১৭তমভাগ উদ্যোগপর্ব-(সনৎসুজাতীয়- পঞ্চম অধ্যায়) অহংকার থেকে অমরত্ব: সনৎ সুজাতের সান্নিধ্যে জীবনের আসল সাধনা


১৭তমভাগ উদ্যোগপর্ব-(সনৎসুজাতীয়- পঞ্চম  অধ্যায়) অহংকার থেকে অমরত্ব: সনৎ সুজাতের সান্নিধ্যে জীবনের আসল সাধনা

সনৎ সুজাত বললেন, “রাজন, মানুষের জীবনে এমন কিছু দোষ আছে, যা ধীরে ধীরে তার পতন ডেকে আনে। শোক, ক্রোধ, লোভ, মোহ, কামনা, অহংকার, অতিরিক্ত ঘুম, ঈর্ষা, অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা, কাপুরুষতা, ভালো মানুষের মধ্যেও দোষ খোঁজা এবং অন্যের নিন্দা করা—এই বারোটি বড় দোষ মানুষের জীবনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। মানুষ যখন একের পর এক এসব দোষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, তখন তার বিচারবুদ্ধি নষ্ট হয় এবং সে অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়ে।

যারা অতিরিক্ত লোভী, নিষ্ঠুর, কঠিন ভাষায় কথা বলে, কৃপণ, রাগী এবং সবসময় নিজের প্রশংসা করে—তারা সাধারণত নিষ্ঠুর কাজের দিকে ঝোঁকে। আবার যারা শুধু নিজের ভোগের কথা ভাবে, মানুষের সঙ্গে অন্যায় বা পক্ষপাতমূলক আচরণ করে, অতিরিক্ত অহংকারী, সামান্য দান করে তার অনেক প্রচার করে, কৃপণতা করে, নিজের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি শক্তি দেখায় এবং নারীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে—তাদেরও পাপী ও নিষ্ঠুর বলা হয়েছে।

অন্যদিকে ধর্ম, সত্য, তপস্যা, ইন্দ্রিয় সংযম, ঈর্ষাহীনতা, লজ্জা, সহনশীলতা, অন্যের দোষ না দেখা, দান, শাস্ত্রজ্ঞান, ধৈর্য এবং ক্ষমা—এই বারোটি ব্রাহ্মণের মহৎ গুণ বা ব্রত। যে ব্যক্তি এই গুণগুলি থেকে কখনও বিচ্যুত হয় না, সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং মানুষের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠে। এর মধ্যে কয়েকটি গুণ থাকলেও মানুষের মধ্যে মমত্ববোধ ও আসক্তি ধীরে ধীরে কমে আসে।

ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করা, ত্যাগের মনোভাব এবং সবসময় সচেতন থাকা—এই তিনটি গুণ মানুষকে অমৃত বা মুক্তির পথে নিয়ে যায়। যাঁর প্রধান লক্ষ্য ব্রহ্মকে উপলব্ধি করা, তাঁর জন্য এগুলিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাধনা।

সত্য হোক বা মিথ্যা—কোনও অবস্থাতেই অন্যের নিন্দা করা উচিত নয়। কারণ নিন্দা মানুষের নিজের চরিত্রকেই ছোট করে। যারা সবসময় অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ায় ও নিন্দা করে, তারা নিজেরাই অধঃপতনের দিকে যায়।

অহংকারেরও অনেক রূপ আছে। যেমন—সমাজ ও নীতির বিরোধী কাজ করা, শাস্ত্রের নির্দেশ অমান্য করা, গুণী মানুষের দোষ খোঁজা, মিথ্যা কথা বলা, অতিরিক্ত কামনা ও ক্রোধ, অন্যের অধীনে থেকে নিজেকে অসহায় করে ফেলা, পরের দোষ খোঁজা, পরনিন্দা, অর্থের অপব্যবহার, অকারণ ঝগড়া, হিংসা, জীবজন্তুকে কষ্ট দেওয়া, ঈর্ষা, অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস, বেশি কথা বলা এবং বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলা। জ্ঞানী মানুষের এসব অহংকার থেকে দূরে থাকা উচিত। কারণ সৎ ও জ্ঞানী মানুষ সবসময় অহংকারকে নিন্দা করেন।

বন্ধুত্ব বা প্রকৃত মিত্রতারও কিছু বিশেষ গুণ রয়েছে। বন্ধুর ভালো হলে আনন্দিত হওয়া এবং তার খারাপ সময়ে দুঃখ পাওয়া—এ দুটি তার মধ্যে থাকা উচিত। বন্ধু প্রয়োজনের সময় চাইলে নিজের সঞ্চিত অর্থ বা সম্পদ তাকে সাহায্য হিসেবে দেওয়া উচিত। এমনকি বন্ধুর প্রকৃত কল্যাণের জন্য প্রয়োজন হলে নিজের প্রিয় জিনিস, অর্থসম্পদ, সন্তান বা স্ত্রীকেও ত্যাগ করার মানসিকতা থাকতে হবে—অর্থাৎ বন্ধুর কল্যাণকে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।

বন্ধুকে সাহায্য করে তার কাছ থেকে কোনো প্রতিদান আশা না করাই প্রকৃত বন্ধুত্বের আরেকটি লক্ষণ। নিজের পরিশ্রমে অর্জিত সম্পদ নিজে ভোগ করা উচিত, বন্ধুর উপার্জনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। আর সত্যিকারের বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয় হল—বন্ধুর ভালো করার জন্য প্রয়োজনে নিজের স্বার্থও ত্যাগ করা।

যে ধনী গৃহস্থ এই ধরনের গুণসম্পন্ন, ত্যাগী ও সাত্ত্বিক জীবনযাপন করেন, তিনি ধীরে ধীরে নিজের পাঁচ ইন্দ্রিয়কে তাদের বিষয় থেকে সরিয়ে আনতে পারেন। অর্থাৎ চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বককে সবসময় ভোগের দিকে ছুটতে না দিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।

কিন্তু কারও মধ্যে যদি বৈরাগ্য বা আসক্তিহীনতা না থাকে, তাহলে সে যতই ইন্দ্রিয় সংযম বা তপস্যা করুক, তার সাধনা মূলত স্বর্গ বা উচ্চতর লোক লাভের কারণ হতে পারে; মুক্তির কারণ হয় না। কারণ তার মধ্যে এখনও সত্যস্বরূপ ব্রহ্মের জ্ঞান জন্মায়নি। তাই তার সাধনা অনেক সময় ইচ্ছাপূরণের জন্য করা যজ্ঞ ও পুণ্যকর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

কেউ মনে মনে যজ্ঞ বা সাধনা করে, কেউ কথার মাধ্যমে করে, আবার কেউ বাস্তব কাজের মাধ্যমে তা সম্পন্ন করে। যে ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা ও কামনা পূরণের জন্য কাজ করে, তার চেয়ে সেই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ, যে সমস্ত কামনা ত্যাগ করে নিষ্কামভাবে কাজ করে। তবে ব্রহ্মকে যিনি সত্যভাবে উপলব্ধি করেছেন, তাঁর অবস্থান এই দুটিরও ঊর্ধ্বে।

এই জ্ঞানপূর্ণ শাস্ত্র মানুষের আত্মজ্ঞান ও পরমাত্মাকে উপলব্ধির পথ দেখায়। তাই এটি যোগ্য শিষ্যদের অবশ্যই শেখানো উচিত। জ্ঞানীরা বলেন, পরমাত্মা ছাড়া আমরা যে বিশাল দৃশ্যমান জগতকে দেখি, তা আসলে নাম ও রূপের প্রকাশমাত্র। এই যোগশাস্ত্রে পরমাত্মা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান পাওয়ার পথ দেখানো হয়েছে। যে ব্যক্তি এই সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে, সে অমরত্ব বা মুক্তির পথ লাভ করে।

শুধু কামনা নিয়ে করা পুণ্যকর্মের মাধ্যমে সত্যস্বরূপ ব্রহ্মকে উপলব্ধি করা যায় না। শুধু যজ্ঞ-যাগ করেও অজ্ঞ ব্যক্তি অমরত্ব লাভ করতে পারে না। মৃত্যুর সময়ও তার অজ্ঞানতা ও আসক্তির কারণে শান্তি আসে না।

তাই মানুষের উচিত অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততা ও স্বার্থপরতার জীবন থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে একান্ত মনে পরমাত্মার চিন্তা ও উপাসনা করা। এমনকি মনে মনেও অপ্রয়োজনীয় কাজের পরিকল্পনা না করে মনকে শান্ত রাখতে হবে। কেউ প্রশংসা করলে অতিরিক্ত আনন্দিত হওয়া যাবে না, আবার কেউ নিন্দা করলে রেগে যাওয়া বা দুঃখে ভেঙে পড়াও উচিত নয়।

সনৎ সুজাত শেষে বললেন, “রাজন, যে ব্যক্তি এই সাধনাগুলি যথাযথভাবে পালন করতে পারে, সে জীবিত অবস্থাতেই ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে পারে এবং তাঁর মধ্যে স্থিত হতে পারে। বেদ ও শাস্ত্র বিচার করে আমি যা উপলব্ধি করেছি, আজ তোমাকে সেই জ্ঞানই জানালাম।”

বি: দ্র: পরবর্তী ভাগে থাকবে সনৎসুজাতীয়-ষষ্ঠ  অধ্যায়) "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে। 

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ১৭তমভাগের (সনৎসুজাতীয়-পঞ্চম অধ্যায়) আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।

উদ্যোগপর্বের ১৬তম  ভাগের (সনৎসুজাতীয়- চতুর্থ    অধ্যায় ) সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)