১৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব
১৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-গাণ্ডীবের গর্জন ও অর্জুনের হুঙ্কার: থমথমে কৌরবসভায় সঞ্জয়ের দুঃসংবাদ
দুর্যোধনের রাজসভায় সেদিন কেমন একটা থমথমে ভাব। ধৃতরাষ্ট্র সারারাত সনৎসুজাত আর বিদুরের সঙ্গে গভীর তত্ত্বকথা বলে কাটিয়েছেন — চোখে দেখতে পান না ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর একটা অজানা ভয় তাঁকে অস্থির করে রেখেছে। সকাল হতেই সভায় একে একে এসে বসলেন ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, শল্য, কৃতবর্মা, জয়দ্রথ, অশ্বত্থামা, সোমদত্ত, বিদুর, যুযুৎসু — বড় বড় যোদ্ধা আর রাজারা। অন্যদিকে দুর্যোধন, দুঃশাসন, শকুনি, কর্ণ, দুর্মুখ আর বাকি কৌরব ভাইয়েরা নিজেদের দম্ভ নিয়ে বসে আছেন। সবাই তাকিয়ে আছেন দরজার দিকে — পাণ্ডবদের কাছ থেকে বার্তা নিয়ে সঞ্জয় ফিরছেন।
সঞ্জয় রথ থেকে নেমে সভায় ঢুকে প্রণাম করে বললেন, "আমি পাণ্ডবদের শিবির থেকে আসছি। তাঁরা আপনাদের সবাইকে যথাযথ সম্মান জানিয়েছেন।"
ধৃতরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "সঞ্জয়, বলো তো, অর্জুন ঠিক কী বলেছে?"
সঞ্জয় তখন দুর্যোধনের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন — "রাজা, শ্রীকৃষ্ণের সামনে আর যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে অর্জুন যা বলেছেন, সেটা মন দিয়ে শুনুন। অর্জুন স্পষ্ট বলেছেন — কর্ণ, যে সবসময় আমার সঙ্গে যুদ্ধ করার সাহস দেখায়, আর যেসব রাজা যুদ্ধে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন, তাঁদের শোনানোর জন্যই আমি এই কথা বলছি। এমনভাবে বলো, যাতে দুর্যোধন আর তার মন্ত্রীরা স্পষ্ট শুনতে পায়।"
সঞ্জয় বলে চললেন — অর্জুনের চোখদুটো তখন রাগে লাল, হাতে গাণ্ডীব, যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। অর্জুন বলে পাঠিয়েছে — "দুর্যোধন যদি যুধিষ্ঠিরের রাজ্য ফিরিয়ে দিতে রাজি না হয়, তাহলে বুঝতে হবে কৌরবদের পাপের পাত্র উপচে গেছে, আর তার ফল তাদের ভোগ করতেই হবে। দুর্যোধন যদি ভাবে ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব, শ্রীকৃষ্ণ, সাত্যকি, ধৃষ্টদ্যুম্ন আর শিখণ্ডীর বিরুদ্ধে লড়ে জিতে যাবে, তাহলে সে ভুল স্বপ্নে বাস করছে। পাণ্ডবদের ভালোর জন্য আর সন্ধির কথা বলার দরকার নেই — যুদ্ধই হোক।"
পাণ্ডবরা এতদিন অনেক কষ্ট সহ্য করেছে, কিন্তু সত্য আর ধর্মের পথ ছাড়েনি। অর্জুন সাবধান করে দিয়েছে — এতদিনের জমে থাকা রাগ যখন হঠাৎ বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসবে, তখন দুর্যোধনের অনুশোচনার আর শেষ থাকবে না। যখন দেখবে ভীম গদা হাতে রথ ছুটিয়ে আসছে, নকুল শত্রুর কাটা মাথার স্তূপ বানাচ্ছে, সহদেব শকুনিকে তাড়া করে আক্রমণ করছে, আর অভিমন্যু শ্রীকৃষ্ণের মতো বীরত্ব দেখিয়ে কৌরব সেনাকে ছত্রভঙ্গ করছে — তখনই দুর্যোধন বুঝবে সে কত বড় ভুল করেছে।
পিতামহ ভীষ্ম যখন শিখণ্ডীর হাতে তীরবিদ্ধ হয়ে পড়ে যাবেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন যখন বাণ দিয়ে দ্রোণাচার্যকে আক্রমণ করবেন, আর অর্জুনের হাতে গাণ্ডীব, পাশে রথে শ্রীকৃষ্ণকে বসে থাকতে দেখবে — তখন কৌরবদের বাঁচার আর কোনো পথ থাকবে না। অর্জুন মনে করিয়ে দিয়েছে, ইন্দ্র তাকে বর দিয়েছিলেন যে এই যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণই হবেন তার সহায়। ইন্দ্রের চেয়েও অর্জুন কৃষ্ণকে সারথি হিসেবে বেছে নিয়েছে, কারণ কৃষ্ণ যার পাশে থাকেন, জয় তারই নিশ্চিত।
অর্জুনের শেষ কথাটা খুব স্পষ্ট আর তীক্ষ্ণ — "রাজ্য ফিরে পাওয়ার জন্য আমি পিতামহ ভীষ্ম, দ্রোণ আর কৃপাচার্যকে প্রণাম করেই যুদ্ধে নামব। ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেরা যদি এই ধ্বংস থেকে বাঁচতে চায়, তাহলে যুদ্ধ থেকে সরে আসুক। নইলে গ্রীষ্মের দাবানল যেমন শুকনো বন পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, তেমনই আমার স্থূলাকর্ণ, পাশুপত, ব্রহ্মাস্ত্র আর ইন্দ্রাস্ত্র কৌরবদের একজনকেও বাঁচতে দেবে না। সঞ্জয়, তুমি গিয়ে স্পষ্ট বলে দাও — পিতামহ ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ আর বিদুর যা পরামর্শ দেবেন, দুর্যোধন যেন সেটাই মেনে নেয়। তাহলেই কৌরব বংশ বেঁচে থাকবে, নইলে সবার সর্বনাশ অনিবার্য।"
..................চলবে পরবর্তী ভাগ...
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ১৯তমভাগের আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ১৮তম ভাগের (সনৎসুজাতীয়- ষষ্ঠ অধ্যায় ) সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment