ড অদ্ভুত, রাজন্। অতিথি সাধুই হোন কিংবা কোনো পতিত মানুষ, গৃহস্থকে জলের পাত্রটা এগিয়ে দিতেই হয়। নুন, তেল, দুধ, শাক আর লাল কাপড় বিক্রি করে পেট চালানো জোচ্চুরি—ওগুলো তো ভাগ করে নেওয়ার জিনিস! আবার যাঁর চোখে সোনা আর মাটি একাকার, যিনি শোক-তাপ বা নিন্দা-প্রশংসার তোয়াক্কা না করে উদাসীন হেঁটে যান, তিনিই তো আসল ভিক্ষুক।

নিজের অন্তঃপুর সামলাতে হয় ধাপে ধাপে। রান্নাঘরের চাবি মায়ের হাতে, কৃষিকাজ নিজের তদারকিতে, আর ব্রাহ্মণের সেবায় খাটাতে হয় ছেলেকে। আগুনে জল ঢাললে যেমন সব ঠান্ডা, ক্ষত্রিয় যতই তেজ দেখাক—ব্রাহ্মণের কাছে এসে তাকে শান্ত হতেই হয়। তেজী মানুষ তুষের আগুনের মতো, বাইরে তার কোনো আঁচ পাওয়া যায় না।

আর রাজ্য চালানো? সে তো এক নির্দয় খেলা! বুদ্ধিমান শত্রু বহুদূর পর্যন্ত হাত বাড়াতে পারে, তাই তো তাকে ঘাঁটাতে নেই। যাকে বিশ্বাস করা যায় না, তাকে তো দূরে রাখবেই; কিন্তু পরম বিশ্বাসী লোকটাকেও অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে নেই—একবার মন ভাঙলে আর জোড়া লাগে না। রাজপ্রাসাদের নারী গৃহলক্ষ্মী, তাঁকে রক্ষা করো ঠিকই, কিন্তু তাঁর হাতের পুতুল হয়ে যেও না।

আসল রাজা তিনিই, যাঁর পরবর্তী চাল ঘুণাক্ষরেও কেউ টের পায় না। পরিকল্পনা করতে হয় পাহাড়ের মাথায়, নয়তো নির্জন গহীন বনে। কাজ শেষ হওয়ার পর যেন বিশ্বসংসার জানতে পারে। যার আনন্দ আর ক্রোধের কোনো অর্থ নেই, যার চাল ভুল, সে তো নিজেই নিজের গর্ত খোঁড়ে। সন্ধি আর বিগ্রহের অলিগলি যে রাজা চেনে, রাজ্যলক্ষ্মী শেষ পর্যন্ত তাঁর পায়ে এসেই লুটিয়ে পড়ে।

বি:দ্র: পাঠকদের সুবিধার্থে উপরিউক্ত অংশটি মহাভারতের 'উদ্যোগ পর্ব'-এর অন্তর্গত বিখ্যাত বিদুর নীতি-র ষষ্ঠ অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ। নিচে মূল বিষয়গুলোকে সহজ ও প্রাঞ্জল ভাবে তুলে ধরা হলো:

শ্রদ্ধা ও বিনয়: কোনো শ্রদ্ধেয় প্রবীণ বা গুণী মানুষকে প্রণাম করলে ও সম্মান জানালে মনের ভয় এবং অস্থিরতা কেটে যায়, মন শান্ত হয়।

অতিথি সেবা: বাড়িতে অতিথি এলে (তিনি সাধু-সন্ন্যাসীই হোন বা যেকোনো সাধারণ মানুষ) তাঁকে বসার আসন ও পানের জল দেওয়া এবং আন্তরিক অভ্যর্থনা জানানো প্রতিটি গৃহস্থের ধর্ম।

সহযোগিতা ও দান: নুন, তেল, দুধ, ঘি, শাকসবজি ও বস্ত্রের মতো দৈনন্দিন প্রদেয় বস্তুগুলো কেবল ব্যবসার কাজে না লাগিয়ে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া বা দান করা উচিত।

প্রকৃত সাধু ও সন্ন্যাসী: যিনি সব অবস্থায় সমভাব বজায় রাখেন, প্রশংসা বা নিন্দায় বিচলিত হন না এবং যাঁর কাছে সোনা ও মাটি সমান, তিনিই প্রকৃত সন্ন্যাসী।

অতিরিক্ত অন্ধবিশ্বাস নয়: অবিশ্বাসী মানুষকে বিশ্বাস করা যেমন ভুল, তেমনি অতি-বিশ্বাসী ব্যক্তিকেও অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে নেই। কারণ সেই বিশ্বাস ভাঙলে তা আর সহজে জোড়া লাগে না।

নারীদের সম্মান: নারীদের ঘরের লক্ষ্মী ও রূপক হিসেবে সম্মান ও সুরক্ষা দেওয়া উচিত, তবে কোনোভাবেই কোনো মোহ বা দাসত্বে বাঁধা পড়া উচিত নয়।

দায়িত্ব বণ্টন: জীবনের কাজগুলো বুদ্ধি দিয়ে ভাগ করে নিতে হয়—যেমন চাষবাস নিজের তদারকিতে করা ভালো, ঘরসংসারের বিভিন্ন দায়িত্ব পরিবারের অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিদের হাতে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

গোপনীয়তা রক্ষা: নিজের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা বা গোপন সিদ্ধান্ত কাজের আগে প্রকাশ করতে নেই; কাজ সফল হওয়ার পরেই তা অন্যদের জানা উচিত।

দূরদর্শিতা ও রাজধর্ম: জীবনের নানা পরিস্থিতি (সন্ধি, বিরোধিতা, লাভ-ক্ষতি) বুঝে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে পারা এবং নিজের রাগ ও আনন্দকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারাই হলো সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

বি:দ্র: এর পরবর্তীতে থাকবে বিদুর নীতির সপ্তম অধ্যায়, আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের  দশম ভাগের (বিদুর নীতির ষষ্ঠ অধ্যায়)  আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।  

উদ্যোগপর্বের নবম ভাগের (বিদুর নীতির পঞ্চম   অধ্যায়) সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :






Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)