২৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অন্ধকারের শেষ সীমানায়: কৌরব সভার রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত


২৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অন্ধকারের শেষ সীমানায়: কৌরব সভার রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত

ধৃতরাষ্ট্রের আকুল প্রশ্নের মুখে সঞ্জয় আর কোনো আড়াল রাখলেন না। সভাঘরের থমথমে বাতাসে অর্জুনের শেষ বার্তাটা যেন ছারখার করে দিল সব অনিশ্চয়তা। সোজা হিসাব—যুধিষ্ঠির তাঁর ন্যায্য অধিকারটুকু চান। তা না পেলে, রক্তস্রোতে ভেসে যাবে হস্তিনাপুরের ঘোড়া, হাতি, আর ধৃতরাষ্ট্রের আত্মম্ভরী ছেলেরা।

কিন্তু দুর্যোধন? তাঁর মুখে তখনও সেই এক চিলতে ঔদ্ধত্যের হাসি। কোনো কথায় পাত্তাই দিলেন না। চারপাশটা যেন হঠাৎ বরফের মতো জমে গেল।

ধৃতরাষ্ট্রের ভেতরে তখন মারাত্মক অস্থিরতা। ক্ষমতার দড়ি টানাটানিতে কে ভারী, সঞ্জয়ের কাছে তা জানতে চাইলেন। সঞ্জয় চালাক লোক, কোনো গোপন কথা একলা রাজাকে বলে বিপদে পড়তে চাননি। ডাক পড়ল ব্যাসদেব, গান্ধারী আর বিদুরের।

ব্যাসদেবের সংকেত পেয়ে সঞ্জয় খোলস ছেড়ে বের করে আনলেন আসল সত্যটা। কৃষ্ণ কেবল পাণ্ডবদের পক্ষে থাকা কোনো কূটনীতিবিদ বা চতুর সারথি নন; তিনি স্বয়ং কালপুরুষ। নরকাসুর, কংস কিংবা শিশুপাল—যাঁদের নাম শুনে তামাম ভারতবর্ষ কাঁপত, কৃষ্ণ তাঁদের খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়েছেন। যদি এক পাল্লায় পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আর অন্য পাল্লায় একা কৃষ্ণকে বসানো যায়, কৃষ্ণের পাল্লাই ভারী হবে। কৃষ্ণ আসলে এক মায়া বিছিয়ে রেখেছেন—অধর্মের এই জঞ্জালগুলোকে পুড়িয়ে ছাই করাই যাঁর মূল উদ্দেশ্য।

ধৃতরাষ্ট্রের বুকে মোচড় দিয়ে উঠল—"সঞ্জয়, তুমি যা বোঝো, আমি তা বুঝতে পারি না কেন?"

সঞ্জয় সহজ গলায় বললেন, "মহারাজ, আপনার তো কোনো জ্ঞানচক্ষু নেই। যে অন্তরে কপটতা আর অন্ধ বাসনা পুষে রাখে, সে কোনোদিন কৃষ্ণকে ছুঁতে পারে না। আমি ধ্যানের আলোয় তাঁকে দেখেছি।"

কথাটা শুনে ধৃতরাষ্ট্রের বুকের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। তিনি দুর্যোধনের দিকে ফিরে কাতর গলায় বললেন, "পুত্র, এখনও সময় আছে, কৃষ্ণের পায়ে মাথা নোয়া।"

দুর্যোধন ঠোঁট উল্টে জবাব দিলেন, "কৃষ্ণ ত্রিভুবন জয় করুক আর যাই করুক, ও তো অর্জুনের বন্ধু। ওর কাছে এই দুর্যোধন কোনোদিন মাথা নোয়াবে না।"

গান্ধারী আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তীব্র ধিক্কারে ফেটে পড়ে বললেন, "তুই একটা আস্ত মূর্খ! ক্ষমতার লোভে নিজের বাপ-মাকে পর্যন্ত বলির পাঁঠা বানাচ্ছিস। যেদিন ভীমের গদা তোর হাঁটু দুটো গুঁড়িয়ে দেবে, সেদিন এই অন্ধ বাবার কথা মনে পড়বে তোর।"

মহর্ষি ব্যাসদেব দূর থেকে নীরব দর্শকের মতো দেখছিলেন। ধৃতরাষ্ট্রকে শান্ত করে তিনি শুধু বললেন, "বাসনায় অন্ধ মানুষ কেবল জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরপাক খায়, রাজা। মুক্তি পেতে হলে আসক্তি ছাড়তে হয়।"

ধৃতরাষ্ট্র ততক্ষণে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো ব্যাকুল। কৃষ্ণের নানা নাম—বাসুদেব, বিষ্ণু, মধুসূদন, হৃষীকেশ, গোবিন্দ—সঞ্জয় একে একে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন তাদের গূঢ় অর্থ। কীভাবে এক-একটি নামের ভেতরে লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের অস্তিত্ব আর আনন্দের রহস্য।

সব শুনে অন্ধ বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্র দু-হাত তুলে কৃষ্ণের শরণ নিলেন ঠিকই, কিন্তু বড় দেরি হয়ে গেছে। হস্তিনাপুরের রাজসভায় ততক্ষণে নেমে এসেছে নিশ্চিত ধ্বংসের ছায়া।

বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে। 

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ২৪তম ভাগের আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।

উদ্যোগপর্বের ২৩তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)