৩০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-হস্তিনাপুরে এক রাত্রি: রাজধর্ম ও অন্ন
৩০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-হস্তিনাপুরে এক রাত্রি: রাজধর্ম ও অন্ন
হস্তিনাপুরের রাজসভায় তখন থমথমে উত্তেজনা। কৌরবদের দম্ভ আর অহংকারের আবহ পার হয়ে স্বয়ং কৃষ্ণ যখন সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেন, মুহূর্তের জন্য পুরো সভাগৃহ থমকে গেল। তবে রাজকীয় শিষ্টাচারের খাতিরে দুর্যোধন তড়িঘড়ি তাঁর মন্ত্রীদের নিয়ে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। কৃষ্ণ স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে উপস্থিত রাজাদের যথাবিহিত সম্মান জানিয়ে বসে পড়লেন একটা ঝকমকে সোনার পালঙ্কে।
অভ্যর্থনা পর্ব শেষ হতেই দুর্যোধন বেশ হাসিমুখে কৃষ্ণকে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু কৃষ্ণ অত্যন্ত স্পষ্ট, ধীর অথচ কড়া গলায় সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন।
দুর্যোধনের মুখের হাসিটা অমনি মিলালো। তিনি প্রথমে বেশ মিষ্টি গলায়, তারপর ধীরে ধীরে কিছুটা ছদ্ম কপটতা মিশিয়ে বললেন, "জনার্দন, আপনার জন্য এত ভালো খাবার, পানীয় আর আরামের ব্যবস্থা করলুম, আর আপনি তা এক কথায় ফিরিয়ে দিচ্ছেন? আপনি তো দু-পক্ষের জন্যই ভাবেন, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের অত্যন্ত প্রিয়। কোনটা ধর্ম আর কোনটা অধর্ম—তা তো আপনার চেয়ে ভালো কেউ বোঝে না। তবে এত জেনেও আমার আতিথেয়তা ফিরিয়ে দেওয়ার কারণটা কী, বলবেন?"
কৃষ্ণ এবার তাঁর দীর্ঘ বাহু দুটি তুলে রাজসভার ওপর চোখ বোলালেন। তারপর মেঘের মতো গম্ভীর স্বরে বললেন, "শুনুন রাজন, দূতের নিয়মই হলো নিজের আসল কাজ শেষ করে তবেই আহার গ্রহণ করা। আমার কাজটা আগে শেষ হতে দিন, তারপর আপনার নিমন্ত্রণ রক্ষা করা যাবে। আর একটা কথা—কাম, ক্রোধ, হিংসা বা লোভে পড়ে আমি কখনো নিজের ধর্ম ছাড়ি না। মানুষ দুটো কারণে অন্যের দেওয়া অন্ন খায়—হয় পরম ভালোবাসার টানে, না হয় ঘোর বিপদে পড়ে। আপনার তো আমার ওপর কোনো ভালোবাসা নেই, আর আমি কোনো বিপদেও পড়িনি।"
খানিকটা থেমে কৃষ্ণ আবার বললেন, "পাণ্ডবরা আপনারই ভাই। তারা গুণী মানুষ, সবসময় ধর্মের পথে চলে। কিন্তু বিনা কারণেই আপনি জন্ম থেকে ওদের ওপর হিংসা করে আসছেন। যারা ধর্মপথে চলে, তাদের সঙ্গে শত্রুতা করা অনুচিত। পাণ্ডবদের যারা শত্রু, তারা আমারও শত্রু। পাণ্ডব আর আমি আলাদা কিছু নই। যে লোক গুণবানদের সঙ্গে অনর্থক বিবাদ করে, সে নিচ। আর আপনার এই খাবার পাপের টাকায় তৈরি, এ অন্ন খাওয়ার যোগ্য নয়। আমি ঠিক করেছি, আজ বিদুরের ঘরেই খাব।"
কথা কটি বলেই কৃষ্ণ রাজসভা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। সোজা চলে গেলেন বিদুরের কুঁড়েঘরে। কৃষ্ণ এসেছেন শুনে সেখানে ছুটে এলেন ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ আর কুরুবংশের বড় বড় প্রবীণরা। তাঁরা বললেন, "হে কৃষ্ণ, আমরা আপনার জন্য সুন্দর প্রাসাদ সাজিয়ে রেখেছি, চলুন সেখানে গিয়ে বিশ্রাম নেবেন।"
কৃষ্ণ হেসে জবাব দিলেন, "আপনাদের এই আপ্যায়নই আমার কাছে অনেক।"
কৌরববৃদ্ধরা চলে গেলে বিদুর পরম আনন্দে কৃষ্ণের চরণ স্পর্শ করলেন। তারপর পরম যত্নে কৃষ্ণের সামনে এনে দিলেন সাধারণ, কিন্তু পুষ্টিকর খাবার। কৃষ্ণ সেই অন্ন আগে ব্রাহ্মণদের দিলেন, তারপর নিজের সহচরদের নিয়ে একসঙ্গে খেতে বসলেন।
রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে হস্তিনাপুরে। আহার সেরে কৃষ্ণ যখন বিশ্রাম নিচ্ছেন, বিদুর এসে বসলেন তাঁর পাশে। বিদুরের চোখেমুখে চিন্তার স্পষ্ট ছাপ। তিনি বললেন, "কৃষ্ণ, আপনার এখানে আসাটা কিন্তু মোটেও ভালো হয়নি। ওই নির্বোধ দুর্যোধন ধর্ম-নীতি সব বিসর্জন দিয়েছে। প্রচণ্ড অহংকারী, গুরুজনদের কথা শোনে না, নিজেকে বিশাল বুদ্ধিমান মনে করে। ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ আর কর্ণের শক্তিতে অন্ধ হয়ে সে ভেবে বসে আছে রাজ্য একাই দখল করে রাখবে। তার ধারণা, একা কর্ণই সব শত্রুকে শেষ করে দিতে পারবে। তাই সে কোনো সন্ধি করবে না। ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেরা পণ করেছে, পাণ্ডবদের এক ছটাক জমি পর্যন্ত দেবে না।"
বিদুর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন, "যেখানে ভালো আর মন্দ কথার কোনো তফাত করা হয় না, সেখানে বুদ্ধিমান মানুষের চুপ থাকাই ভালো। যে রাজারা একসময় আপনাকে দেখে ভয় পেত, তারা আজ প্রাণের ভয়ে দুর্যোধনের দলে ভিড়েছে। তারা পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। কৃষ্ণ, আমি আপনার শক্তি ও বুদ্ধির কথা জানি, তাও ভালোবাসার খাতিরে বলছি—আপনি ওদের সভায় যাবেন না।"
কৃষ্ণ মৃদু হাসলেন। বিদুরের দিকে তাকিয়ে পরম মমতায় বললেন, "বিদুর, একজন সত্যিকারের দরদী আর অভিভাবকের মতো কথা বললেন আপনি। কিন্তু মানুষ হিসেবে নিজের কাজটুকু করে যাওয়া তো আমাদের কর্তব্য। সাধ্যমতো চেষ্টা করার পর যদি সাফল্য না-ও আসে, তাহলেও চেষ্টা করার পুণ্যটুকু থেকে যায়। কৌরব ও পাণ্ডব—দুই পক্ষের ভালোর জন্যই আমি শান্তিদূত হয়ে এসেছি। কৌরবরা যদি আমার কথা না-ও শোনে, আমি কিন্তু আমার কর্তব্যে পিছিয়ে যাব না। কাল যেন ইতিহাস বা কোনো অধার্মিক লোক বলতে না পারে—'কৃষ্ণ চাইলে যুদ্ধটা থামাতে পারতেন, কিন্তু রাগ করে তিনি সন্ধির চেষ্টাই করলেন না!' আমি আমার কাজটা করব, বাকিটা দুর্যোধনের নিজের কর্মফল।"
কথা শেষ করে কৃষ্ণ পালঙ্কে শুয়ে পড়লেন। নীতি, ধর্ম আর জীবনের গূঢ় কথা বলতে বলতে বিদুর আর কৃষ্ণের সেই রাত কেটে গেল।
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ৩০তম ভাগের আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ২৯তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment