একাদশ ভাগ উদ্যোগপর্ব বিদুর নীতি সপ্তম অধ্যায়- বিদুরের কথা: রাজবাড়ির নিস্তব্ধতায় এক অমোঘ সত্যের উচ্চারণ
একাদশ ভাগ উদ্যোগপর্ব বিদুর নীতি সপ্তম অধ্যায়- বিদুরের কথা: রাজবাড়ির নিস্তব্ধতায় এক অমোঘ সত্যের উচ্চারণ
রাত্রি তখন গভীর হয়ে এসেছে হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে। বাইরে হয়তো ঝিঁঝিপোকার ডাক, ভেতরে অন্ধ রাজার নিঃশ্বাসের শব্দ। ধৃতরাষ্ট্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—বিদুর, ক্ষমতা হাতে আসা কিংবা তা এক লহমায় ভস্ম হয়ে যাওয়া, কোনোটাতেই মানুষের কোনো হাত নেই। বিধাতা যেন আমাদের সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুলের মতো নাচিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, আর সেই সুতোর টান আসছে বহু জন্ম আগে বোনা প্রারব্ধ থেকে। তুমি বলে যাও, বিদুর, আমি স্থির হয়ে বসে শুনছি।
বিদুর একবার মাথা নাড়লেন। তারপর তাঁর গলা দিয়ে যেন এক গভীর সত্যের প্রতিধ্বনি বেরিয়ে এলো। বললেন—হে ভরতবংশীয়, বাতাস যখন উলটো দিকে বয়, তখন স্বয়ং দেবগুরু বৃহস্পতিও যদি জ্ঞানের কথা বলেন, লোকে তাঁকে অপমান করতে দ্বিধা করে না, তাঁর বুদ্ধি নিয়েই টানাটানি শুরু করে দেয়। এই পৃথিবীতে মানুষ নানা উপায়ে অন্যের প্রিয় হয়ে ওঠে—কেউ মুক্তহস্তে দান করে, কেউ মিষ্টি কথায় মন ভোলায়, কেউ বা জাদু-টোনা কিংবা ওষুধের জোরে বশ করে। কিন্তু যে মানুষ সত্যিকারের হৃদয় দিয়ে, সতীর্থের মতো প্রিয় হয়ে ওঠে, সে কোনো কারণ ছাড়াই চিরকাল প্রিয় থেকে যায়। আর যার প্রতি মনের গভীরে একবার অন্ধ ক্রোধ জমে যায়, সে যত বড় জ্ঞানী কিংবা সাধুই হোক, তাকে আর ভালো লোক বলে মনে হয় না। প্রিয়জনের অন্যায় কাজকেও তখন পুণ্য মনে হয়, আর অপ্রিয় জনের ভালো কাজকেও দাগিয়ে দেওয়া হয় পাপ বলে।
রাজন, দুর্যোধন যেদিন প্রথম কেঁদে উঠেছিল এই পৃথিবীতে, সেদিনই আমি আপনাকে স্পষ্ট করে বলেছিলাম—এই একটা সন্তানকে মায়ার বাঁধন কেটে বিদায় দিন। তাকে ছেড়ে দিলে বাকি একশো সন্তান মাথা উঁচু করে এই রাজপ্রাসাদে বেঁচে থাকবে। আর তাকে আঁকড়ে ধরে রাখলে শেষ পর্যন্ত সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। যা বাড়তে বাড়তে একদিন গোটা বংশকে বিনাশের মুখে ঠেলে দেয়, তাকে এত প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো মানে হয় না। সাময়িক ক্ষতি সহ্য করে যা শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যতের কল্যাণ ডেকে আনে, সেটাই তো আসল লাভ। ধৃতরাষ্ট্র, মানুষ গুণের জোরেও ধনী হয়, আবার শুধু টাকার জোরেও ধনী হয়। কিন্তু যার ভাণ্ডার উপচে পড়া সম্পদে ভরা, অথচ যে গুণহীন, তাকে এক মুহূর্তও না ভেবে জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত।
ধৃতরাষ্ট্র বিষণ্ণ চোখে বিদুরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—বিদুর, তোমার এই কথাগুলো হয়তো পরম মঙ্গলের কথাই বলছে। মহাপুরুষেরাও একথায় সায় দেবেন। এও সত্যি যে ধর্ম যার পক্ষে থাকে, শেষপর্যন্ত জয় তারই চরণে এসে লুটিয়ে পড়ে। কিন্তু সব জেনেও, বিদুর, আমি আমার নিজের রক্ত, নিজের সন্তানকে কোনোমতেই ছুঁড়ে ফেলতে পারছি না।
বিদুর তখনও শান্ত, কিন্তু তাঁর স্বরে এক অনমনীয়তা। বললেন—যার হৃদয় গুণে ভরা, যে মানুষ বিনয়ী, জীবজগতের সামান্য যন্ত্রণা দেখলেও যার বুক চিরে যায়, সে চোখ বুজে থাকতে পারে না। কিন্তু যে শুধু অন্যের নিন্দা করে বেড়ায়, মানুষকে দুঃখ দিয়ে সুখ পায়, কুটিল চক্রান্তে বিভেদ বুনে বেড়ায়—যার দৃষ্টিই বিষাক্ত, তার সান্নিধ্য আসলে এক অভিশাপ। এমন মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া যেমন মহাপাপ, তাকে এক কড়িও দেওয়া তেমনই বিপজ্জনক। যে অন্যের কাজে অকারণে নাক গলায়, যে কামাতুর, নির্লজ্জ আর প্রতারক—তার সঙ্গে পথ চলাও উচিত নয়।
নীচ মানুষের ভালোবাসা যেন ছাইচাপা আগুন—সামান্য বাতাসেই নিভে যায়। স্বার্থ ফুরোলেই সে ছোবল মারে, সামান্য ত্রুটি পেলেই ধ্বংস করতে উদ্যত হয়ে ওঠে। তাই যাঁরা প্রাজ্ঞ, তাঁরা এই বিবেকহীন, উগ্র মানুষদের ছায়া থেকে সবসময় দূরে থাকেন। আর যিনি নিজের অক্ষম, দরিদ্র, পীড়িত স্বজনদের আগলে রাখেন, তিনিই একদিন সুখে-সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠেন। মহারাজ, আপনার মূল কর্তব্য ছিল নিজের জ্ঞাতি ও বংশকে রক্ষা করা। আর সেখানে পাণ্ডবরা তো কোনো সাধারণ মানুষ নন—তাঁরা বীর, তাঁরা সক্ষম। আপনি পরম স্নেহে তাঁদের ডেকে এনে অন্তত মাথা গোঁজার মতো, বেঁচে থাকার মতো সামান্য কটা গ্রাম তাঁদের হাতে তুলে দিন। তাতে আপনার নাম ইতিহাসে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।
আপনি এই বংশের অভিভাবক। দুর্যোধনের এই অন্যায় আস্পর্ধাকে শাসন করা তো আপনারই দায়িত্ব ছিল। নিজের জ্ঞাতিভাইদের সঙ্গে কলহ ডেকে আনার চেয়ে বড় মূর্খতা আর কিছু হতে পারে না। একসঙ্গে খাওয়া, একসঙ্গে বেঁচে থাকা—এতেই তো প্রকৃত আনন্দ। জ্ঞাতিরা যেমন মানুষকে বাঁচাতে পারে, তেমনি রসাতলেও ঠেলে দিতে পারে। আজ যদি আপনি পাণ্ডবদের মায়ায় জড়ান, তাঁরাই একদিন শত্রুর হাত থেকে বুক দিয়ে আপনাকে আগলে রাখবেন। যেদিন শুনবেন পাণ্ডবরা কিংবা আপনার নিজের ছেলেরা যুদ্ধে শেষ হয়ে গেছে, সেদিন শুধু অনুশোচনার আগুনেই পুড়তে হবে। যে কাজের শেষে কেবল বিলাপ ছাড়া কিছু নেই, তা এখনই বন্ধ করুন।
দুর্যোধন অতীতে পাণ্ডবদের সঙ্গে যে অন্যায়গুলো করে এসেছে, এই বংশের প্রবীণতম হিসেবে আজ আপনিই তা শুধরে দিন। যুধিষ্ঠিরকে তাঁর প্রাপ্য সিংহাসনে বসিয়ে দিন—দেখবেন, আপনার গায়ে লেগে থাকা সব কলঙ্ক ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে। অন্যায়ের পথ ছেড়ে সৎপথে ফিরে আসুন। নেশা, অতিরিক্ত নিদ্রা, অজ্ঞতা, দুর্মতি মন্ত্রীর কুপরামর্শ আর মূর্খ দূতের ওপর অন্ধ বিশ্বাস—এই ছয়টি ভুল যে এড়িয়ে চলতে পারে, শত্রুরাও একদিন তার সামনে মাথা নত করে।
মনে রাখবেন, মহারাজ—অহংকার দূর হলে অপযশ মেটে, সাহস অনর্থ দূর করে দেয়, ক্ষমা ক্রোধকে জয় করে, আর সদাচরণ সব কুলক্ষণ ধুয়ে দেয়। যে মানুষ নিজের মনকে বশ করতে পারে না, তার সব বিদ্যা যেন ছাইয়ে ঢালা আহুতির মতো নিষ্ফল হয়ে যায়। ক্রোধকে জয় করতে হয় অক্রোধ দিয়ে, মন্দকে জয় করতে হয় ভালো ব্যবহার দিয়ে, কৃপণতাকে জয় করতে হয় দান দিয়ে, আর মিথ্যাকে জয় করতে হয় সত্য দিয়ে।
এখনও সময় আছে, ধৃতরাষ্ট্র। পাণ্ডব আর কৌরব—দুই পক্ষকেই আপনি সমান চোখে দেখুন। অন্ধ মোহ সরিয়ে রেখে সব সন্তানের প্রতি একই রকম ন্যায়বিচার করুন। তাহলেই এই কুল, এই সমাজ, আর আপনার নিজের আত্মা—সবাই পরম শান্তি খুঁজে পাবে।
বি:দ্র: পাঠকদের সুবিধার্থে উপরিউক্ত অংশটি মহাভারতের 'উদ্যোগ পর্ব'-এর অন্তর্গত বিখ্যাত বিদুর নীতি-র সপ্তম অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ। নিচে মূল বিষয়গুলোকে সহজ ও প্রাঞ্জল ভাবে তুলে ধরা হলো:
১. মানুষের প্রিয় হওয়ার আসল কারণ
মানুষ নানাভাবে অন্যের প্রিয় হয়ে ওঠে—কেউ দান করে, কেউ মিষ্টি কথায়। কিন্তু যে মন থেকে প্রিয়, সে বিনা কারণেই চিরকাল প্রিয় থেকে যায়। আর একবার মনে অন্ধ রাগ জমলে, সে যত গুণীই হোক, তাকে আর ভালো লাগে না।
২. একজনের জন্য সবাইকে বিপদে ফেলা উচিত নয়
একটা সন্তান (দুর্যোধন) সবার ধ্বংসের কারণ হলে, তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ভবিষ্যতের কল্যাণের জন্য সাময়িক ক্ষতি মেনে নেওয়াই আসল লাভ।
৩. শুধু টাকা থাকলেই কেউ সম্মানের যোগ্য নয়
গুণ থাকলে তবেই ধন সার্থক। যার শুধু টাকা আছে কিন্তু গুণ নেই, তাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়।
৪. কুচক্রী মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করা
যে অন্যের নিন্দা করে, দুঃখ দিয়ে সুখ পায়, চক্রান্ত বোনে—এমন মানুষের থেকে দূরে থাকা উচিত। তার কাছ থেকে কিছু নেওয়া বা দেওয়া, দুটোই বিপজ্জনক।
৫. নীচ মানুষের ভালোবাসা ক্ষণস্থায়ী
তাদের ভালোবাসা ছাইচাপা আগুনের মতো—স্বার্থ ফুরোলেই নিভে যায়, সামান্য ভুলেই ছোবল মারে। তাই এদের থেকে সাবধান থাকা দরকার।
৬. আত্মীয়-স্বজনকে আগলে রাখা
দুর্বল, দরিদ্র বা অসহায় আত্মীয়দের পাশে দাঁড়ালে মানুষ নিজেই সুখী ও সমৃদ্ধ হয়। জ্ঞাতিরা যেমন রক্ষা করতে পারে, তেমনি ছেড়ে দিলে বিপদেও ফেলতে পারে।
৭. অন্যায় করে থাকলে শুধরে নেওয়া
অতীতের ভুল স্বীকার করে সঠিক পথে ফেরা উচিত—তাতে সব কলঙ্ক মুছে যায়।
৮. ছয়টি দোষ এড়িয়ে চলা
নেশা, অতিরিক্ত ঘুম, অজ্ঞতা, খারাপ মন্ত্রীর পরামর্শ, আর মূর্খ দূতের ওপর অন্ধবিশ্বাস—এই ছয়টি এড়ালে শত্রুও মাথা নত করে।
৯. গুণ দিয়ে দোষ জয় করা
অহংকার দূর হলে অপযশ যায়, সাহসে অনর্থ কাটে, ক্ষমায় ক্রোধ জয় হয়, সদাচরণে কুলক্ষণ ধুয়ে যায়। আর ক্রোধকে জয় করতে হয় অক্রোধ দিয়ে, কৃপণতাকে দান দিয়ে, মিথ্যাকে সত্য দিয়ে।
১০. নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার
নিজের সব সন্তানকে সমান চোখে দেখা এবং অন্ধ মমতার ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচার করাই প্রকৃত শান্তির পথ।
বি:দ্র: এর পরবর্তী ভাগে থকবে বিদুর নীতির অষ্টম অধ্যায়: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের একাদশ ভাগের (বিদুর নীতির সপ্তম অধ্যায়) আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের দশম ভাগের (বিদুর নীতির ষষ্ঠ অধ্যায়) সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment