৩৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব অভিমানী দুর্যোধনের অন্ধ আঁধার ও এক অমোঘ পরিণতি
৩৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব অভিমানী দুর্যোধনের অন্ধ আঁধার ও এক অমোঘ পরিণতি
রাজসভার বাতাস তখন চরম উত্তেজনায় ভারাক্রান্ত। হস্তিনাপুরের রাজসভায় একে একে উপস্থিত হয়েছেন জ্ঞানবৃদ্ধ ও বয়োজ্যেষ্ঠগণ। কিন্তু সভা জুড়ে যে বিষণ্ণ স্তব্ধতা, তাকে সহজে কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছিল না। মহামতি বেদব্যাস, সর্বমান্য পিতামহ ভীষ্ম এবং স্বয়ং দেবর্ষি নারদ—সবাই চেষ্টা করেছেন। নারদের কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়েছিল গভীর জীবনসত্য। তিনি বলেছিলেন, "জগতে সহৃদয় শ্রোতা আর সুহৃদ পাওয়া বড় দুর্লভ হে কুরুনন্দন! যখন ঘোর সংকট আসে, আপনজনরাও মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন শুধু একজন খাঁটি বন্ধুই পাশে থাকে। হঠকারিতার ফল কোনোদিন শুভ হয় না, তার পরিণাম কেবলই হাহাকার।"
কিন্তু যে চোখ অন্ধকারের প্রেমে পড়েছে, আলো তাকে স্পর্শ করবে কীভাবে?
অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অক্ষম পিতা হিসেবে নিজের দুর্বলতাটুকু তিনি ঢাকতে পারলেন না। তিনি শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, "কেশব! তোমার প্রতিটা কথা ধর্মের কথা, সুচিন্তিত এবং ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু আমি যে পরাধীন! এই মন্দমতি দুর্যোধন আমার কোনো কথা শোনে না, শাস্ত্র মানে না, কোনো গুরুজনের শুভোপদেশে তার কান নেই। তুমিই ওকে শেষবারের মতো একটু বোঝাও না কৃষ্ণ! ও যদি তোমার কথাটুকু অন্তত একটু মেনে নেয়, তবে এই বংশটা বেঁচে যায়।"
তখন সমস্ত ধর্ম ও রাজনীতির গূঢ় তত্ত্বের জ্ঞাত পুরুষ, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ শান্ত অথচ গভীর স্বরে দুর্যোধনের দিকে ফিরলেন। তাঁর উচ্চারিত প্রতিটি শব্দে ছিল অসামান্য গাম্ভীর্য ও অন্তর্দৃষ্টি:
"কুরুনন্দন, আমার কথাটা একটু স্থির হয়ে শোনো। এতে তোমার, তোমার কুল আর পরিবারের সবার কল্যাণ হবে। তুমি এক পরম মহৎ ও উজ্জ্বল বংশে জন্মেছ। নীচ কুলজাত নিষ্ঠুর ও নির্লজ্জ মানুষের মতো আচরণ কি তোমার শোভা পায়? তোমার এই গোঁয়ারতুমি কেবল ধর্মবিরোধী নয়, আত্মঘাতীও বটে! পান্ডবরা বীর, বহুশ্রুত এবং বুদ্ধিমান। তাদের সঙ্গে সন্ধি করো দুর্যোধন। এতেই তোমার মঙ্গল, এতেই জগত শান্ত হবে।
পিতা ধৃতরাষ্ট্র, পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোণ, বিদুর, কৃপাচার্য—তোমার সমস্ত হিতৈষীরা তো এটাই চান। পিতা-মাতার কথা শোনাই তো মানুষের ধর্ম। যে মোহগ্রস্ত হয়ে ভালো পরামর্শ শোনে না, অনুশোচনার আগুনে তাকে সারাজীবন জ্বলতে হয়। তুমি আজ কাল্পনিক শক্তির ওপর ভরসা করে আছ? দুঃশাসন, কর্ণ আর শকুনি তোমাকে কোনোদিন জয় এনে দিতে পারবে না! অর্জুনের পরাক্রম তুমি বিরাটনগরেই দেখেছ। যাকে সাক্ষাৎ মহাদেবও পরাস্ত করতে পারেননি, যার পাশে স্বয়ং আমি আছি, তাকে জয় করবে কোন সাহসে?
কৌরব বংশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না। 'কুলঘাতী' নামে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থেকো না। তুমি সন্ধি করো, পাণ্ডবরা তোমাকে সানন্দে যুবরাজ হিসেবে মেনে নেবে, ধৃতরাষ্ট্র থাকবেন মহারাজ হিসেবে। অর্ধেক রাজ্য দিয়ে পরম ঐশ্বর্য ও মর্যাদা নিয়ে সুখে বাঁচো।"
শ্রীকৃষ্ণের যুক্তি ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য শেষ হতেই পিতামহ ভীষ্ম অত্যন্ত আকুল হয়ে দুর্যোধনকে সমর্থন জানিয়ে বললেন, "তাত! কেশব যা বললেন তা শোনো। অহংকার দূরে সরিয়ে রাজধর্ম মেনে নাও। প্রজাদের অকাতরে মরতে দিও না। তা না হলে তোমার পুত্র, মিত্র, ভাইদের জীবনের মায়া ত্যাগ করতে হবে।"
দ্রোণাচার্যও অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে যোগ করলেন, "দুর্যোধন, কৃষ্ণ ও ভীষ্মের কথা অমর্যের মতো গ্রহণ করো। যারা তোমাকে যুদ্ধের উস্কানি দিচ্ছে, যুদ্ধের ময়দানে তারা দায়িত্ব নেবে না। মনে রেখো, কৃষ্ণ আর অর্জুন যে পক্ষে আছেন, সেই পক্ষ অপরাজিত। হিতৈষীদের কথা না শুনলে শেষ পরিণতি হবে কেবলই নিঃসঙ্গ অনুশোচনা।"
জ্ঞানী বিদুর ব্যথিত চোখে দুর্যোধনের দিকে চেয়ে বলে উঠলেন, "দুর্যোধন, তোমার জন্য আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে না। আমার কষ্ট হচ্ছে তোমার ওই বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন্য। তোমার এই দুর্মতির জন্য একদিন সব সুহৃদ হারিয়ে তুমি আহত পাখির মতো একা ডানা ঝাপটাবে।"
সর্বশেষে রাজা ধৃতরাষ্ট্র হাত দুটি জোর করে করুণ সুরে বললেন, "পুত্র! কৃষ্ণের কথা শোনো, এই মুহূর্তেই যুধিষ্ঠিরের কাছে যাও। সন্ধির এই সুবর্ণ সুযোগ আর আসবে না। একে হাতছাড়া করলে তোমার বিনাশ ঠেকায় সাধ্য কার?"
সবাই বললেন, সবাই বোঝালেন। রাজসভার প্রদীপগুলোর আলোয় তখন ভেসে উঠছিল একাধিক চিন্তিত মুখ। কিন্তু যে হৃদয়ে কেবল হিংসা ও হঠকারিতার অন্ধকার বাসা বেঁধেছে, সেখানে বোধহয় মহাসত্যের আলোও পথ খুঁজে পায় না!
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ৩৩তম ভাগের আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ৩২তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment