১৮তমভাগ উদ্যোগপর্ব-)(সনৎসুজাতীয়- ষষ্ঠ অধ্যায়) পরমাত্মার স্বরূপ আর যোগীদের তাঁকে উপলব্ধি করা
১৮তমভাগ উদ্যোগপর্ব-)(সনৎসুজাতীয়- ষষ্ঠ অধ্যায়) পরমাত্মার স্বরূপ আর যোগীদের তাঁকে উপলব্ধি করা
সনৎসুজাত বললেন — ব্রহ্ম হলেন শুদ্ধ, মহান, আলোয় ভরা, উজ্জ্বল, আর অসীম মহিমার অধিকারী। সব দেবতাই তাঁর আরাধনা করেন। তাঁরই আলোয় সূর্য আলোকিত হন। এই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করতে পারেন। শুদ্ধ, চেতনাময়, আনন্দময় সেই পরব্রহ্ম থেকেই হিরণ্যগর্ভের জন্ম, আর সেখান থেকেই সবকিছুর বিকাশ। সেই শুদ্ধ, আলোকময় ব্রহ্মই সূর্যসহ জগতের সব আলোর মধ্যে থেকে নিজেকে প্রকাশ করছেন। তিনি অন্য কারো আলোয় প্রকাশিত হন না, বরং নিজেই সবকিছুর আলোর উৎস। এই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন।
পরমাত্মা থেকেই প্রকৃতির জন্ম, প্রকৃতি থেকে মহতত্ত্বের প্রকাশ, আর তার মধ্যেই আকাশে সূর্য আর চন্দ্র—এই দুই দেবতা অবস্থান করেন। জগৎ সৃষ্টিকারী ব্রহ্মের যে স্বপ্রকাশ রূপ, তা সর্বদা সজাগ থেকে এই দুই দেবতা, পৃথিবী আর আকাশকে ধরে রাখে। এই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন। এই দুই দেবতা, পৃথিবী, আকাশ, সব দিক আর সমস্ত বিশ্বকেই সেই শুদ্ধ ব্রহ্ম ধরে রাখেন। তাঁর থেকেই দিকগুলোর উৎপত্তি, তাঁর থেকেই নদী বয়ে চলে, তাঁর থেকেই বিশাল সমুদ্রের জন্ম। এই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন।
নিজে ক্ষয়িষ্ণু হয়েও যাঁর কাজ কখনো নষ্ট হয় না—শরীররূপ রথে, মনরূপ চাকায়, ইন্দ্রিয়রূপ ঘোড়ায় জোতা এই রথ যে বুদ্ধিমান, চিরনতুন জীবাত্মাকে পরমাত্মার দিকে টেনে নিয়ে যায়, সেই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন। তাঁর সঙ্গে অন্য কারো তুলনাই চলে না। সাধারণ চোখে তাঁকে দেখা যায় না। যিনি স্থির বুদ্ধি দিয়ে, মন আর হৃদয় দিয়ে তাঁকে জানতে পারেন, তিনি অমর হয়ে যান। এই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন।
দশ ইন্দ্রিয়, মন আর বুদ্ধি—এই বারোটা জিনিস যাঁর মধ্যে ধরা আছে। অজ্ঞানতা নামের নদীর মিষ্টি জল যারা পান করে, তারা এই জগতে ভয়ংকর দুর্দশায় পড়ে। সেই দুর্দশা থেকে মুক্তি দেন যে পরমাত্মা, যোগীরা তাঁকেই উপলব্ধি করেন। মৌমাছি যেমন পনেরো দিন ধরে মধু জমায়, আর বাকি পনেরো দিন তা খায়, ঠিক তেমনই সংসারী মানুষ আগের জন্মের কাজের ফল এই জন্মে ভোগ করে। প্রতিটা প্রাণীর জন্যই পরমাত্মা তার কাজ অনুযায়ী খাবারের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। এই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন, যাঁর সোনার মতো সুন্দর পাতাগুলো এই জগৎ-সংসার।
এই সংসাররূপ অশ্বত্থগাছে চড়ে জীব তার কাজরূপ ডানা মেলে নিজের ইচ্ছেমতো নানা প্রাণীর জন্ম নেয়। কিন্তু যাঁকে জানলে জীব মুক্তি পায়, যোগীরা সেই পরমাত্মাকেই উপলব্ধি করেন। পূর্ণ পরমেশ্বর থেকেই এই বিশ্বের সব প্রাণীর জন্ম, পূর্ণ থেকেই তারা কাজ করে, তারপর সেই পূর্ণ ব্রহ্মেই তারা আবার মিশে যায়, আর শেষে শুধু সেই পূর্ণ ব্রহ্মই থেকে যায়। এই চিরন্তন পরমাত্মাকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন।
পূর্ণ ব্রহ্ম থেকেই বাতাসের জন্ম, তাঁর মধ্যেই তার স্থিতি। ব্রহ্ম থেকেই আগুন আর সোমের জন্ম, তাঁর থেকেই প্রাণের বিস্তার। আমি আর আলাদা করে সব নাম বলতে পারছি না—শুধু এটুকু জেনে রাখো, সবকিছুই সেই পরমাত্মা থেকেই এসেছে। যোগীরা সেই পরমাত্মাকেই উপলব্ধি করেন। যেমন প্রশ্বাস নিঃশ্বাসকে নিজের মধ্যে টেনে নেয়, নিঃশ্বাসকে চাঁদ, চাঁদকে সূর্য, আর সূর্যকে পরমাত্মা নিজের মধ্যে মিশিয়ে নেন—যোগীরা সেই চিরন্তন পরমাত্মাকেই উপলব্ধি করেন।
এই সংসার-সাগরের ওপর উঠে থাকা হাঁসরূপী পরমাত্মা এখনও নিজের একটা অংশ ওপরে তোলেননি। যদি সেই অংশটাও তুলে নেন, তাহলে মুক্তি আর বন্ধন—দুটোই চিরকালের জন্য শেষ হয়ে যাবে। যোগীরা সেই চিরন্তন পরমাত্মাকেই উপলব্ধি করেন। বুড়ো আঙুলের সমান আকারের সেই অন্তর্যামী পরমাত্মা হৃদয়ে থেকে সূক্ষ্ম শরীর ধারণ করে জীবাত্মারূপে বারবার জন্ম-মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে যান। সবার শাসক, সবার স্তুতির যোগ্য, সর্বশক্তিমান, সবকিছুর মূল কারণ, আর সর্বত্র বিরাজমান সেই পরমাত্মাকে মূর্খ মানুষ দেখতে পায় না; কিন্তু যোগীরা সেই চিরন্তন পরমাত্মাকেই উপলব্ধি করেন।
মানুষ সাধনা করুক বা না করুক, সব মানুষের মধ্যেই এই ব্রহ্ম সমানভাবে বিরাজ করেন। বদ্ধ আর মুক্ত—দুই ধরনের মানুষের মধ্যেই তিনি সমানভাবেই থাকেন। পার্থক্য শুধু এটুকু—মুক্ত মানুষ সেই আনন্দের মূল উৎস পরমাত্মাকে খুঁজে পান। এই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন।
জ্ঞানী মানুষরা ব্রহ্মবিদ্যার মাধ্যমে এই জগৎ আর পরজগৎ—দুটোকেই ছাড়িয়ে গিয়ে ব্রহ্মভাব লাভ করেন। তখন তাঁরা যজ্ঞ-হোম না করলেও তাঁদের পূর্ণ বলেই ধরে নিতে হবে। রাজা! এই ব্রহ্মবিদ্যাকে যেন তুমি কখনো তুচ্ছ না ভাবো; এর মাধ্যমেই তুমি সেই প্রজ্ঞা লাভ করবে, যা ধৈর্যশীল মানুষরা পেয়ে থাকেন। সেই প্রজ্ঞার মাধ্যমেই যোগীরা সেই চিরন্তন পরমাত্মাকে উপলব্ধি করেন।
এইভাবেই পরমাত্মার সঙ্গে একাত্ম হওয়া মহান মানুষ নিজের মধ্যে আগুনের মতো তেজ ধারণ করেন। যিনি সেই পূর্ণ পরমেশ্বরকে জানতে পারেন, তাঁর জীবন সার্থক হয়ে যায়। যোগীরা সেই চিরন্তন পরমাত্মার উপলব্ধি লাভ করেন। এই পরমাত্মাকে চোখে দেখা যায় না; যাঁর মন একেবারে শুদ্ধ, একমাত্র তিনিই তাঁকে দেখতে পারেন। যিনি সবার মঙ্গল চান, নিজের মনকে বশে রাখেন, যাঁর মনে কখনো দুঃখ আসে না—এভাবে যিনি সংসার ত্যাগ করেন, তিনি মুক্তি পান। সেই চিরন্তন পরমাত্মাকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন।
সাপ যেমন নিজেকে গর্তে লুকিয়ে রাখে, তেমনই দাম্ভিক মানুষরা তাদের কথাবার্তা আর ব্যবহার দিয়ে নিজেদের পাপ লুকিয়ে রাখে। মূর্খ মানুষ তাদের বিশ্বাস করে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, আর যারা সত্যিকারের পথে—অর্থাৎ পরমাত্মার দিকে যেতে চায়, তাদেরও এই দাম্ভিক মানুষরা ভয় দেখিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু যোগীরা ভগবানের কৃপায় সেই ফাঁদে পা না দিয়ে সেই চিরন্তন পরমাত্মাকেই খুঁজে পান।
রাজা! আমাকে কখনো কেউ অসম্মান করতে পারে না। আমার জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই—তাহলে আমার মুক্তির প্রশ্নই বা কোথায়, কারণ আমি চিরকালই মুক্ত ব্রহ্ম। সত্য আর মিথ্যা—সবকিছুই আমার মধ্যে, সেই চিরন্তন ব্রহ্মেই অবস্থিত। আমিই একমাত্র উৎস, যেখান থেকে সত্য আর মিথ্যা দুটোরই জন্ম। আমার সেই স্বরূপ, সেই চিরন্তন পরমাত্মাকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন।
পরমাত্মার সঙ্গে ভালো কাজেরও কোনো সম্পর্ক নেই, খারাপ কাজেরও নেই। এই ভালো-মন্দের পার্থক্য শুধু তাদের মধ্যেই দেখা যায়, যারা নিজেদের শরীরকেই নিজের পরিচয় বলে ভাবে। ব্রহ্মের স্বরূপ সবসময়, সবজায়গায় একই রকম, এটা জানতে হবে। এভাবে জ্ঞানের পথে নিজেকে যুক্ত রেখে সেই আনন্দময় ব্রহ্মকেই খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। যোগীরা সেই চিরন্তন পরমাত্মাকেই উপলব্ধি করেন।
যাঁরা এভাবে ব্রহ্মকে জেনেছেন, নিন্দার কথাতেও তাঁদের মন কষ্ট পায় না। "আমি বেদ পড়িনি," "আমি যজ্ঞ করিনি"—এসব নিয়েও তাঁদের মন বিচলিত হয় না। ব্রহ্মবিদ্যা তাঁদের খুব দ্রুতই স্থির বুদ্ধি দেয়। সেই বুদ্ধি দিয়ে তাঁরা যা লাভ করেন, যোগীরা সেই চিরন্তন পরমাত্মাকেই উপলব্ধি করেন।
এভাবেই যিনি সব প্রাণীর মধ্যে সবসময় পরমাত্মাকে দেখতে পান, তিনি সেই দৃষ্টি লাভ করে বিষয়-আসক্ত মানুষদের জন্য আর কেন দুঃখ করবেন? চারদিকে জল থাকলে যেমন কেউ জলের জন্য অন্য জায়গায় যায় না, তেমনই আত্মজ্ঞানী মানুষের বেদ-টেদের আর কোনো দরকার পড়ে না। বুড়ো আঙুলের সমান সেই অন্তর্যামী পরমাত্মা সবার হৃদয়েই থাকেন, কিন্তু কেউ তাঁকে দেখতে পায় না। তিনি জন্মহীন, সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছেন, সবসময় সব জায়গায় বিরাজমান। যিনি তাঁকে জানেন, সেই জ্ঞানী মানুষ পরম আনন্দে ডুবে যান।
ধৃতরাষ্ট্র! আমিই সবার মা, আমিই বাবা, আমিই সন্তান, আর সবার আত্মাও আমিই। যা কিছু আছে, তা আমি; আর যা কিছু নেই, তা-ও আমিই। হে ভারত! আমি তোমার ঠাকুরদাও, বাবাও, ছেলেও। তোমরা সবাই আমার আত্মার মধ্যেই আছ, তবু তুমি আমার নও, আমিও তোমার নই—কারণ আত্মা তো একটাই। আত্মাই আমার আশ্রয়, আত্মা থেকেই আমার উৎপত্তি। আমি সবকিছুর মধ্যে মিশে আছি, সবসময় নতুন রূপে বিরাজ করি। আমার জন্ম নেই, আমি সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছি, সবসময় সজাগ দৃষ্টিতে সবকিছু দেখি। আমাকে জেনে জ্ঞানী মানুষরা পরম প্রশান্তি লাভ করেন। পরমাত্মা সূক্ষ্ম থেকেও সূক্ষ্মতর, তাঁর মন একেবারে বিশুদ্ধ, তিনিই সব প্রাণীর মধ্যে অন্তর্যামীরূপে বিরাজ করেন। সব প্রাণীর হৃদয়-পদ্মে অবস্থিত সেই পরম পিতাকে একমাত্র জ্ঞানী মানুষরাই চিনতে পারেন।।
*এখানেই সনৎসুজাতীয় অধ্যায় সমাপ্ত*
বি: দ্র: এর পরবর্তী ভাগে থাকবে কৌরব সভায় এসে সঞ্জয়ের দুর্যোধনকে অর্জুনের সংবাদ জানানো
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ১৮তমভাগের (সনৎসুজাতীয়-ষষ্ঠ অধ্যায়)আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ১৭তম ভাগের (সনৎসুজাতীয়- পঞ্চম অধ্যায় ) সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment