দ্বাদশভাগ উদ্যোগপর্ব (বিদুর নীতি অষ্টম অধ্যায়)মানুষ যা কিছু হারায়, নিয়ে যায় শুধু কর্মের ছায়া


দ্বাদশভাগ উদ্যোগপর্ব (বিদুর নীতি অষ্টম অধ্যায়)-মানুষ যা কিছু হারায়, নিয়ে যায় শুধু কর্মের ছায়া:

সৎ মানুষ সম্মান পেয়েও তাতে জড়িয়ে পড়েন না, নিজের কাজটুকু নিজের মতো করে যান চুপচাপ। এমন মানুষই তাড়াতাড়ি সুখের নাগাল পান, কিন্তু যার ওপর সাধুপুরুষের আশীর্বাদ থাকে, তার সুখ হয় চিরস্থায়ী। অন্যায়ের টাকায় গড়া ধনসম্পদ যে সাপের খোলসের মতো ঝেড়ে ফেলে দিতে জানে, সে-ই আসলে সত্যিকারের দুঃখমুক্তি পায়।

মনে রাখা দরকার — মিথ্যে বলে নিজের ফায়দা তোলা, রাজার কাছে কারো নামে মিথ্যে বদনাম দেওয়া, আর গুরুর সামনে মেকি ভক্তি দেখানো — এই তিনটে কাজ ব্রহ্মহত্যার সমান পাপ। অন্যের গুণের মধ্যেও দোষ খুঁজে বেড়ানো নিজের মৃত্যুকেই ডেকে আনার শামিল, আর কাউকে কটু কথা বলা বা নিন্দা করা মানে লক্ষ্মীকে নিজের হাতে ঘর থেকে বিদায় করা। বিদ্যার্থীর বিদ্যানাশের তিন শত্রু — শোনার আগ্রহহীনতা, সবসময় অস্থির থাকা, আর নিজের বড়াই করা। আর অলসতা, দম্ভ, মোহ, চঞ্চলতা, দলাদলি, বেপরোয়া মনোভাব, অহংকার আর লোভ — এই আট শত্রুই শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় বিপদ।

সহজ কথায়, সুখ খুঁজতে গেলে বিদ্যা কোনোদিন ধরা দেয় না। বিদ্যার আসল স্বাদ পেতে হলে সুখের মায়া ছাড়তেই হয়। আগুন যেমন কাঠ পুড়িয়েও তৃপ্ত হয় না, সমুদ্র যেমন নদীর জলে কখনো ভরে না, মৃত্যু যেমন কোনো প্রাণীকেই রেয়াত করে না — ঠিক তেমনই ব্যভিচারী নারী কখনো এক পুরুষে সন্তুষ্ট থাকে না। লাগামছাড়া আশা মানুষের ধৈর্য কেড়ে নেয়, রাগ কেড়ে নেয় লক্ষ্মীকে, কৃপণতায় নষ্ট হয় নাম-যশ, আর অযত্নে খালি হয়ে যায় গোয়ালঘর। আরেকটা কথাও মনে রাখা দরকার — একজন প্রকৃত ব্রাহ্মণ রেগে গেলে গোটা একটা রাজ্যও পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে।

ছাগল, কাঁসার বাসন, রুপো, মধু, পাখি, বেদজ্ঞ পণ্ডিত, বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়, আর বিপদগ্রস্ত সজ্জন — এদের সবসময় ঘরে আশ্রয় দেওয়া উচিত। মনু বলে গেছেন, দেবতা-ব্রাহ্মণ-অতিথির সেবার জন্য ছাগল, ষাঁড়, চন্দন, বীণা, ঘি, লোহা, তামার বাসন, শঙ্খ, শালগ্রাম আর গোরোচনা ঘরে রাখা মঙ্গলজনক।

কথাটা মন দিয়ে শুনুন। কাম, ভয়, লোভ, এমনকি প্রাণের বিনিময়েও নিজের ধর্ম বেচবেন না কখনো। ধর্মই চিরস্থায়ী, সুখ-দুঃখ তো আসে আর চলে যায়। এই দুনিয়ার ধন-দৌলত আর রাজপাট শাসন করেও শেষমেশ সবাইকে যমরাজের দরবারে খালি হাতেই হাজির হতে হয়। যেসব প্রতাপশালী রাজা একদিন ভাবতেন গোটা বিশ্বটাই তাঁদের মুঠোয়, তাঁদেরও একই দশা হয়েছে শেষে। কষ্ট করে বড় করা ছেলেও মরে গেলে লোকে তাকে এক মুহূর্তও ঘরে রাখে না। যে শবের জন্য একটু আগে চোখের জল ভাসছিল, তাকেই সাধারণ কাঠের মতো চিতায় তুলে দেওয়া হয়। ধনসম্পদ ভোগ করে অন্যরা, দেহটা খেয়ে ফেলে পশু-পাখি বা আগুন, আর আত্মাটুকু একলা হাঁটে তার পাপ-পুণ্যের বোঝা কাঁধে নিয়ে। ফল-ফুল ফুরোলে পাখি যেমন গাছ ছেড়ে উড়ে যায়, মানুষ মরলে আপনজনেরাও ঠিক তেমনি মুখ ফিরিয়ে নেয়। পরলোকে সঙ্গী থাকে শুধু জীবদ্দশায় করা ভালো-মন্দ কাজগুলোই। অজ্ঞানতার অন্ধকার সারা দুনিয়া ঢেকে আছে, আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে করে তোলে অন্ধ। এই অন্ধত্ব থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার।

জীবনটা যেন একটা নদী। উৎস তার সত্যে, দুই তীরে ধৈর্য, আর জলে বইছে দয়ার ঢেউ। বিশুদ্ধ মনে যে এই জলে স্নান করে, সে-ই প্রকৃত পবিত্র। কাম আর ক্রোধের কুমির, আর পাঁচ ইন্দ্রিয়ের এই উত্তাল সংসার-নদী পেরোতে ধৈর্যের নৌকোই একমাত্র উপায়। বুদ্ধিমান, ধার্মিক আর বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধুদের শ্রদ্ধা করে যে ঠিক-ভুলের পরামর্শ নেয়, সে কখনো পথ হারায় না। ক্ষুধা আর কামনার তীব্রতাকে সামলাতে হয় ধৈর্য দিয়েই। হাত, পা, চোখ, কান, আর মুখ — সবকিছুকেই সৎকাজে বেঁধে রাখা দরকার।

যে ব্রাহ্মণ নিয়মিত স্নান-জপ করেন, দরিদ্রকে অন্ন দেন, সত্যি কথা বলেন, গুরুসেবা করেন — তাঁর ব্রহ্মলোক প্রাপ্তি অবধারিত। বেদজ্ঞ, যজ্ঞকারী আর গো-ব্রাহ্মণের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেওয়া ক্ষত্রিয়ও স্বর্গে সম্মানিত হন। এভাবেই চার বর্ণের ধর্ম আলাদা আলাদা, কিন্তু পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির আজ ক্ষত্রিয়ধর্ম থেকে সরে যাচ্ছেন। রাজন, আপনি তাঁকে আবার সেই পথে ফিরিয়ে আনুন।

কথাগুলো শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ধৃতরাষ্ট্র — বললেন, বিদুর, তোমার প্রতিটা কথাই সত্যি, চিরকালীন সত্যি। তুমি বললে আমারও মনে হয়, এটাই ঠিক পথ। আমিও যুধিষ্ঠিরের কথাই ভাবি বারবার, কিন্তু ওই দুর্মতি দুর্যোধন সামনে এলেই আমার বুদ্ধি গুলিয়ে যায়। আসলে নিয়তি বা প্রারব্ধকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা কারো নেই। ভাগ্যই শেষ কথা বলে — তার সামনে মানুষের সব পুরুষার্থ শেষে হার মেনে নেয়।

বিদুর নীতির এই অধ্যায়ে বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে জীবনের কয়েকটি অত্যন্ত গভীর এবং মূল্যবান উপদেশ দিয়েছেন। সহজ ভাষায় সাধারণ পাঠকের বোঝার জন্য তাঁর মূল নীতিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

​১. সুখ ও দুঃখমুক্তির পথ

​আসক্তিহীনতা: সম্মান পেলেও অহংকারী না হয়ে নিজের কাজ সততার সঙ্গে করে যাওয়াই হলো আসল সুখের চাবিকাঠি।

​সৎ উপার্জন: অন্যায়ের মাধ্যমে উপার্জিত ধনসম্পদ ত্যাগ করতে না পারলে কোনোদিন প্রকৃত সুখ ও শান্তি পাওয়া যায় না।

​২. যে মহাপাপগুলো এড়িয়ে চলা উচিত

​মিথ্যা বলে নিজের সুবিধা নেওয়া, কারও নামে মিথ্যা বদনাম দেওয়া এবং গুরুর কাছে ভণ্ডামি করা—এগুলো ব্রহ্মহত্যার সমান পাপ।

​অন্যের ভালো গুণেও দোষ খোঁজা এবং মানুষকে কটু কথা বলা বা নিন্দা করা নিজের লক্ষ্মী ও ভাগ্যকে নিজ হাতে ধ্বংস করার সমান।

​৩. বিদ্যানাশ ও শিক্ষার্থীর শত্রু

​বিদ্যানাশের ৩ কারণ: শোনার অনিচ্ছা, অস্থিরতা এবং আত্মপ্রশংসা।

​শিক্ষার্থীর ৮ বড় শত্রু: অলসতা, দম্ভ, মোহ, চঞ্চলতা, দলাদলি, বেপরোয়া ভাব, অহংকার এবং লোভ।

​বিলাসিতা ও বিদ্যার বিরোধ: সুখ আর বিদ্যা একসাথে পাওয়া যায় না। বিদ্যা লাভ করতে হলে আরাম ও বিলাসিতা ত্যাগ করতেই হবে।

​৪. ধর্ম ও সত্যের নিত্যতা

​কাম, ভয়, লোভ বা প্রাণ বাঁচানোর খাতিরেও কখনো নিজের নীতি ও ধর্ম ত্যাগ করা উচিত নয়।

​সুখ-দুঃখ এবং পার্থিব ধনসম্পদ সাময়িক, কিন্তু মানুষের সত্য ও ধর্মই চিরস্থায়ী।

​৫. মৃত্যুর পর আসল সঙ্গী

​মৃত্যুর পর টাকা-পয়সা, রাজ্য বা পরিবার—কোনো কিছুই সাথে যায় না। স্বজনেরা মৃতদেহ শ্মশানে রেখে ফিরে আসে।

​পরকালে মানুষের একমাত্র সঙ্গী হয় তার জীবদ্দশায় করে যাওয়া ভালো ও মন্দ কাজ (কর্ম)।

​৬. জীবন-নদী পার হওয়ার উপায়

​সত্য, ধৈর্য এবং দয়াই হলো জীবনের আসল পবিত্রতা।

​কাম ও ক্রোধের মতো মোহ থেকে বাঁচতে এবং সংসারের জটিলতা পার হতে ‘ধৈর্য’ হলো একমাত্র ভরসাযোগ্য নৌকা।

​৭. বয়োজ্যেষ্ঠ ও গুণীজনের পরামর্শ

​যারা বুদ্ধি, ধর্ম ও বয়সে বড়, তাঁদের শ্রদ্ধা করা এবং জটিল সময়ে তাঁদের থেকে পরামর্শ নিয়ে চলা মানুষ কখনো সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয় না।

বি:দ্র: এর পরবর্তী ভাগে থাকবে উদ্যোগপর্বের "সনৎ সুজাত ঋষির" -প্রথম অধ্যায়- "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার "  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছছে। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের  দ্বাদশভাগ ভাগের (বিদুর নীতি  অষ্টম অধ্যায়)  আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।  

উদ্যোগপর্বের একাদশ  ভাগের (বিদুর নীতির সপ্তম অধ্যায়) সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

'বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)